বিপদ না আসলে কি আল্লাহর প্রিয় হওয়া যাবে না?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
বিপদ না আসলে কি আল্লাহর প্রিয় হওয়া যাবে না?
ভূমিকা
এই প্রশ্নটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদা ও আধ্যাত্মিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। অনেক মানুষ মনে করেন যে, বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট ছাড়া আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি এমন নয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন, তবে বিপদই একমাত্র পরীক্ষার মাধ্যম নয়। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. আল্লাহর প্রিয় হওয়ার মূল ভিত্তি: ঈমান ও তাকওয়া
আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর নিকট সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যার মধ্যে তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও পরহেজগারি) সর্বাধিক।
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
"নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক মুত্তাকি (আল্লাহভীরু)।"
— (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিয়েছেন:
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
"জেনে রাখো, আল্লাহর বন্ধুদের (অলিদের) কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা সেই লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।"
— (সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩)
শিক্ষা: আল্লাহর প্রিয় হওয়ার প্রধান শর্ত হলো—সঠিক ঈমান ও তাকওয়া। বিপদ বা কষ্ট এর শর্ত নয়। বিপদ ছাড়াও একজন মুমিন তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় হতে পারেন।
২. হাদিসে আল্লাহর প্রিয় বান্দার পরিচয়
(ক) আল্লাহর প্রিয় হওয়ার সর্বোত্তম উপায়
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ قَالَ: مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ...
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বলেছেন: যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সাথে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার বান্দা যে সব কাজের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হয়, তার মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হলো সেই কাজ, যা আমি তার উপর ফরজ করেছি। আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি..."
— (সহিহ বুখারি: ৬৫০২)
শিক্ষা: আল্লাহর প্রিয় হওয়ার সর্বোত্তম পথ হলো—ফরজ ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে পালন করা এবং নফল ইবাদতের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জন করা। এখানে বিপদের কোনো উল্লেখ নেই।
(খ) আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তার পরীক্ষা হয়—তবে বিপদই একমাত্র পথ নয়
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ
"নিশ্চয়ই বড় প্রতিদান বড় পরীক্ষার সাথে সম্পর্কিত। আর আল্লাহ তাআলা যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন, তখন তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলেন। অতঃপর যে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি; আর যে অসন্তুষ্ট হয়, তার জন্য আল্লাহর অসন্তুষ্টি।"
— (সুনানে তিরমিজি: ২৩৯৬; ইবনে মাজাহ: ৪০৩১)
ব্যাখ্যা: এই হাদিস প্রমাণ করে যে, আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকে পরীক্ষা করেন। কিন্তু পরীক্ষা মানেই বিপদ-আপদ নয়। পরীক্ষা হতে পারে:
- ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে (সূরা কাহফ: ৭)
- শত্রু ও প্রতিবেশীর মাধ্যমে
- ইবাদতের পরীক্ষা (যেমন: নামাজে মনোযোগ)
- হালাল-হারামের পরীক্ষা
- দান-সদকার পরীক্ষা
- নফসের পরীক্ষা
(গ) বিপদে ধৈর্য ধারণকারীর প্রতিদান
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
"মুসলিমকে যে কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা পেরেশানি পৌঁছে—এমনকি যে কাঁটা তার শরীরে ফুটে—তা দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।"
— (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩)
শিক্ষা: বিপদ-আপদ গুনাহ মাফের মাধ্যম এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি উপায়। কিন্তু এটি আল্লাহর প্রিয় হওয়ার একমাত্র উপায় নয়।
৩. হানাফি ফিকহ ও আকিদার দৃষ্টিভঙ্গি
(ক) ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর বক্তব্য
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর নৈকট্য (কুরব) অর্জনের মূল ভিত্তি হলো ঈমান, ইবাদত ও তাকওয়া। বিপদ-আপদ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, যা ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করলে প্রতিদান পাওয়া যায়, কিন্তু বিপদ নিজে আল্লাহর প্রিয় হওয়ার শর্ত নয়।
(খ) ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর বক্তব্য
হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর বহিশতী জেওর-এ এবং মালফুযাত-এ উল্লেখ করেছেন:
"আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন, যাতে তার ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি ভরসা প্রকাশ পায়। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় হওয়ার জন্য বিপদই একমাত্র পথ নয়। একজন সুস্থ, সম্পদশালী ও নিরাপদ ব্যক্তিও যদি আল্লাহর হুকুম পালন করে, হারাম থেকে বেঁচে থাকে এবং নফল ইবাদত করে, তবে সে আল্লাহর প্রিয় হতে পারে।"
(খ) মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর বক্তব্য
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা ইউনুসের ৬২-৬৩ আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন:
"আল্লাহর ওলি বা প্রিয় বান্দা হওয়ার শর্ত হলো ঈমান ও তাকওয়া। যে ব্যক্তি ঈমান ও তাকওয়া অর্জন করবে, সে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবে—সে বিপদে থাকুক বা না থাকুক।"
(গ) ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) তাঁর ফাতাওয়া উসমানি-তে এবং মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর প্রিয় হওয়ার জন্য বিপদ-আপদ শর্ত নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, যা ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করলে প্রতিদান পাওয়া যায়।
৪. আল্লাহর প্রিয় হওয়ার প্রকৃত উপায়সমূহ
কুরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহর প্রিয় হওয়ার উপায়গুলো নিম্নরূপ:
| ক্রম | উপায় | দলিল | |------|------|------| | ১ | সঠিক ঈমান ও আকিদা | সূরা হুজুরাত: ১৩ | | ২ | তাকওয়া ও আল্লাহভীতি | সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩ | | ৩ | ফরজ ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে পালন | সহিহ বুখারি: ৬৫০২ | | ৪ | নফল ইবাদতের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জন | সহিহ বুখারি: ৬৫০২ | | ৫ | রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ | সূরা আলে ইমরান: ৩১ | | ৬ | হালাল উপার্জন ও হারাম থেকে বেঁচে থাকা | সহিহ মুসলিম: ১০১৫ | | ৭ | দান-সদকা ও ইহসান | সূরা বাকারা: ১৯৫ | | ৮ | ধৈর্য ও শোকর | সূরা ইবরাহিম: ৭ | | ৯ | তাওবা ও ইস্তিগফার | সূরা নূর: ৩১ | | ১০ | আল্লাহর যিকির | সূরা রাদ: ২৮ |
৫. বিপদ ও নিরাপত্তা—উভয় অবস্থায় আল্লাহর প্রিয় হওয়া সম্ভব
(ক) বিপদে ধৈর্য = প্রতিদান
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
"আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও—যারা বিপদে পড়লে বলে: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব।"
— (সূরা বাকারা: ১৫৫-১৫৬)
(খ) নিরাপত্তায় শোকর = আল্লাহর সন্তুষ্টি
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
"যদি তোমরা শোকর আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেব।"
— (সূরা ইবরাহিম: ৭)
শিক্ষা: বিপদে ধৈর্য এবং নিরাপত্তায় শোকর—উভয়ই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার মাধ্যম। সুতরাং বিপদ না আসলেও আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায়।
৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
কেউ কেউ ভুল ধারণা পোষণ করেন যে, বিপদ না আসলে আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায় না। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। বরং ইসলামের শিক্ষা হলো:
- বিপদ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা—এটি আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য বিশেষ মর্যাদার কারণ হতে পারে, কিন্তু এটি একমাত্র পথ নয়।
- বিপদ কামনা করা উচিত নয়—রাসূলুল্লাহ (সা.) বিপদ কামনা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: "তোমরা বিপদের সাথে সাক্ষাতের কামনা করো না; বরং আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করো।" (সহিহ বুখারি: ২৯৬৬)
- নিরাপত্তা ও সুস্থতা আল্লাহর নিয়ামত—এগুলো শোকরের মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় হওয়ার মাধ্যম।
উপসংহার
প্রশ্নের সরাসরি উত্তর: না, বিপদ না আসলেও আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায়। আল্লাহর প্রিয় হওয়ার মূল শর্ত হলো—সঠিক ঈমান, তাকওয়া, ফরজ ইবাদতসমূহের যথাযথ পালন, নফল ইবাদতের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জন, সুন্নাহ অনুসরণ, হালাল উপার্জন, দান-সদকা, ধৈর্য ও শোকর। বিপদ-আপদ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, যা ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করলে প্রতিদান পাওয়া যায়, কিন্তু এটি আল্লাহর প্রিয় হওয়ার একমাত্র শর্ত বা উপায় নয়। বরং নিরাপত্তা ও সুস্থতায় শোকর আদায়ের মাধ্যমে এবং ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় হওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআনুল কারিম (সূরা হুজুরাত: ১৩; সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩; সূরা বাকারা: ১৫৫-১৫৬; সূরা ইবরাহিম: ৭; সূরা আলে ইমরান: ৩১)
- সহিহ বুখারি: ৬৫০২, ৫৬৪১, ২৯৬৬
- সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩, ১০১৫
- সুনানে তিরমিজি: ২৩৯৬
- ইবনে মাজাহ: ৪০৩১
- ইমাম ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার
- মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, বহিশতী জেওর ও মালফুযাত
- মুফতি মুহাম্মদ শফি, মাআরিফুল কুরআন
- মুফতি তাকি উসমানি, ফাতাওয়া উসমানি
- মুফতি মুহাম্মদ শফি, ইমদাদুল ফাতাওয়া
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।