রাগের বশে স্বামী "আর জীবনেও সহবাস করব না" বললে কি তালাক পতিত হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
গতকাল রাতে আমার স্বামী সহবাস করতে চেয়েছিল কিন্তু আমি অনেক ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়ে গেছি।।
আজ সে সকালে আমার সাথে কথা বলেছে তখন মনে হয়নি রেগে আছে।।
কিন্তু বিকালে তাকে আমি অন্য একটা কথা জিজ্ঞেস করার পর সে বলেছে রাতের বিষয়টা আমি ভুলিনি। তারপর বলে আর জীবনেও করবো না (( মানে সহবাস)))।। কিন্তু সে আল্লাহর নামে কসম করে বলেনি।
আমি বললাম প্রতিজ্ঞা করলা নাকি।।তখন আমার স্বামী বলে তুমি যা মনে করো।।তখন আমি বললাম আমি তোমাকে অন্য কথা বলেছি আর তুমি এটা কেন টেনে আনলে।।তাই আমার স্বামী বলে আগে রাতের কথা শেষ করো // নাকি রাতের প্রসঙ্গ টা শেষ করো কোনটা বলছে মনে নেই।।
আমি আবার বলছি তুমি কি শপথ করলা নাকি? কিন্তু সে বলে তুমি যা মনে করো।।আমি বার বার জিজ্ঞেস করেছি সে বলে এমনি দেখি কতদিন না করে থাকা যায় এটা বলছি।।আমি বললাম তুমি কি শপথ করেছো কিন্তু আমার স্বামী বলে না শপথ করিনি।।তালাকের নিয়তে বলেছে কিনা জিজ্ঞেস করলে বলে তালাকের নিয়তে বলে নি।।
এখন কি বিবাহিত জীবনে কোন সমস্যা হবে
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনার সারসংক্ষেপ এই যে, স্বামী রাগের বশে বলেছে—"আর জীবনেও করব না" (অর্থাৎ সহবাস করব না)। কিন্তু সে স্পষ্টভাবে বলেছে যে, সে আল্লাহর নামে কসম করেনি এবং তালাকের নিয়তেও বলেনি। প্রশ্ন হলো—এতে কি বিবাহে কোনো সমস্যা হবে?
উত্তর:
প্রথম কথা হলো, ইসলামে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সহবাস-সংক্রান্ত দাবি পূরণ করা স্ত্রীর জন্য সাধারণত সহজতর হলেও, ক্লান্তি বা অসুস্থতার কারণে কোনো এক রাতে সহবাস না হওয়া নিজে থেকেই কোনো গুনাহ বা তালাকের কারণ নয়। রাগের মুহূর্তে স্বামীর "আর জীবনেও করব না" ধরনের কথা মূলত অভিমান বা রাগের প্রকাশ; এটি তালাকের স্পষ্ট বাক্য (সরীহ) নয়, বরং কিনায়া বা অস্পষ্ট বাক্য। আর কিনায়া বাক্যে তালাক সংঘটিত হতে হলে নিয়ত বা পরিস্থিতির প্রমাণ (দালালাতুল হাল) জরুরি।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- তালাকের বাক্য দুই প্রকার: (১) সরীহ (স্পষ্ট)—যেমন "তুমি তালাক", "তোমাকে তালাক দিলাম" ইত্যাদি। এতে নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়। (২) কিনায়া (অস্পষ্ট)—যেমন "তুমি আমার থেকে আলাদা", "তোমার সাথে আর সংসার করব না" ইত্যাদি। এতে তালাক পতিত হতে হলে তালাকের নিয়ত বা অবস্থার প্রমাণ লাগবে; নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।
- রাগের বশে "আর জীবনেও সহবাস করব না" বলা—এটি সহবাস না করার একটি ওয়াদা বা অভিমানমূলক কথা; এটি সরীহ তালাকের বাক্য নয়। আর স্বামী নিজেই স্বীকার করেছে যে, সে তালাকের নিয়তে বলেনি এবং আল্লাহর নামে কসমও করেনি। সুতরাং এতে তালাক সংঘটিত হয়নি।
ইসলামি বিধান:
- কসম না করে শুধু "করব না" বলা—এটি কসম (শপথ) হিসেবে গণ্য নয়; বরং এটি একটি সাধারণ ওয়াদা। আর ওয়াদা ভঙ্গের জন্য কাফফারা ওয়াজিব হয় না, তবে ওয়াদা রক্ষা করা মুসলিমের কর্তব্য।
- তবে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর এমন আচরণ—রাগের সময় "আর জীবনেও করব না" বলে অভিমান করা—শরীয়তের দৃষ্টিতে কাম্য নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম আচরণ করে।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)
- স্ত্রীর ক্লান্তি বা অসুস্থতার কারণে সহবাসে অপারগতা প্রকাশ করা দোষের নয়; বরং স্বামীর উচিত সহানুভূতি ও ধৈর্য প্রদর্শন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)
সিদ্ধান্ত: প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় তালাক সংঘটিত হয়নি এবং বিবাহে কোনো সমস্যা হয়নি। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত পরস্পরকে ক্ষমা করে সদ্ভাব বজায় রাখা এবং রাগের মুহূর্তে তালাক, কসম বা "আর কখনো করব না" ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকা। রাগের সময় মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া এমন কথা পরে অনুতপ্ত হয়ে মিটমাট করে নেওয়াই উত্তম।
সতর্কতা: ভবিষ্যতে তালাকের বাক্য বা কসমের বাক্য নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি; কারণ অনেক সময় রাগের বশে বলা কথায় ভুল বোঝাবুঝি ও পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়। কোনো জটিল পরিস্থিতি দেখা দিলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতি সাহেবের সাথে সরাসরি পরামর্শ করা উত্তম।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুত তালাক—তালাকের সরীহ ও কিনায়া বাক্যের আলোচনা।
- আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক।
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক।
- ফাতাওয়া উসমানি, তালাক অধ্যায়।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, তালাক ও কসম সংক্রান্ত মাসায়েল।
- সহিহ তিরমিজি, হাদিস নং ৩৮৯৫।
আল্লাহ ভালো জানেন।