"আমি আর নিতে পারছি না" বললে তালাক হয় কি?
Marriage and Divorce · Shafei
Question
মহতারাম মুফতি সাহেব, একজন দ্বীনি বোনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পারিবারিক ও মানসিক পরিস্থিতির শরয়ী হুকুম জানার জন্য মাসআলাটি নিচে বিস্তারিত পেশ করা হলো:
আমি প্রচন্ডভাবে মানসিক অশান্তিতে আছি।
আমি আমার স্বামীকে অত্যন্ত ভালোবাসি এবং আমি কখনোই চাই না যে তালাকের অধিকার আমার কাছে থাকুক। এর পেছনে মূল কারণ হলো— প্রথমত, আমার দীর্ঘদিন ধরে ওয়াসওয়াসা ওসিডি (OCD) এর সমস্যা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আমার সবসময় এই ভয় কাজ করে যে, রাগের মাথায় বা বিরক্তির কারণে কখনো মুখ থেকে এমন কোনো বাক্য বের হয়ে যায় কি না, যার মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ভাঙার বা তালাকের নিয়ত চলে আসে।
মূল ঘটনাটি নিচে দেওয়া হলো:
কিছুদিন আগে স্বামীর সাথে ঝগড়ার একপর্যায়ে স্বামী আমাকে বলেন— "তুই আমাকে ডিভোর্স দিবি?" অথবা "তুই আমাকে ডিভোর্স দিবি" (দুইবারি কথাটি প্রশ্ন আকারে জিজ্ঞেস করে নাকি স্টেটমেন্ট হিসেবে বলছিলেন, তা ঠিক স্পষ্ট মনে নেই।প্রশ্ন আকারেই জিজ্ঞেস করে এইটুকু মনে আছে,স্টেটমেন্ট হিসেবে বলছিলেন কিনা আরেকবার এটা সন্দেহ।
আমার যতদূর মনে পড়ে, স্বামী ওই কথাটি এক বা একাধিকবার বলার পরপরই আমি দৃঢ়তার সাথে বলেছিলাম— "জীবনেও না!"। কারণ আমি কোনো অবস্থাতেই এই অধিকার নিজের কাছে রাখতে চাইনি। তবে এখন আমার মনে সন্দেহ ও খটকা কাজ করছে যে— আমি "জীবনেও না" বলার পরেও স্বামী পুনরায় ঐ কথাটি (তুই আমাকে ডিভোর্স দিবি) বলেছিলেন কি না।
এর কিছুক্ষণ পরে আমাদের ওই একই মজলিসে আমি আমার চরম কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বলতে শুরু করি — "আমি আর নিতে পারছি না।"
কথাটি বলা শুরু করার পর, অর্থাৎ বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই আমার মনে হঠাৎ এই চিন্তা আসে যে, এটি তো কিনায়া (পরোক্ষ) বাক্য। এরপর আমার মধ্যে একধরনের জেদ বা নেতিবাচক অনুভূতি কাজ করে এবং মনে হয় আমি হয়তবা বৈবাহিক সম্পর্ক ভাঙ্গার নিয়তেই কথাটি বলে ফেলছি।
মহতারামের কাছে প্রশ্ন :
আমার স্বামীর সাথে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক ঠিক আছে?
এখন আমার করনীয় কি?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, প্রশ্নের বিবরন মতে স্বামীর সাথে আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক ঠিক আছে আপনার কন্য করনীয় হলো স্বামীর সাথে তালাক চাওয়া ও এ জাতীয় কথা থেকে বিরত থেকে নিশ্চিন্ত মনে ঘর সংসার চালিয়ে যাওয়া।
শাফি'ঈ মাযহাব অনুযায়ী, তালাকের মূল অধিকার স্বামীর কাছে। স্ত্রীর কাছে তালাকের অধিকার কেবল তখনই সাব্যস্ত হয় যখন স্বামী স্পষ্টভাবে তাকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ (তাফবীয) করে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে স্বামী আপনাকে তালাকের অধিকার দেননি; বরং তিনি প্রশ্ন করেছেন—"তুই আমাকে ডিভোর্স দিবি?"—এটি তাফবীয (অধিকার অর্পণ) নয়, বরং একটি জিজ্ঞাসা বা প্রস্তাব মাত্র।
ইমাম নববী (রহ.) «আল-মাজমূ'» গ্রন্থে এবং ইবনু হাজার আল-হায়তামী (রহ.) «তুহফাতুল মুহতাজ»-এ উল্লেখ করেছেন যে, তালাকের তাওকীদ (অর্পণ) স্পষ্ট শব্দে হতে হবে; শুধু জিজ্ঞাসা বা প্রস্তাব দ্বারা তালাকের অধিকার সাব্যস্ত হয় না।
স্বামীর প্রশ্ন: "তুই আমাকে ডিভোর্স দিবি?"
এটি তালাকের তাফবীয নয়। কারণ:
- এটি একটি প্রশ্ন, কোনো স্পষ্ট অর্পণ নয়।
- শাফি'ঈ ফিকহে তাফবীযের জন্য স্পষ্ট শব্দ প্রয়োজন, যেমন: "আমি তোমাকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিলাম" বা "তোমার হাতে তালাক"।
- শুধু জিজ্ঞাসা "তুমি কি ডিভোর্স দিবে?" দ্বারা কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয় না।
সুতরাং, আপনার কাছে তালাকের কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ।
শরয়ী হুকুম
আপনার বিবাহ বহাল আছে। আপনার স্বামীর সাথে আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক ঠিক আছে। কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।
এখন আপনার করণীয়
১. ওয়াসওয়াসা (OCD) সম্পর্কে সচেতন থাকুন
আপনার মূল সমস্যা হলো ওয়াসওয়াসা। শয়তান আপনার মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ»
"আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।" (সূরা বাকারা: ১৬৮)
২. সন্দেহকে উপেক্ষা করুন
যখনই মনে হবে "হয়তো তালাক হয়ে গেছে", তখনই বলুন: "আমি নিশ্চিত যে তালাক হয়নি; এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা।" সন্দেহের পেছনে পড়বেন না।
৩. স্বামীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করুন
স্বামীকে বলুন যে আপনি তাকে ভালোবাসেন এবং তালাকের অধিকার চান না। ঝগড়ার সময় মুখ থেকে খারাপ কথা বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الْغَضَبَ مِنَ الشَّيْطَانِ»
"নিশ্চয়ই রাগ শয়তান থেকে।" (মুসলিম)
৪. দুআ করুন
নিম্নোক্ত দুআ পড়ুন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ»
৫. পেশাদার সহায়তা নিন
আপনার OCD-এর জন্য একজন মুসলিম মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এটি দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়; বরং চিকিৎসা গ্রহণ করা সুন্নাহ।
৬. ভবিষ্যতে সতর্কতা
ঝগড়ার সময় তালাক, ডিভোর্স, বা সম্পর্ক ভাঙার কথা মুখে আনবেন না। রাগের সময় চুপ থাকুন।
والله أعلم بالصواب