- সন্দেহ বশত প্রথম স্বামী থেকে তালাক গ্রহণ অতঃপর ইদ্দত পালন পূর্বক বর্তমান স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া কি যাবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
###জবাব
বোন, আপনার মানসিক কষ্ট, অন্তরের আকুলতা এবং আল্লাহর কাছে পবিত্র ও হালাল থাকার ব্যাকুলতা আমরা গভীরভাবে অনুধাবন করছি। প্রথম স্বামীর অহেতুক ও ভিত্তিহীন একটি ফোনের কারণে আপনার মনে যে তীব্র ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ ও শয়তানী প্ররোচনা) তৈরি হয়েছে, তা আপনাকে মানসিকভাবে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
আপনার মনের সমস্ত সংশয় দূর করার জন্য এবং আপনার প্রশ্ন দুটির সুনির্দিষ্ট শরঈ উত্তর ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবের ভিত্তিতে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. আপনার ১ম প্রশ্ন ও তার সুনির্দিষ্ট উত্তর:
"আমি যদি আমার প্রথম স্বামীর থেকে মৌখিক ভাবে আবারো তালাক নেই এবং ইদ্দত পালন করে আমার বর্তমান স্বামীকে আবারো বিয়ে করি তা কি যায়েজ হবে?"
উত্তর: না, প্রথম স্বামীর থেকে পুনরায় নতুন করে তালাক নেওয়া, ইদ্দত পালন করা এবং বর্তমান স্বামীকে পুনরায় আকদ (বিয়ে) করা সম্পূর্ণ অনর্থক কাজ ও সময়ের অপচয় মাত্র। মানসিক শান্তির দোহাই দিয়েও এটি করা শরীয়তে কোনোভাবেই কাম্য হবে না।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ: ১. ১ম স্বামীর সাথে সম্পর্ক ৭ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে: তফউইজে তালাকের (Tafweez-e-Talaq) মাধ্যমে ৭ বছর আগেই ১ম স্বামীর সাথে আপনার বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়ে গেছে। সে এখন আপনার জন্য সম্পূর্ণ পরপুরুষ (গাইর-মাহরাম)। শরীয়তের মূলনীতি হলো— যে নারী যার স্ত্রী নয়, তাকে তালাক দেওয়ার বা তার থেকে তালাক নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই (لا طلاق إلا في ملك)। ২. মিথ্যা স্বীকারোক্তির গুনাহ: ৭ বছর পর ১ম স্বামীর থেকে পুনরায় তালাক চাওয়া মানে পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া যে আপনি এতদিন তার স্ত্রী ছিলেন! এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি, যা শরী'আতে কঠিন গুনাহ। ৩. অন্যের বিবাহিত স্ত্রীকে তালাক দেওয়া অসম্ভব: আপনি বর্তমানে আপনার ২য় স্বামীর শরঈ ও বৈধ স্ত্রী (منكوحة الغير)। একজন বিবাহিতা নারী অন্য কোনো পরপুরুষের থেকে তালাক নিতে পারেন না এবং তার ইদ্দতও পালন করতে পারেন না। ৪. ওয়াসওয়াসার কারণে বৈধ বিয়েকে ভেঙে পুনরায় বিয়ে করা নিষিদ্ধ: শরী'আতে অহেতুক সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে চলমান সঠিক ও হালাল বিবাহকে ভেঙে 'তাজদীদে নিকাহ' (পুনরায় বিয়ে) করা নিষিদ্ধ।
২. আপনার ২য় প্রশ্ন ও তার সুনির্দিষ্ট উত্তর:
"যদি এমনটা করা যায় সেক্ষেত্রে ইদ্দত কি আমার বাবার বাড়িতে পালন করতে হবে নাকি আমার বর্তমান স্বামীর বাড়িতে থাকলেও হবে?"
উত্তর: যেহেতু ১ম স্বামী থেকে পুনরায় তালাক নেওয়া সম্পূর্ণ বাতিল ও নাজায়েয, তাই আপনার ওপর কোনো ইদ্দত আবশ্যকই নয়। আপনাকে কোনো ইদ্দত পালন করতে হবে না, বাবার বাড়িতেও যেতে হবে না এবং বর্তমান স্বামী থেকে পৃথক হওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি আপনার বর্তমান স্বামীর সাথে আগের মতোই স্বাভাবিক ও পবিত্র দাম্পত্য জীবন যাপন অব্যাহত রাখবেন।
৩. ১ম স্বামীর দাবি ও তফউইজে তালাকের (Tafweez-e-Talaq) ফিকহী বাস্তবতা:
আপনার ১ম স্বামী দাবি করেছে— "তার সই ছিল না বা তার পক্ষ থেকে হয়নি বলে তালাক হয়নি।" এটি তার চরম ফিকহী অজ্ঞতা ও সম্পূর্ণ ভুল কথা।
- শরঈ নিয়ম: কাবিননামায় বা চুক্তির সময় স্বামী যখন স্ত্রীকে তালাকের অধিকার অর্পণ করে (তফউইজ করে), তখন স্ত্রী সেই অধিকার ব্যবহার করে নিজের ওপর তালাক প্রয়োগ করলেই তালাক কার্যকর হয়ে যায়। সে মুহূর্তে স্বামীর নতুন করে কোনো সই, মৌখিক অনুমতি বা সম্মতির বিন্দুমাত্র প্রয়োজন হয় না।
- ৭ বছর আগে আপনি যে তফউইজে তালাক নিয়েছেন, তা ইসলামী শরী'আত অনুযায়ী ১০০% সঠিক ও কার্যকর হয়েছিল। আপনি ইদ্দত পালন শেষে ২.৫ বছর পর যে ২য় বিয়ে করেছেন, তাও শতভাগ বৈধ ও হালাল হয়েছে।
৪. মানসিক শান্তি অর্জন ও ওয়াসওয়াসা দূরীকরণের শরঈ সমাধান:
ইসলামী ফিকহের একটি অতি বিখ্যাত মৌলিক নীতি হলো:
«اليقين لا يزول بالشك» (উচ্চারণ: আল-য়াকীনু লা ইয়াযূলু বিশ-শাক্ক) অর্থ: "সুনিশ্চিত বিষয় নিছক কোনো সন্দেহ বা শঙ্কার কারণে বাতিল হয়ে যায় না।"
- ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, দেশের বিজ্ঞ মুফতিগণ এবং রাক্কী সাহেবান—সকলেই আপনাকে নিশ্চিত করেছেন যে আপনার আগের তালাক ও বর্তমান বিয়ে সম্পূর্ণ বৈধ। এটি একটি সুনিশ্চিত সত্য (ইউকীন)।
- শয়তান চায় আপনার সুখী সংসার ভেঙে দিতে এবং আপনার মনে আল্লাহর ভয়কে পুঁজি করে অশান্তি সৃষ্টি করতে। আপনি যদি শয়তানের এই ওয়াসওয়াসার কাছে হার মেনে ১ম স্বামীর কাছে যান বা পুনরায় বিয়ের নাটকীয়তা করেন, তবে আপনার মন কোনোদিন শান্ত হবে না; বরং শয়তান আপনার মনে নতুন নতুন ওয়াসওয়াসা ঢেলে দেবে (যেমন: "১ম স্বামী সঠিক উচ্চারণে তালাক দিল তো?", "ইদ্দত কি ঠিকমতো হলো?" ইত্যাদি)।
- তাই এই শয়তানী ওয়াসওয়াসাকে উপড়ে ফেলা এবং বিজ্ঞ মুফতিগণের ফতোয়ার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই হলো ঈমানী দায়িত্ব ও মানসিক শান্তির একমাত্র পথ।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮৭–৩৮৯ (কিতাবুত তালাক, ২য় পরিচ্ছেদ: 'তফউইজে তালাক ও স্ত্রীর নিজ নফসের ওপর তালাক প্রয়োগের শরঈ নিয়ম — স্বামীর সই বা নতুন অনুমতি ছাড়া তালাক পতিত হওয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৮০ (কিতাবুন নিকাহ, ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ: 'لا يجوز للرجل أن يتزوج زوجة غيره — অপরের বিবাহিতা স্ত্রীকে বিয়ে করা বা তার ওপর তালাক কার্যকর হওয়া অসম্ভব হওয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৮–১৩৯ (অধ্যায়: বাবুত তফউইজ — 'স্ত্রী কর্তৃক তফউইজে তালাক গ্রহণ ও তা পূর্ণাঙ্গ কার্যকর হওয়ার ফতোয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৬, ১২৯–১৩০, এবং ১৩৩–১৩৪ (অধ্যায়: 'বাবুন নিকাহিল فاسد / তাজদীদে নিকাহ — অহেতুক ওয়াসওয়াসা ও সন্দেহের কারণে পুনরায় নিকাহ করা নাজায়েয ও অপ্রয়োজনীয় হওয়ার ফতোয়া')।
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা: ১২১ (ফিকহী কায়দা: 'اليقين لا يزول بالشك — সুনিশ্চিত বিষয় সন্দেহের দ্বারা বাতিল না হওয়া')।
আপনার প্রতি আমাদের আন্তরিক পরামর্শ:
১. ১ম স্বামীর সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করুন: তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিন। সে যদি আবার যোগাযোগের চেষ্টা করে, তবে তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিন যে দেশের মুফতিগণের সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী তালাক কার্যকর হয়ে গেছে এবং তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা শরী'আতে হারাম। ২. বর্তমান স্বামীকে ভালোবাসুন ও সুখে সংসার করুন: আপনি মনে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ রাখবেন না। আপনি আল্লাহর বিচারে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও পবিত্র। ৩. আমল ও দো'আ: প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় ৩ বার করে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস এবং বেশি বেশি «أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» ও «لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ» পাঠ করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার মনকে সুকুন ও মানসিক প্রশান্তি দান করুন, শয়তানের সমস্ত ওয়াসওয়াসা থেকে হিফাযত করুন এবং আপনার বর্তমান দাম্পত্য জীবনে অশেষ বারাকাহ ও ভালোবাসা দান করুন। আমীন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।