ইসলামে নিঃসন্তান বৃদ্ধা মহিলার সম্পত্তি বণ্টনের বিধান: পালক-কন্যা ও নাতনি কি মিরাস পাবে? ভাই-বোনের অংশ কীভাবে নির্ধারিত হয়?
Family Life · Hanafi
Question
বৃদ্ধা মহিলার স্বামী তার নামে পাঁচ তলা বিল্ডিং করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে (পালক) বোনের মেয়ের কন্যা সন্তানদের পাঁচতলা বিল্ডিং বন্টন করে দেন, কিন্তু বলে গিয়েছেন যে, যতদিন না সেই বৃদ্ধা মহিলা মৃত্যুবরণ করবেন তার সম্পূর্ণ মালিকানা উক্ত দুই নাতিনরা পাবে না এবং এটা থেকে যে খরচ আসবে সেই খরচ দিয়ে বৃদ্ধা মহিলা চলবেন, যতদিন বেঁচে আছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, বৃদ্ধা মহিলার এক বোন চার ভাই (এক ভাই বর্তমানে মারা গেছেন কিন্তু তার সন্তানরা আছেন)এবং তাদের সন্তানরা আছেন।
ইসলামে উক্ত বৃদ্ধা মহিলার সম্পদের বন্টন কিভাবে হওয়া উচিত?
Answer
বৃদ্ধা মহিলার সম্পত্তি বণ্টন: ইসলামী দৃষ্টিকোণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন বৃদ্ধা মহিলা (নিঃসন্তান) তার বোনের মেয়েকে লালন-পালন করে বিয়ে দিয়েছেন। সেই পালক-কন্যার দুই কন্যা (অর্থাৎ বৃদ্ধার বোনের নাতনি) আছেন। বৃদ্ধার স্বামী বৃদ্ধার নামে একটি পাঁচতলা বিল্ডিং নির্মাণ করেন। স্বামী মৃত্যুর আগে ওই বিল্ডিংটি পালক-কন্যার দুই কন্যার নামে বণ্টন করে দেন, তবে শর্ত দেন যে—বৃদ্ধা জীবিত থাকাকালীন সম্পূর্ণ মালিকানা তারা পাবে না; বিল্ডিংয়ের আয় দিয়ে বৃদ্ধা জীবিকা নির্বাহ করবেন। বৃদ্ধার এক বোন, চার ভাই (একজন মৃত, তার সন্তান রয়েছে) এবং তাদের সন্তানরা জীবিত আছেন।
প্রশ্ন: ইসলামে উক্ত বৃদ্ধা মহিলার সম্পদের বণ্টন কীভাবে হওয়া উচিত?
১. প্রথমে একটি মৌলিক বিষয়: সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা
প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে—বিল্ডিংটির মালিক কে?
- স্বামী যদি বিল্ডিংটি বৃদ্ধার নামে নির্মাণ করেন এবং তা বৃদ্ধার মালিকানায় হস্তান্তর করেন (হিবা/দান সম্পূর্ণ করে দেন), তাহলে বিল্ডিংটি বৃদ্ধার সম্পত্তি।
- কিন্তু স্বামী মৃত্যুর আগে ওই বিল্ডিং পালক-কন্যার দুই কন্যার নামে বণ্টন করে দিয়েছেন এবং শর্ত দিয়েছেন যে বৃদ্ধা জীবিত থাকাকালীন তারা পূর্ণ মালিকানা পাবে না—এটি ফিকহের পরিভাষায় "হিবা মা'আ হাবসিল উমর" বা "রুকবা/উমরা" ধরনের চুক্তি।
হানাফি ফিকহের বিধান:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, এমন শর্তযুক্ত দান (যেখানে দাতা বলেন—"তুমি জীবিত থাকলে সম্পত্তি তোমার, মৃত্যুর পর আমার") বাতিল। কারণ দান সম্পূর্ণ হস্তান্তর ছাড়া হিবা সহিহ হয় না। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, শর্ত বাতিল হবে কিন্তু মূল হিবা বহাল থাকবে।
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন, খ. ৫, কিতাবুল হিবা): "الْهِبَةُ لَا تَتِمُّ إِلَّا بِالْقَبْضِ" — দান কেবল দখলদারি (কবজ) ছাড়া পূর্ণ হয় না।
ফাতাওয়া আলমগিরি (কিতাবুল হিবা): শর্তযুক্ত হিবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে; শর্ত বাতিল, হিবা বহাল—এটাই মুফতি বাহা।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ: স্বামী যদি বিল্ডিংটি বৃদ্ধার নামে করে দেন এবং তা বৃদ্ধার সম্পত্তি হয়ে যায়, তাহলে স্বামীর পক্ষে পরে তা পালক-নাতনিদের নামে বণ্টন করা বৈধ ছিল না—কারণ তা তখন বৃদ্ধার সম্পত্তি। আর যদি বিল্ডিংটি স্বামীর নিজের সম্পত্তি ছিল এবং তিনি সরাসরি নাতনিদের দান করেন, তাহলে বৃদ্ধার কোনো মালিকানা থাকে না; তখন বৃদ্ধার নিজের সম্পদ বলতে শুধু তার ব্যক্তিগত সম্পদ (নগদ, গহনা, আসবাব ইত্যাদি)।
সিদ্ধান্ত: প্রশ্নে বলা হয়েছে "স্বামী তার (বৃদ্ধার) নামে বিল্ডিং করেছিলেন"—সুতরাং প্রাথমিকভাবে বিল্ডিং বৃদ্ধার সম্পত্তি। স্বামীর পরে তা নাতনিদের নামে বণ্টন করা শরীয়তসম্মত হয়নি; তবে বৃদ্ধা নিজে সম্মতি দিলে বা স্বামীর ওসিয়ত অনুযায়ী আয় ভোগের ব্যবস্থা থাকলে তা ভিন্ন বিষয়। এক্ষেত্রে মুফতি সাহেবের কাছে সরাসরি দলিল-দস্তাবেজ দেখিয়ে ফতোয়া নেওয়া জরুরি।
২. বৃদ্ধার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির বণ্টন (মিরাস)
ধরা যাক, বিল্ডিং বৃদ্ধার সম্পত্তি এবং তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। তখন তার ওয়ারিস কারা?
বৃদ্ধার ওয়ারিস:
| ওয়ারিস | সম্পর্ক | অবস্থা | |---|---|---| | স্বামী | — | মৃত | | সন্তান | — | নেই | | পিতা-মাতা | — | মৃত (ধারণা) | | ভাই-বোন | সহোদর/বৈমাত্রেয় | জীবিত: ১ বোন, ৩ ভাই (১ ভাই মৃত, তার সন্তান জীবিত) | | পালক-কন্যা | — | ওয়ারিস নয় (আসল সন্তান নয়) | | পালক-কন্যার কন্যারা (নাতনি) | — | ওয়ারিস নয় (আসল নাতনি নয়) |
গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি নীতি:
পালক সন্তান বা পালক-সম্পর্কীয় কেউ মিরাসের ওয়ারিস হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ قَوْلُكُم بِأَفْوَاهِكُمْ"
"আর তিনি তোমাদের পালক-পুত্রদের তোমাদের (আসল) সন্তান করেননি; এটা তোমাদের মুখের কথা মাত্র।"
— সূরা আহযাব: ৪
"لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ ۖ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ"
"পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা রেখে যায় তাতে পুরুষদের অংশ আছে এবং নারীদেরও অংশ আছে।"
— সূরা নিসা: ৭
হাদিস: "أَلْحِقُوا الْفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا" — "ফারায়েজ (নির্ধারিত অংশ) তার হকদারদের দিয়ে দাও।"
— সহিহ বুখারি: ৬৭৩২, সহিহ মুসলিম: ১৬১৫
বৃদ্ধার সম্পত্তির বণ্টন:
বৃদ্ধার কোনো সন্তান, পিতা-মাতা, স্বামী নেই। ওয়ারিস হিসেবে আছেন: ১ বোন ও ৩ ভাই (এক ভাই মৃত—তার সন্তানরা আসাবে না, কারণ মৃত ভাইয়ের সন্তানরা চাচা-ফুফুর সম্পত্তিতে ওয়ারিস হয় না; বরং তারা নিজ পিতার সম্পত্তির ওয়ারিস)।
হানাফি মিরাস আইন অনুযায়ী:
- যেহেতু মৃতের কোনো সন্তান বা পিতা নেই, বোন ও ভাই আসাবা হিসেবে সম্পত্তি পাবে।
- সহোদর ভাই ও বোনের ক্ষেত্রে নীতি: "لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ" — পুরুষের অংশ নারীর দ্বিগুণ (সূরা নিসা: ১১-এর সাধারণ নীতি, এবং আসাবা সম্পর্কিত হাদিস)।
হিসাব: জীবিত ৩ ভাই + ১ বোন = মোট ৭ অংশ (প্রতি ভাই ২ অংশ, বোন ১ অংশ)।
- প্রত্যেক জীবিত ভাই: ২/৭ অংশ
- বোন: ১/৭ অংশ
- মৃত ভাইয়ের সন্তানরা: কিছুই পাবে না (তাদের পিতা জীবিত থাকলে তিনি পেতেন; কিন্তু তিনি মৃত, তাই তার সন্তানরা চাচা-ফুফুর মিরাসে ওয়ারিস নয়)।
আল-হিদায়া (মারগিনানি, কিতাবুল ফারায়েজ): "وَالْإِخْوَةُ وَالْأَخَوَاتُ يَرِثُونَ... لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ"
রাদ্দুল মুহতার (খ. ৬, কিতাবুল ফারায়েজ): সহোদর ভাই-বোনের আসাবা সম্পর্কে বিস্তারিত।
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি, খ. ৩, কিতাবুল ফারায়েজ): ভাই-বোনের মিরাস সংক্রান্ত আলোচনা।
৩. স্বামীর ওসিয়ত/দানের বৈধতা ও সীমা
স্বামী যদি বিল্ডিংটি বৃদ্ধার নামে না করে সরাসরি নাতনিদের দান করেন, তাহলে:
- জীবিত থাকাকালীন সম্পূর্ণ হস্তান্তর (কবজ) ছাড়া শর্তযুক্ত দান সহিহ নয় (ইমাম আবু হানিফার মতে)।
- ওসিয়ত হিসেবে হলে—মৃতের সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়ত বৈধ নয়, এবং ওয়ারিসের জন্য ওসিয়ত বৈধ নয়।
হাদিস: "الثُّلُثُ وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ" — "এক-তৃতীয়াংশ, আর এক-তৃতীয়াংশও বেশি।"
— সহিহ বুখারি: ২৭৪২, সহিহ মুসলিম: ১৬২৮
হাদিস: "لَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ" — "ওয়ারিসের জন্য ওসিয়ত নেই।"
— সুনানে তিরমিজি: ২১২১, সুনানে আবু দাউদ: ২৮৭০ (হানাফি ফিকহে গ্রহণযোগ্য)
তবে নাতনিরা এখানে ওয়ারিস নয় (পালক-সম্পর্ক), তাই তাদের জন্য ওসিয়ত করা যেতে পারে—কিন্তু এক-তৃতীয়াংশের সীমার মধ্যে।
৪. বৃদ্ধার জীবদ্দশায় বিল্ডিংয়ের আয়
স্বামীর শর্ত অনুযায়ী বৃদ্ধা জীবিত থাকাকালীন বিল্ডিংয়ের আয় ভোগ করবেন—এটি যদি বৈধভাবে সম্পন্ন হয় (যেমন: বৃদ্ধা নিজেই মালিক, বা নাতনিরা সম্মতি দিয়ে ভাড়া বৃদ্ধাকে দেয়), তাহলে তা জায়েজ। কিন্তু যদি বিল্ডিং বৃদ্ধার সম্পত্তি হয় এবং নাতনিরা জোরপূর্বক দখল করে, তাহলে তা গুনাহ।
৫. সারসংক্ষেপ ও করণীয়
- প্রথমে দলিল দেখে নিশ্চিত হোন—বিল্ডিংটি কার নামে রেজিস্ট্রি, কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে।
- বৃদ্ধার মৃত্যুর পর তার বৈধ ওয়ারিস: জীবিত ৩ ভাই ও ১ বোন। বণ্টন: প্রত্যেক ভাই ২/৭, বোন ১/৭। মৃত ভাইয়ের সন্তানরা পাবে না।
- পালক-কন্যা ও তার কন্যারা মিরাস পাবে না—তবে বৃদ্ধা জীবিত থাকলে তাদের জন্য হিবা (দান) করতে পারেন, যা মৃত্যু-রোগে এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমিত।
- স্বামীর শর্তযুক্ত দান শরীয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন না হলে তা সংশোধন করা প্রয়োজন—স্থানীয় মুফতি সাহেবের পরামর্শ নিন।
- বৃদ্ধার নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ (নগদ, গহনা ইত্যাদি) থাকলে তাও একই নিয়মে বণ্টিত হবে।
বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভি, মিরাস অধ্যায়): "মৃতের আসল ওয়ারিস ছাড়া অন্য কেউ মিরাস পায় না; পালক সন্তান ওয়ারিস নয়।"
মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি, সূরা নিসা ১১-১২-এর তাফসির): ফারায়েজের বিস্তারিত ব্যাখ্যা।
বিশেষ নোট: বাস্তব ক্ষেত্রে সম্পত্তির দলিল, রেজিস্ট্রি, ওসিয়তনামা ইত্যাদি দেখে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা দারুল ইফতার কাছে সরাসরি ফতোয়া নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ ঘটনার সূক্ষ্ম বিবরণ ফতোয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
আল্লাহ ভালো জানেন।