পূর্বের বিবাহ ও তালাকের তথ্য গোপন করে নতুন বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো কি শরীয়তসম্মত?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
পূর্বের বিবাহ ও তালাকের তথ্য গোপন করে নতুন বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো: শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
উত্তরঃ-
পূর্বের বিবাহ ও তালাকের তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করে প্রস্তাব পাঠানো শরীয়তসম্মত নয়। এটি একদিকে মিথ্যা ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত, অন্যদিকে পাত্রীর পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা—যা তাদের সম্মতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রস্তাবের সময় পাত্রী ও তার অভিভাবককে সততার সাথে অবহিত করাই ইসলামের নির্দেশ।
১. মূল নীতি: প্রতারণা ও মিথ্যা নিষিদ্ধ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا» "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১ (কিতাবুল ঈমান); সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৪৫২
আরেক হাদীসে:
«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ» — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ প্রতারণামূলক বর্ণনা ও শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (খণ্ড ৫, কিতাবুল বয়ু', বাবুল খিয়ার; এবং খণ্ড ৪, কিতাবুন নিকাহ)। তিনি স্পষ্ট করেছেন—নিকাহর ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর মাঝে এমন কোনো দোষ/অবস্থা গোপন করা যাবে না, যা জানলে অপরপক্ষ সম্মতি দিত না; এ ধরনের গোপনীয়তা "গিশশ" (প্রতারণা)-এর অন্তর্ভুক্ত এবং তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।
২. কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
«وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ» "আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।" — সূরা আল-বাকারা: ৪২
«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ» "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।" — সূরা আত-তাওবা: ১১৯
«إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ...» — সূরা আন-নাহল: ৯০
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ সূরা বাকারার ৪২ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন—সত্য গোপন করা ও মিথ্যার সাথে মিশানো কেবল ইহুদি-খ্রিস্টানদেরই অভ্যাস ছিল না; বরং মুসলিমদেরকেও এ থেকে বেঁচে থাকতে হবে, বিশেষত পারস্পরিক লেনদেন ও চুক্তির ক্ষেত্রে।
৩. হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গি
(ক) নিকাহর ক্ষেত্রে সততা ও পরামর্শ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَلْيَنْظُرْ إِلَيْهَا...» — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৮২; সুনানে তিরমিজি, হাদীস নং ১০৮৭
এবং:
«الدِّينُ النَّصِيحَةُ» (তিনবার) "দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা/সদুপদেশ।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৫
ইমাম তহাবী (রহ.) «শারহু মা'আনিল আছার»-এ এবং ইমাম সারাখসী (রহ.) «আল-মাবসূত»-এ (কিতাবুন নিকাহ) উল্লেখ করেছেন—নিকাহ একটি চুক্তি; চুক্তিতে পক্ষদ্বয়ের জানা-অজানার ভিত্তিতে সম্মতি দিতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোপন করলে তা চুক্তির ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং প্রতারণার শামিল হয়।
(খ) পাত্রী/অভিভাবকের সম্মতি ও "খিয়ার" (বাতিলের অধিকার)
হানাফী ফিকহে নিকাহর ক্ষেত্রে দোষ/অবস্থা গোপন করা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। ইমাম ইবনে আবিদীন «রাদ্দুল মুহতার»-এ (খণ্ড ৪, কিতাবুন নিকাহ, বাবুল খিয়ার) বলেন—যদি পাত্র বা পাত্রী এমন কোনো অবস্থা গোপন করে যা জানলে অপরপক্ষ সম্মতি দিত না, তবে অপরপক্ষের জন্য খিয়ার (বিচ্ছেদের অধিকার) থাকবে; এবং গোপনকারী গুনাহগার হবে।
৪. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের বিশ্লেষণ
প্রশ্ন: "বিষয়টি গোপন রেখে প্রস্তাব পাঠানো যাবে কি?"
উত্তর: না, শরীয়তসম্মত নয়। কারণ:
- এটি মিথ্যা/প্রতারণা — আপনি জানেন আপনার পূর্বে বিবাহ হয়েছে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে তা গোপন করছেন। এটি হাদীসে নিষিদ্ধ "গিশশ"।
- পাত্রীর সম্মতি অজ্ঞতার ভিত্তিতে হবে — যদি পাত্রী বা তার পরিবার জানত, তারা সম্মতি দিত না (আপনি নিজেই বলেছেন "শুনলে পিছপা হয়ে যায়")। সুতরাং তাদের সম্মতি প্রকৃত সম্মতি নয়; এটি প্রতারিত সম্মতি।
এক্ষেত্রে আপনি চাইলে দুঃস্থ গরিব/অসহায় এতিম/ ডিভোর্সি বা যেসব নারীদের স্বামী মারা গিয়েছে অথবা যাদের বিবাহ হচ্ছে না, তাদেরকে বিবাহ করতে পারেন।