ইস্তেখারা করার পর এর ফলাফল

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7543
Questioner: Humayra Islam
Question Asked: 29 Oct 2026, 02:14 PM
Reviewed & Published: 29 Oct 2026, 02:41 PM
Views: 11
Tokens: 5,692
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম উস্তাদ।
আমার জন্য একটি বিয়ের প্রপোজাল আছে, ছেলের পরিবার মাশাল্লাহ অনেক দ্বীনদার ও ছেলের পরিবারের বেশিরভাগই আলেম। কিন্তু ছেলে নিজে পরিপূর্ণ দ্বীন পালন করেন না যতটুকু তাকে দেখে মনে হয়েছে। বিশেষ করে উনার সুন্নত মোতাবেক দাঁড়ী নেই আবার টাকনুর উপরও প্যান্ট পরেন না। আবার ছেলে পরিবার আমাদের পরিবারের চেয়ে অনেক উপরে যা কুফুর দিকেও মিলে না। তাই আমি ইস্তেখারা করা শুরু করি, ১মদিন ইস্তেখারা করার পর আমি তেমন কিছু বুঝতে পারছিলাম না, তবে হালকা হালকা শান্তি লাগছিল কিন্তু এর পরের ইস্তেখারার পর থেকে অনেক কষ্ঠ ফিল পাচ্ছি। আমি শিউর হতে পারছি না এটা কি ইস্তেখারা করার জন্য হচ্ছে কি না। এমন অবস্থায় কি করা জরুরি?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

উত্তর

ইস্তিখারার ফলাফল কখনো "স্বপ্ন" বা "মনোভাব" দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং ইস্তিখারার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং নিজের সিদ্ধান্ত আল্লাহর উপর সোপর্দ করা। তাই আপনার অনুভূত "কষ্ট" বা "শান্তি" কে ইস্তিখারার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং শরীয়তের মানদণ্ডে বিষয়টি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

ইস্তিখারার মূল শিক্ষা

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইস্তিখারার দুআ শিখিয়েছেন এবং বলেছেন—যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করে, তখন দুই রাকাত নামায পড়ে এই দুআ পড়বে:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ، اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي — أَوْ قَالَ: عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ — فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّهُ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي — أَوْ قَالَ: فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ — فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ، وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ

(সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩৮২; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৩৮; সুনানে তিরমিযী, হাদীস ৪৮০)

এই দুআর শিক্ষা হলো—"দ্বীনের দিক থেকে, জীবন-জীবিকার দিক থেকে এবং পরিণামের দিক থেকে যদি এটা আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা সহজ করে দিন।" অর্থাৎ ইস্তিখারার মূল মাপকাঠি হলো দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ—শুধু মনের আনন্দ-বেদনা নয়।

হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে ইস্তিখারার ফল বোঝার নিয়ম

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «رد المحتار» -এ ইস্তিখারার আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন—ইস্তিখারার পর অন্তরে যে দিক প্রবল হয়, সেদিকে ঝুঁকে পড়া যায়; তবে এটি কোনো ওহী বা চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজতা ও প্রবৃত্তির অনুকূলতার একটি ইশারা। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, নামায অধ্যায়ের ইস্তিখারা প্রসঙ্গ)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ ইস্তিখারার আলোচনায় বলেছেন—ইস্তিখারার পর যে দিকে মন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঝুঁকে যায়, সেদিকেই কাজ করা উচিত; আর যদি উভয় দিক সমান হয়, তবে দ্বীনদার ও নির্ভরযোগ্য أهل الله-দের সাথে পরামর্শ করা। (বেহেশতী জেওর, ইস্তিখারা অধ্যায়)

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ইসলামী বিবাহ পদ্ধতি» ও «ফাতাওয়া উসমানী»-তে উল্লেখ করেছেন—ইস্তিখারার ফলাফল শরীয়তের মানদণ্ডের বাইরে নয়; দ্বীনদারিতা ও চরিত্রই বিবাহের প্রধান মাপকাঠি।

আপনার প্রশ্নের সরাসরি জবাব

১. "১ম দিন শান্তি, পরে কষ্ট" — এটি ইস্তিখারার ফল নয়; বরং এটি সাধারণ মানসিক দ্বিধা, চিন্তা ও শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে। ইস্তিখারার পর শয়তান মানুষকে সংশয় ও কষ্টে ফেলার চেষ্টা করে। তাই শুধু অনুভূতির উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবেন না।

২. "কোনো ইশারা না পেলে কী করব?" — ইস্তিখারার পরও যদি স্পষ্ট কিছু না বোঝা যায়, তবে করণীয় হলো:

  • দ্বীনদার ও অভিজ্ঞ কয়েকজন বিশ্বস্ত আলেম/মুরুব্বির সাথে পরামর্শ করা (ইস্তিখারার সাথে সাথে مشورة বা পরামর্শও সুন্নত)।
  • ছেলের দ্বীনদারিতা, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি বাস্তব বিষয়গুলো যাচাই করা।
  • ইস্তিখারা চালিয়ে যাওয়া, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অধিক তথ্য সংগ্রহ করা।

৩. "কষ্ট হচ্ছে—এটা কি ইস্তিখারার কারণে?" — না, ইস্তিখারার কারণে কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক নয়; ইস্তিখারা তো কল্যাণ প্রার্থনার দুআ। কষ্ট মূলত দ্বিধা, ভয় ও অস্থিরতা থেকে আসে। তাই নিজের মনের অবস্থাকে ইস্তিখারার ফল ভাববেন না।

দ্বীনদারিতা ও দাড়ি-টাখনুর বিষয়ে

আপনি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন—দাড়ি না রাখা, টাখনুর নিচে প্যান্ট পরা—এগুলো সুন্নত ও শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। হাদীসে এসেছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: «الْفِطْرَةُ خَمْسٌ — أَوْ خَمْسٌ مِنَ الْفِطْرَةِ — الْخِتَانُ، وَالِاسْتِحْدَادُ، وَتَقْلِيمُ الْأَظْفَارِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ، وَتَوْفِيرُ اللِّحْيَةِ»

(সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৮৮৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৭)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «مَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الْإِزَارِ فَفِي النَّارِ»

(সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৮৭)

তবে এগুলো ছেলের ব্যক্তিগত দ্বীনি দুর্বলতা; পরিবারের দ্বীনদারিতা তার নিজের দ্বীনদারিতার নিশ্চয়তা নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ»

(সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৬৬)

এই হাদীসের শিক্ষা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য—বিবাহে মূল মাপকাঠি দ্বীনদারিতা। তাই ছেলের দ্বীনি অবস্থা ও ভবিষ্যতে দ্বীন পালনের আগ্রহ-প্রস্তুতি সম্পর্কে সরাসরি জানতে চেষ্টা করুন; পরিবারের দ্বীনদারিতা দিয়ে ছেলের দুর্বলতা ঢেকে ফেলবেন না।

করণীয় (ধাপে ধাপে)

১. ইস্তিখারা চালিয়ে যান, তবে ফলাফল হিসেবে শুধু অনুভূতির উপর নির্ভর করবেন না। ২. ছেলের দ্বীনি অবস্থা, নামায-ইবাদত, চরিত্র ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্রে তথ্য নিন। ৩. অভিজ্ঞ আলেম/মুরুব্বির সাথে পরামর্শ করুন (ইস্তিখারার পাশাপাশি مشورة সুন্নত)। ৪. ছেলের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ থাকলে দ্বীনি বিষয়ে তার মনোভাব জেনে নিন—সে কি দ্বীন পালনে আগ্রহী ও প্রস্তুত? ৫. যদি দ্বীনদারিতা ও চরিত্রে সন্তুষ্টিজনক প্রমাণ না পান, তবে শুধু পারিবারিক মর্যাদার কারণে রাজি হবেন না; বরং আল্লাহর উপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত নিন। ৬. সিদ্ধান্তের পর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন এবং ইস্তিখারার দুআয় বলা হয়—"হে আল্লাহ, কল্যাণকর হলে সহজ করে দিন, অকল্যাণকর হলে দূরে সরিয়ে দিন"—এই বিশ্বাস রাখুন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা

ইস্তিখারা মানে "আমি নিজে সিদ্ধান্ত নেব না, আল্লাহ ঠিক করে দেবেন"—এমন নিষ্ক্রিয়তা নয়; বরং ইস্তিখারা হলো—প্রচেষ্টা, পরামর্শ ও যাচাইয়ের পর আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। তাই আপনার কর্তব্য হলো যথাযথ যাচাই ও পরামর্শ করা, তারপর ইস্তিখারা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আর মনে রাখবেন—কোনো সিদ্ধান্তে কষ্ট হলে সেটা ইস্তিখারার ব্যর্থতা নয়; বরং আল্লাহর পরীক্ষা বা অন্য কোনো কারণও হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন এবং কল্যাণকর সঙ্গী দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.