শুক্রবারে একা নফল রোজা রাখা যাবে কি না?
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
Answer
শুক্রবারে নফল রোজা রাখা যায়?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, শুক্রবারে নফল রোজা রাখা যায় — তবে শর্ত হলো, এর সাথে আগের বা পরের দিন মিলিয়ে রাখা, অথবা কোনো কারণ (যেমন মানত, কাজা, শাওয়ালের ছয় রোজা, আরাফা-আশুরার রোজা ইত্যাদি) থাকা। শুধু শুক্রবারকে বিশেষভাবে বেছে নিয়ে একা এক দিন নফল রোজা রাখা মাকরুহে তানযিহি।
১. হাদিসের ভিত্তি
(ক) শুক্রবার একা রোজা রাখার নিষেধাজ্ঞা
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا يَصُومُ أَحَدُكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَّا أَنْ يَصُومَ قَبْلَهُ أَوْ بَعْدَهُ»
অর্থ: "তোমাদের কেউ যেন শুক্রবারে (একা) রোজা না রাখে, তবে যদি তার আগের দিন বা পরের দিনও রোজা রাখে (তাহলে অসুবিধা নেই)।" — সহীহ বুখারী, হাদিস ১৯৮৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৪৪
(খ) অনুমতির দিক
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে অপর বর্ণনায় এসেছে, নবী ﷺ শুক্রবারে রোজা রাখতেন এবং বলতেন:
«إِنَّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ يَوْمُ عِيدٍ، فَلَا تَجْعَلُوا يَوْمَ عِيدِكُمْ يَوْمَ صِيَامٍ، إِلَّا أَنْ تَصُومُوا قَبْلَهُ أَوْ بَعْدَهُ»
অর্থ: "নিশ্চয়ই শুক্রবার হলো ঈদের দিন; সুতরাং তোমরা তোমাদের ঈদের দিনকে রোজার দিন বানাবে না, তবে তার আগে বা পরে (একদিন) রোজা রাখলে ভিন্ন কথা।" — মুসনাদে আহমাদ; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৪১৬ (হাসান)
(গ) হযরত আলী রা.-এর বর্ণনা
«مَنْ صَامَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ صَامَ يَوْمًا مِنَ الْأَيَّامِ»
অর্থ: "যে ব্যক্তি শুক্রবারে রোজা রাখল, সে তো (অন্য) দিনগুলোর একটি দিনই রোজা রাখল।" — ইমাম তহাবী, শরহু মা'আনিল আছার-এ উদ্ধৃত; এতে বোঝা যায়, শুক্রবারকে বিশেষ মর্যাদার দিন হিসেবে আলাদা করে রোজা রাখার নিয়ত করা উচিত নয়।
২. হানাফি ফিকহের বিধান
ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর মত
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানী রহ. আল-আসার-এ এবং ইমাম তহাবী রহ. শরহু মা'আনিল আছার-এ উল্লেখ করেছেন — শুক্রবারে একা নফল রোজা রাখা মাকরুহ। ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর নিকটও এটাই প্রসিদ্ধ মত।
ইমাম ইবনে আবিদিন শামী রহ.-এর বক্তব্য
রাদ্দুল মুহতার (কিতাবুস সাওম) গ্রন্থে ইমাম ইবনে আবিদিন শামী রহ. বলেন:
"وَيُكْرَهُ إفْرَادُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ بِالصَّوْمِ إلَّا إذَا وَافَقَ عَادَةً أَوْ كَانَ لِسَبَبٍ"
অর্থ: "শুক্রবারকে এককভাবে রোজার জন্য নির্দিষ্ট করা মাকরুহ — তবে যদি তা অভ্যাসের সাথে মিলে যায়, অথবা কোনো (শরীয়তসম্মত) কারণ থাকে (তাহলে মাকরুহ নয়)।"
ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানী রহ.
আল-হিদায়া (কিতাবুস সাওম) গ্রন্থে উল্লেখ আছে — শুক্রবার একা রোজা রাখা মাকরুহে তানযিহি; কেননা এতে ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য হয়, যারা শুক্রবারকে বিশেষভাবে রোজার দিন বানায়।
মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.
মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা বাকারার রোজা-সংক্রান্ত আলোচনায় এবং ইসলামী জীবন গ্রন্থে মুফতি শফী রহ. বলেন — শুক্রবার একা নফল রোজা রাখা মাকরুহ; তবে আগের বা পরের দিন মিলিয়ে রাখলে বা কোনো কারণ থাকলে জায়েয।
মুফতি তাকী উসমানী দা.বা.
ফাতাওয়া উসমানী (কিতাবুস সাওম) গ্রন্থে মুফতি তাকী উসমানী দা.বা. স্পষ্ট করেছেন — শুক্রবারকে বিশেষভাবে বেছে নিয়ে একা নফল রোজা রাখা মাকরুহে তানযিহি; কিন্তু যদি কারো অভ্যাস থাকে (যেমন: প্রতি সপ্তাহে সোম-বৃহস্পতিবার রোজা রাখেন এবং শুক্রবারও পড়ে যায়), অথবা মানত/কাজা/সুন্নত রোজা হয়, তাহলে কোনো অসুবিধা নেই।
মুফতি রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ.
ইমদাদুল ফাতাওয়া (খণ্ড ২, কিতাবুস সাওম) গ্রন্থে উল্লেখ আছে — শুক্রবার একা রোজা রাখা মাকরুহ; তবে শুক্রবারের সাথে বৃহস্পতিবার বা শনিবার মিলিয়ে রাখলে মাকরুহ দূর হয়ে যায়।
৩. কোন কোন অবস্থায় শুক্রবারে রোজা রাখা জায়েয?
| অবস্থা | বিধান | |---|---| | বৃহস্পতিবার + শুক্রবার একসাথে | জায়েয (মাকরুহ নয়) | | শুক্রবার + শনিবার একসাথে | জায়েয | | শুক্রবার একা নফল রোজা | মাকরুহে তানযিহি | | রমজানের কাজা রোজা | জায়েয | | মানতের রোজা | জায়েয | | শাওয়ালের ছয় রোজা (শুক্রবারে পড়লে) | জায়েয | | আরাফা/আশুরার রোজা শুক্রবারে পড়লে | জায়েয | | কারো নিয়মিত অভ্যাস (যেমন: একদিন পর একদিন — আইয়ামে বীয) | জায়েয | | অসুস্থতা/সফরের কারণে অন্য দিনে রাখতে না পারার আশঙ্কা | জায়েয |
৪. গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ
১. শুক্রবারের মর্যাদা: শুক্রবার ইসলামে সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এ দিনকে রোজার মাধ্যমে "ঈদের দিন" হিসেবে না রাখাই সুন্নতের নির্দেশনা।
২. ইহুদিদের সাদৃশ্য এড়ানো: ইহুদিরা শুক্রবারকে বিশেষভাবে রোজার দিন হিসেবে পালন করত; তাই শুধু শুক্রবারকে বেছে নিয়ে রোজা রাখা নিষিদ্ধ।
৩. নিয়তের বিষয়: যদি কেউ শুক্রবারকে "বিশেষ ফজিলতের দিন" মনে করে একা রোজা রাখে — এটি নিষিদ্ধ; আর যদি সাধারণ নফল রোজার নিয়তে রাখে এবং আগে-পরে মিলিয়ে রাখে — এটি জায়েয।
৫. সারসংক্ষেপ
- শুক্রবারে একা এক দিন নফল রোজা রাখা মাকরুহে তানযিহি।
- বৃহস্পতিবার বা শনিবার মিলিয়ে রাখলে জায়েয ও সওয়াবের কাজ।
- কাজা, মানত, সুন্নত রোজা (শাওয়ালের ছয়, আরাফা, আশুরা) শুক্রবারে পড়লে কোনো অসুবিধা নেই।
- কারো নিয়মিত অভ্যাস থাকলে শুক্রবারেও রাখতে পারবেন।
সর্বোত্তম পন্থা: শুক্রবারের রোজা রাখতে চাইলে বৃহস্পতিবার বা শনিবারও একদিন রোজা রাখুন — এতে সুন্নতের অনুসরণ ও মাকরুহ থেকে বাঁচা উভয়ই হাসিল হবে।
আরবি মূল ইবারত (রেফারেন্সসহ)
রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সাওম:
«وَيُكْرَهُ إفْرَادُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ بِالصَّوْمِ تَنْزِيهًا إلَّا إذَا وَافَقَ عَادَةً أَوْ كَانَ لِسَبَبٍ كَقَضَاءٍ أَوْ نَذْرٍ أَوْ صَوْمِ سِتٍّ مِنْ شَوَّالٍ»
আল-হিদায়া, কিতাবুস সাওম:
«وَيُكْرَهُ صَوْمُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ وَحْدَهُ إلَّا أَنْ يَصُومَ مَعَهُ يَوْمًا آخَرَ»
শরহু মা'আনিল আছার (ইমাম তহাবী):
«عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: مَنْ صَامَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ صَامَ يَوْمًا مِنَ الْأَيَّامِ»
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।