স্বপ্নে বারবার বিয়ে বা প্রস্তাবের স্বপ্ন দেখার ইসলামিক ব্যাখ্যা।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7539
Questioner: Khadija Nipa
Question Asked: 29 Oct 2026, 01:19 PM
Reviewed & Published: 29 Oct 2026, 02:34 PM
Views: 14
Tokens: 6,985
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার প্রশ্ন হলো, প্রায় দুইবছর আগে আমার একটা প্রপোজল এসেছিলো,অনেকটা আগানোর পর সেটা কেনসেল হয়ে যায়, কিন্তু এরপর থেকে আমার পরিবারের কয়েকজন সদস্য যেমন আমার মা,ছোট বোন, আমার খালাতো বোন, আমার ফুফু স্বপ্নে দেখে তারা আবার আমাকে দেখতে এসেছে বা ঐ ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছে। এই স্বপ্ন একেকজন একাধিক বার দেখেছে কখনো দেখেছে তারা আমাকে দেখতে এসেছে কখনো দেখেছে এই ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিকঠাক। এরকম হয়েছে কয়েকবার, রমযান মাসে আমি খুব করে দোআ করছিলাম একদিন যে যদি তার সাথে বিয়ে হওয়ার থাকে তাহলে আল্লাহ যেনো আমার পরিবারের কাউকে দেখিয়ে দেই, তখন বা এর কিছুদিন পরে আমার ফুফু স্বপ্নে দেখে তার সাথে বিয়ে ঠিকঠাক। এমনকি আমার ছোট নাবালক ভাই সে একদিন স্বপ্নে দেখে যে তারা সবাই চাচারা সহ আমাদের বাসায় আসছে। আরেকটা ব্যপার বলা হয়নি সেটা হলো, তাকে নিয়ে ইস্তিখারা ও করা হয়েছিলো, এবং আমি ইস্তিখারা শেষ করার কয়েকদিন পর স্বপ্নে দেখলাম তার সাথ বিয়ে হয়েছে। এবং আমার পরিবারের সবার ধারনা ছিলো তারা আবার আসবে এবং তার সাথেই বিয়ে হবে। কিন্তু এখন
প্রায় দুইবছর পর এখন ঐ ছেলে বিয়ে করেছে অন্য জায়গায়। এখন তো বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে তার সাথে বিয়ে হওয়ার আর সম্ভবনা নেই। এখন আমার প্রশ্ন হলো, ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা কি হতে পারে? যা দেখেছে আমার পরিবার। কমপক্ষে সবার স্বপ্ন মিলিয়ে তো ১০/১৫ বার তো হবেই।আরো বেশি ও হতে পারে। আরও একদিন আমার বোন দেখেছে তার বাচ্চা হয়েছে আমার থেকে।প্লিজ একটু অনুগ্রহ করে এই স্বপ্নগুলোর তাবির দেন।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নিতে চাই: স্বপ্ন ইসলামে কোনো শরয়ী দলিল বা ভবিষ্যতের নিশ্চিত সংবাদ নয়। স্বপ্ন তিন প্রকার—(১) রহমানির (সত্য/সুসংবাদ), (২) শয়তানি (ভয়/দুঃস্বপ্ন), (৩) নফসানি (নিজের মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিচ্ছবি)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ» — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩

অর্থাৎ ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর (ভয়ংকর/অসঙ্গত) স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। আরও ইরশাদ হয়েছে:

«الرُّؤْيَا ثَلَاثٌ: رُؤْيَا مِنَ اللَّهِ، وَرُؤْيَا مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الرَّجُلُ نَفْسَهُ» — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৫

এবং সবচেয়ে বড় কথা: স্বপ্নের ভিত্তিতে বিয়ে-শাদী, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা কারো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া শরীয়তে বৈধ নয়। ইস্তিখারার মূল উদ্দেশ্যও স্বপ্ন দেখা নয়; বরং আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং অন্তরে যে দিকটি সহজ ও প্রশান্ত হয়, সেদিকে অগ্রসর হওয়া। (দেখুন: ফাতাওয়া উসমানী, ৩/৪৯৮-৫০০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৫৫০ প্রসঙ্গ)


আপনার স্বপ্নগুলোর ব্যাখ্যা (তাবির)

১. একই স্বপ্ন পরিবারের একাধিক সদস্যের দেখা: এটি সাধারণত "রহমানি স্বপ্ন" হিসেবে গণ্য হয় না; বরং পরিবারের সবার মনে ওই ছেলের ব্যাপারে যে প্রত্যাশা, আলোচনা ও ধারণা ছিল, তারই প্রতিফলন (নফসানি স্বপ্ন)। পরিবারে যেহেতু সবাই বিশ্বাস করত "তারা আবার আসবে, বিয়ে হবে"—এই দৃঢ় ধারণাই স্বপ্নে রূপ নিয়েছে। ইবন সীরীন (রহ.) ও অন্যান্য মু'আব্বিরীনের মূলনীতি হলো: স্বপ্ন ব্যাখ্যায় ব্যক্তির অবস্থা, চিন্তা ও পরিবেশ বিবেচনায় নিতে হয়। (তাফসীরুল আহলাম, ইবন সীরীন; তা'তীরুল আনাম ফী তাবীরিল আহলাম)

২. "বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে গেছে" দেখা: এটি সরাসরি ভবিষ্যতের সংবাদ নয়। স্বপ্নে বিয়ে বা সুসম্পর্ক দেখা—যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়—তাহলে এর তাবির হতে পারে: কল্যাণ, সম্মান, জীবনের নতুন অধ্যায়, বা ভবিষ্যতে উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়া। ইবন সীরীন (রহ.) বলেন, স্বপ্নে বিয়ে সাধারণত কল্যাণ ও মিলনের ইঙ্গিত, তবে তা নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথেই হবে—এমন অর্থে নয়। (মুনতাখাবুল কালাম ফী তাফসীরিল আহলাম, পৃ. ২৩০-২৩৫)

৩. "আমাকে দেখতে এসেছে" দেখা: এটি ওই সময়ের প্রত্যাশা ও আলোচনারই প্রতিচ্ছবি; অথবা ভবিষ্যতে সম্মান ও সম্বন্ধের সুসংবাদের ইঙ্গিত হতে পারে—তবে নির্দিষ্ট ওই ছেলের সাথে নয়।

৪. "তার সন্তান আমার থেকে হয়েছে" (বোনের স্বপ্ন): এ ধরনের স্বপ্ন সাধারণত নফসানি বা শয়তানি প্রভাবের অন্তর্ভুক্ত; শরীয়তের দৃষ্টিতে এর কোনো বাস্তব তাৎপর্য নেই। বিশেষত নাবালক ভাইয়ের স্বপ্ন—শিশুদের স্বপ্নকে শরীয়তে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭৭ প্রসঙ্গ; বাহিশতী যেওর, স্বপ্ন অধ্যায়)

৫. ইস্তিখারার পর বিয়ের স্বপ্ন: ইস্তিখারার পর স্বপ্ন দেখা শর্ত নয়, বরং ইস্তিখারার পর অন্তরের প্রশান্তি বা সহজতা দেখা হয়। আপনি ইস্তিখারার পর বিয়ের স্বপ্ন দেখেছেন—এটি আপনার নিজের প্রবল আশা ও দোয়ার প্রতিফলন। আর এখন বাস্তবে ছেলেটি অন্যত্র বিয়ে করেছে—এটি প্রমাণ করে, স্বপ্নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

«وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ» — সূরা বাকারা: ২১৬

অর্থ: "হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর হয়তো কোনো জিনিস ভালোবাসছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।"

এখন করণীয়:

  • এই স্বপ্নগুলোকে ভবিষ্যতের নিশ্চিত সংবাদ মনে করবেন না; বরং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
  • বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে শরীয়তসম্মত পাত্র, দ্বীনদারি, চরিত্র ও পারিবারিক সম্মতি—এসব বিবেচনায়; স্বপ্নের ভিত্তিতে নয়।
  • দুঃস্বপ্ন বা অস্বস্তিকর স্বপ্ন দেখলে বাম দিকে থুতু ফেলা, আউযুবিল্লাহ পড়া, এবং ওই স্বপ্ন কারো কাছে বর্ণনা না করা—এটি সুন্নত। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২)
  • আল্লাহর কাছে কল্যাণের দোয়া করুন: «اللَّهُمَّ اخْتَرْ لِي وَلَا تُخَيِّرْنِي» এবং ইস্তিখারার দোয়া চালিয়ে যান।
  • অতীতের প্রস্তাব নিয়ে দুঃখ না করে সামনে অগ্রসর হোন; আল্লাহ যা করেছেন তাতে কল্যাণ রয়েছে।

সারকথা: আপনার পরিবারের দেখা স্বপ্নগুলো মূলত প্রত্যাশা, আলোচনা ও মনের চিন্তার প্রতিফলন; শরীয়তের দৃষ্টিতে এগুলোকে ভবিষ্যতের নিশ্চিত প্রমাণ বা বিয়ের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করুন এবং কল্যাণ দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.