পূর্বের বিবাহ ও তালাকের তথ্য গোপন করে নতুন বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো কি শরীয়তসম্মত?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7553
Questioner: Mubasshir Khan
Question Asked: 29 Oct 2026, 04:23 PM
Reviewed & Published: 29 Oct 2026, 04:41 PM
Views: 12
Tokens: 5,570
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার আগে একটি বিয়ে হয়, পরবর্তীতে বনিবনা না হওয়ার কারনে পারস্পরিক সম্মতিতে ডিভোর্স হয়ে যায়, এখন আমি অন্য জায়গায় বিবাহ করতে ইচ্ছুক, কিন্তু সমস্যা হলো যেখানে ই বিবাহের প্রস্তাব দেই দেখা যায় সব শুনে রাজি কিন্তু আগে বিবাহ হয়েছে শুনলে পিছপা হয়ে যায়,এখন আমার বিগত সংসারের কোন চিহ্ন নেই তাই আমি চাচ্ছি বিষয়টি গোপন রেখে মেয়ের পরিবারে প্রস্তাব পাঠাবো,কিন্তু তা কতটুকু শরীয়তসম্মত হবে তা কুরআন সুন্নাহর আলোকে জানালে কৃতজ্ঞ হতাম।

Answer

পূর্বের বিবাহ ও তালাকের তথ্য গোপন করে নতুন বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো: শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

উত্তরঃ-

পূর্বের বিবাহ ও তালাকের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করে প্রস্তাব পাঠানো শরীয়তসম্মত নয়। এটি একদিকে মিথ্যা ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত, অন্যদিকে পাত্রীর পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা—যা তাদের সম্মতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রস্তাবের সময় পাত্রী ও তার অভিভাবককে সততার সাথে অবহিত করাই ইসলামের নির্দেশ।


১. মূল নীতি: প্রতারণা ও মিথ্যা নিষিদ্ধ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا» "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১ (কিতাবুল ঈমান); সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৪৫২

আরেক হাদীসে:

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ» — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ প্রতারণামূলক বর্ণনা ও শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (খণ্ড ৫, কিতাবুল বয়ু', বাবুল খিয়ার; এবং খণ্ড ৪, কিতাবুন নিকাহ)। তিনি স্পষ্ট করেছেন—নিকাহর ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর মাঝে এমন কোনো দোষ/অবস্থা গোপন করা যাবে না, যা জানলে অপরপক্ষ সম্মতি দিত না; এ ধরনের গোপনীয়তা "গিশশ" (প্রতারণা)-এর অন্তর্ভুক্ত এবং তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।


২. কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ» "আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।" — সূরা আল-বাকারা: ৪২

«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ» "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।" — সূরা আত-তাওবা: ১১৯

«إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ...» — সূরা আন-নাহল: ৯০

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ সূরা বাকারার ৪২ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন—সত্য গোপন করা ও মিথ্যার সাথে মিশানো কেবল ইহুদি-খ্রিস্টানদেরই অভ্যাস ছিল না; বরং মুসলিমদেরকেও এ থেকে বেঁচে থাকতে হবে, বিশেষত পারস্পরিক লেনদেন ও চুক্তির ক্ষেত্রে।


৩. হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গি

(ক) নিকাহর ক্ষেত্রে সততা ও পরামর্শ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَلْيَنْظُرْ إِلَيْهَا...» — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৮২; সুনানে তিরমিজি, হাদীস নং ১০৮৭

এবং:

«الدِّينُ النَّصِيحَةُ» (তিনবার) "দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা/সদুপদেশ।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৫

ইমাম তহাবী (রহ.) «শারহু মা'আনিল আছার»-এ এবং ইমাম সারাখসী (রহ.) «আল-মাবসূত»-এ (কিতাবুন নিকাহ) উল্লেখ করেছেন—নিকাহ একটি চুক্তি; চুক্তিতে পক্ষদ্বয়ের জানা-অজানার ভিত্তিতে সম্মতি দিতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোপন করলে তা চুক্তির ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং প্রতারণার শামিল হয়।

(খ) পাত্রী/অভিভাবকের সম্মতি ও "খিয়ার" (বাতিলের অধিকার)

হানাফী ফিকহে নিকাহর ক্ষেত্রে দোষ/অবস্থা গোপন করা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। ইমাম ইবনে আবিদীন «রাদ্দুল মুহতার»-এ (খণ্ড ৪, কিতাবুন নিকাহ, বাবুল খিয়ার) বলেন—যদি পাত্র বা পাত্রী এমন কোনো অবস্থা গোপন করে যা জানলে অপরপক্ষ সম্মতি দিত না, তবে অপরপক্ষের জন্য খিয়ার (বিচ্ছেদের অধিকার) থাকবে; এবং গোপনকারী গুনাহগার হবে।


৪. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের বিশ্লেষণ

প্রশ্ন: "বিষয়টি গোপন রেখে প্রস্তাব পাঠানো যাবে কি?"

উত্তর: না, শরীয়তসম্মত নয়। কারণ:

  1. এটি মিথ্যা/প্রতারণা — আপনি জানেন আপনার পূর্বে বিবাহ হয়েছে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে তা গোপন করছেন। এটি হাদীসে নিষিদ্ধ "গিশশ"।
  2. পাত্রীর সম্মতি অজ্ঞতার ভিত্তিতে হবে — যদি পাত্রী বা তার পরিবার জানত, তারা সম্মতি দিত না (আপনি নিজেই বলেছেন "শুনলে পিছপা হয়ে যায়")। সুতরাং তাদের সম্মতি প্রকৃত সম্মতি নয়; এটি প্রতারিত সম্মতি।

এক্ষেত্রে আপনি চাইলে দুঃস্থ গরিব/অসহায় এতিম/ ডিভোর্সি বা যেসব নারীদের স্বামী মারা গিয়েছে অথবা যাদের বিবাহ হচ্ছে না, তাদেরকে বিবাহ করতে পারেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.