দ্বীনদারিতা ছাড়া বিয়েতে সম্মতি দেওয়া কি বাধ্যতামূলক? বালিগা কন্যার সম্মতি ছাড়া বিয়ে বৈধ কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। সংক্ষেপে উত্তর হলো—দ্বীনদারিতা ছাড়া বিয়েতে সম্মতি দেওয়া আপনার ওপর ওয়াজিব নয়; বরং দ্বীনদার পাত্র পাওয়ার জন্য চেষ্টা করা আপনার হক ও কর্তব্য। তবে অমুসলিম দেশে বসবাসের বিষয়টি নিজে থেকেই বিয়ের বৈধতা বা অবৈধতার একমাত্র মানদণ্ড নয়; এ বিষয়ে বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো।
১. বিয়েতে সম্মতি (রাজি) ছাড়া বাধ্য করা যাবে না ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ إِلَّا بِإِذْنِهَا»
“কুমারী মেয়েকে তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪১৯
অন্য হাদীসে:
«الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا، وَالْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ»
“প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের চেয়ে বেশি হকদার; আর কুমারীকে অনুমতি জিজ্ঞাসা করতে হবে।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪২১
হানাফি ফিকহের মূলনীতি: প্রাপ্তবয়স্কা (বালিগা) সুস্থ-বুদ্ধিসম্পন্ন নারীর বিয়ে তার সম্মতি ছাড়া সম্পন্ন হলে তা নাফিজ (কার্যকর) হয় না। জবরদস্তিমূলক বিয়ে (نكاح الجبر) শুধু নাবালিগা কন্যার ক্ষেত্রে পিতার জন্য প্রযোজ্য; বালিগা কন্যার ক্ষেত্রে নয়।
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী বালিগা কন্যা নিজেই বিয়ের পক্ষ; পিতা তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দিলে তা কার্যকর হয় না।
— আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ; রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/৫৫-৫৬; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/২৮৩ -
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি, ২/৩০০-এর কাছাকাছি আলোচনা) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী) — সবখানেই বালিগা কন্যার সম্মতিকে শর্ত বলা হয়েছে।
সুতরাং: আপনি প্রাপ্তবয়স্কা হলে, পছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও বাবা-মায়ের জোর করে বিয়ে দিলে তা ইসলামে বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে না। তবে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য নরম ভাষায়, দলিলসহ বুঝানো কর্তব্য।
২. দ্বীনদারিতা: পাত্র নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ»
“নারীর বিয়ে হয় চারটি কারণে—তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও।”
— সহীহ বুখারী, ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, ১৪৬৬
পুরুষের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। দ্বীনদারিতা মানে শুধু নামাজ-রোজা নয়; বরং আমানতদারিতা, চরিত্র, হালাল-হারামের পরওয়া, স্ত্রীর হক আদায়ের দায়িত্ববোধ। যে পাত্র দ্বীনদার নয়, তার সাথে বিয়ে আপনার দ্বীন ও দাম্পত্য জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি।
ফাতাওয়া উসমানি ও বেহেশতি যেওর-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে—দ্বীনদার পাত্র পাওয়ার জন্য চেষ্টা করা, এবং দ্বীনহীন পাত্র প্রত্যাখ্যান করা শরীয়তসম্মত; বরং দ্বীনহীন পাত্রকে গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়া আপনার ওপর ওয়াজিব নয়।
৩. “তাকদিরে যা আছে হবে” — এই যুক্তির ভুল প্রয়োগ
তাকদিরে বিশ্বাস ঈমানের অংশ (সহীহ মুসলিম, ৮)। কিন্তু তাকদিরকে দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত বানানো নাজায়েজ। হাদীসে এসেছে:
«اعْمَلُوا فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ»
“তোমরা আমল করো; প্রত্যেকের জন্য যা সৃষ্টি করা হয়েছে তা তার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে।”
— সহীহ বুখারী, ৪৯৪৫; সহীহ মুসলিম, ২৬৪৭
অর্থাৎ, তাকদিরে বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, দ্বীনদার পাত্র খোঁজা, খারাপ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা — এগুলো আপনার দায়িত্ব। “তাকদিরে যা আছে হবে” বলে দ্বীনহীন পাত্রকে গ্রহণ করা তাকদিরের প্রতি ঈমান নয়; বরং দায়িত্বহীনতা।
ইমদাদুল ফাতাওয়া ও মা’আরিফুল কুরআন-এ সূরা তালাকের তাফসীরে বলা হয়েছে—আল্লাহ তাওয়াক্কুল ও তাদবীর (উপায় অবলম্বন) উভয়কেই নির্দেশ দিয়েছেন; তাদবীর বাদ দিয়ে শুধু তাকদিরের দোহাই দেওয়া ভুল।
৪. অমুসলিম দেশে স্থায়ী বসবাসের বিধান
এ বিষয়ে হানাফি ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা আছে:
-
মূলনীতি: অমুসলিম দেশে বসবাস মূলত জায়েজ, যদি সেখানে নিজের ও পরিবারের ঈমান-আমল, ইবাদত ও হালাল-হারাম রক্ষা করা সম্ভব হয়।
— রাদ্দুল মুহতার, ৪/১২৪-১২৫ (দারুল হারব-দারুল ইসলাম আলোচনা); ফাতাওয়া আলমগিরি, ২/২৩২ -
নিষিদ্ধ বা মাকরুহ তখনই, যখন সেখানে দ্বীন পালনে ফিতনা (ধর্মত্যাগ, হারামে লিপ্ত হওয়া, সন্তানদের ঈমান নষ্ট হওয়া) হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।
— ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৫৬০-এর কাছাকাছি; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৬০-এর কাছাকাছি -
মুফতি তাকি উসমানি (দারুল উলুম করাচি) ও মুফতি মুহাম্মদ শফি (মা’আরিফুল কুরআন, সূরা নিসা ৯৭-১০০-এর তাফসীর) স্পষ্ট করেছেন—হিজরতের হুকুম ব্যক্তিভেদে ভিন্ন; যার দ্বীন রক্ষা সম্ভব, তার জন্য বসবাস জায়েজ; যার জন্য ফিতনা, তার জন্য হিজরত করা কর্তব্য।
সুতরাং: “অমুসলিম দেশে থাকে” — এ কারণেই কোনো পাত্রকে দ্বীনদারিতা যাচাই ছাড়া প্রত্যাখ্যান করা বা গ্রহণ করা—দুটোই ঠিক নয়। প্রধান মানদণ্ড হলো তার দ্বীনদারিতা ও চরিত্র। যদি পাত্র দ্বীনদার হয় এবং সেখানে আপনার দ্বীন রক্ষার নিশ্চয়তা থাকে, তাহলে বসবাসের দেশ বাধা নয়। আর যদি দ্বীনদার না হয়, তাহলে সে যেখানেই থাকুক, বিয়ে করা আপনার জন্য ক্ষতিকর।
৫. আপনার করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)
-
বাবা-মায়ের সাথে ধৈর্য ও নরম ভাষায় কথা বলুন। কুরআনের নির্দেশ:
«وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا» — “মানুষের সাথে সদালাপ করো।” (সূরা বাকারা: ৮৩)
পিতামাতার সাথে সদাচরণ ফরজ (সূরা ইসরা: ২৩-২৪), কিন্তু অবাধ্যতার (গুনাহের) বিষয়ে তাদের আনুগত্য করা যাবে না — «لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ» (মুসনাদ আহমাদ, ১০৯৫; সহীহ)। -
দ্বীনদার পাত্রের খোঁজ শুরু করুন — বিশ্বস্ত আলেম, দ্বীনদার পরিবার, মসজিদ/ইসলামিক সেন্টার, হালাল ম্যাট্রিমোনি সার্ভিসের মাধ্যমে। নিজে উদ্যোগ নিন, শুধু অপেক্ষা করবেন না।
-
পাত্র যাচাই করুন — তার নামাজ, চরিত্র, পারিবারিক দ্বীনি পরিবেশ, স্ত্রীর হক আদায়ের মানসিকতা, এবং ভবিষ্যতে দ্বীন পালনের পরিবেশ আছে কি না।
-
অমুসলিম দেশে বসবাসের শর্ত — যদি পাত্র দ্বীনদার হয় এবং সেখানে দ্বীন পালনের নিশ্চয়তা থাকে, তাহলে দেশ বাধা নয়; তবে সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা, হালাল উপার্জন, ইবাদতের পরিবেশ—এসব নিশ্চিত হতে হবে।
-
জোর করে বিয়ে হলে — শরীয়ত অনুযায়ী তা নাফিজ নয়; তবে এ অবস্থায় সরাসরি সংঘাত না বাড়িয়ে, বিশ্বস্ত আলেম/পরিবারের বড়দের মধ্যস্থতা নিন।
-
দুআ করুন — «رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ» এবং ইস্তিখারা করুন; আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের জন্য যথেষ্ট (সূরা তালাক: ৩)।
সারসংক্ষেপ
- দ্বীনদারিতা ছাড়া বিয়েতে সম্মতি দিতে বাধ্য নন; বালিগা কন্যার সম্মতি ছাড়া বিয়ে হানাফি মাযহাবে কার্যকর নয়।
- “তাকদিরে যা আছে হবে” — এ কথা দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত নয়; তাদবীর (উপায়) অবলম্বন করা শরীয়তের নির্দেশ।
- অমুসলিম দেশে বসবাস নিজে থেকেই বিয়ে হারাম করে না; প্রধান মানদণ্ড পাত্রের দ্বীনদারিতা ও আপনার দ্বীন রক্ষার নিশ্চয়তা।
- দ্বীনদার পাত্রের জন্য চেষ্টা করুন, দুআ ও ইস্তিখারা করুন, পরিবারকে দলিলসহ বুঝান।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন এবং একজন দ্বীনদার, চরিত্রবান ও দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب