নারীদের জন্য কাদের সাথে বিবাহ হারাম?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7454
Questioner: Binte Tawfiq
Question Asked: 27 Oct 2026, 08:46 PM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 09:21 PM
Views: 12
Tokens: 5,980
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কুরআনে আল্লাহ পাক পুরুষদের জন্য কাদের বিয়ে করা হারাম তা বলেছেন কিন্থ নারিদের জন্য কাদের বিয়ে করা হারাম তা নেই। এখন নারিদের জন্য কাদের বিয়ে করা হারাম তা দলিল সহ বুঝিয়ে দিলে ভাল হয়। যদি ছেলের জন্য মাকে বিবাহ করা হারাম হয় তবে কি মায়ের জন্যও ছেলেকে বিবাহ হারাম? যদি হারাম হয় কেন হবে? শুধু পুরুষের জন্যই না হারাম। নারির দিক থেকেও কিভাবে হারাম প্রমানিত হচ্ছে? কুরআনে তো শুধু পুরুষের জন্য হারাম বলা।

Answer

নারিদের জন্য কাদের সাথে বিবাহ হারাম — দলিলসহ বিশ্লেষণ

ভূমিকা: প্রশ্নের মূল দাবিটি একটি ভুল ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত

প্রশ্নে বলা হয়েছে—"কুরআনে আল্লাহ পাক পুরুষদের জন্য কাদের বিয়ে করা হারাম তা বলেছেন, কিন্তু নারিদের জন্য কাদের বিয়ে করা হারাম তা নেই।" প্রকৃতপক্ষে এটি সঠিক নয়। কুরআনে যেসব আত্মীয়ের সাথে বিবাহ হারাম বলা হয়েছে, সেখানে ব্যবহৃত শব্দগুলো (مَنْكَحٌ، نِكَاحٌ) উভয় পক্ষকে শামিল করে। আর নারির দিক থেকেও হারাম হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মতের মধ্যে বিদ্যমান। নিচে ধাপে ধাপে তা ব্যাখ্যা করা হলো।


১. সূরা আন-নিসার ২৩ নং আয়াতের ভাষা উভয় পক্ষকে শামিল করে

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُم مِّن نِّسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ وَأَن تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا

"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভাইয়ের কন্যা, বোনের কন্যা, তোমাদের দুধ-মা, দুধ-বোন, শাশুড়ি, তোমাদের স্ত্রীদের গর্ভজাত কন্যারা যারা তোমাদের কোলে প্রতিপালিত হয়েছে... এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী, এবং দুই বোনকে একত্রে রাখা..." (সূরা আন-নিসা: ২৩)

গুরুত্বপূর্ণ দিক: এখানে "তোমাদের মা" (أُمَّهَاتُكُمْ) শব্দটি শুধু পুত্রের দিক থেকে নয়; কন্যার দিক থেকেও তার মা হারাম। কেননা "মা" শব্দটি সম্পর্কের উভয় দিককেই বোঝায়। একইভাবে "তোমাদের কন্যা" (بَنَاتُكُمْ) — পিতার জন্য কন্যা হারাম, মায়ের জন্যও কন্যা হারাম (মা-কন্যার মধ্যে বিবাহ সর্বসম্মতভাবে হারাম)। "তোমাদের ভাইয়ের কন্যা" — চাচার জন্য ভাইয়ের কন্যা হারাম, ফুফুর জন্যও ভাইয়ের কন্যা হারাম। এভাবে প্রতিটি শব্দই উভয় পক্ষের জন্য প্রযোজ্য।

ইমাম আল-জাসসাস (রহ.) তাঁর আহকামুল কুরআন-এ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আয়াতে উল্লিখিত নিষিদ্ধ সম্পর্কগুলো "নসব" (রক্তসম্পর্ক) ও "সিহর" (বিবাহজনিত সম্পর্ক) উভয় দিক থেকেই হারামতা সাব্যস্ত করে; শব্দগুলো পুরুষ-নারী উভয়ের জন্য সাধারণ (عام)।


২. "মা" ও "ছেলে" — সম্পর্কের দ্বিমুখীতা

প্রশ্নে বলা হয়েছে: "যদি ছেলের জন্য মাকে বিবাহ করা হারাম হয় তবে কি মায়ের জন্যও ছেলেকে বিবাহ হারাম?" — উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই হারাম। এবং এর দলিল:

  • কুরআন: "তোমাদের মা" (أُمَّهَاتُكُمْ) শব্দটি মায়ের দিক থেকেও প্রযোজ্য, কারণ মায়ের কাছে ছেলেও "সন্তান" (وَلَد)، আর কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেন, "তোমাদের স্ত্রীদের মা..." ইত্যাদি সম্পর্কগুলো পারস্পরিক। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (কিতাবুন নিকাহ) উল্লেখ করেন, নসব ও মুসাহারাতের কারণে হারামতা পারস্পরিক (মুতাকাবিল), এক পক্ষের জন্য হারাম হলে অপর পক্ষের জন্যও হারাম।

  • হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ "দুধপান দ্বারা সেই সম্পর্কগুলো হারাম হয়, যেগুলো রক্তসম্পর্ক দ্বারা হারাম হয়।" (সহিহ বুখারি: ২৬৪৫; সহিহ মুসলিম: ১৪৪৪)

এই হাদিসের মূলনীতি হলো—হারামতা পারস্পরিক; যেমন রক্তসম্পর্কে পুত্র-মাতার মধ্যে বিবাহ উভয় দিক থেকেই হারাম, তেমনি দুধপানেও।

  • ইজমা: উম্মতের সর্বসম্মত ইজমা রয়েছে যে মা-ছেলের মধ্যে বিবাহ চিরতরে হারাম—উভয় পক্ষের জন্যই। (দেখুন: আল-মাবসুত, সারাখসি; বাদায়েউস সানায়ে, কাসানি; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুন নিকাহ)

৩. নারির দিক থেকে হারাম হওয়ার সরাসরি কুরআনি দলিল

প্রশ্নে বলা হয়েছে "কুরআনে তো শুধু পুরুষের জন্য হারাম বলা।" — এটি সঠিক নয়; কুরআনে নারির দিক থেকেও সরাসরি দলিল আছে:

(ক) সূরা আন-নিসা: ২২ — পিতার স্ত্রী

وَلَا تَنكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاءِ "তোমাদের পিতারা যেসব নারীকে বিয়ে করেছেন, তাদেরকে তোমরা বিয়ে করো না।"

এখানে সম্বোধন পুরুষদের, কিন্তু এর বিপরীত দিকও একই আয়াতে প্রমাণিত—যে নারী কোনো পুরুষের পিতার স্ত্রী ছিলেন, তিনি সেই পুরুষের জন্য হারাম; আর সেই নারীর জন্যও সেই পুত্রের সাথে বিবাহ হারাম, কারণ সম্পর্কটি পারস্পরিক।

(খ) সূরা আন-নূর: ৩১ — নারীদের জন্য সরাসরি নির্দেশ

وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ... "...তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, তাদের পিতা, স্বামীর পিতা, তাদের পুত্র, স্বামীর পুত্র, তাদের ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র... ছাড়া।"

এখানে নারীদের সরাসরি সম্বোধন করে যেসব পুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা বৈধ বলা হয়েছে, তারাই তার মাহরাম। আর মাহরাম হওয়ার অর্থই হলো—তাদের সাথে বিবাহ হারাম। এ আয়াত নারির দিক থেকেও হারাম সম্পর্কের তালিকা দিচ্ছে।

(গ) সূরা আল-বাকারা: ২২১ — মুশরিকদের সাথে বিবাহ

وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّىٰ يُؤْمِنُوا... وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّىٰ يُؤْمِنَّ "তোমরা মুশরিক পুরুষদের সাথে (নারিদের) বিবাহ দিও না, যতক্ষণ তারা ঈমান না আনে... এবং মুশরিক নারীদের সাথে (পুরুষরা) বিবাহ করো না..."

এখানে تُنكِحُوا (বিয়ে দিও না) শব্দটি নারিদের পক্ষ থেকে হারাম হওয়ার সরাসরি দলিল—অর্থাৎ নারীর অভিভাবককে বলা হচ্ছে মুশরিক পুরুষের সাথে তাকে বিয়ে দিতে নিষেধ। এটি প্রমাণ করে নারির জন্যও নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে বিবাহ হারাম হতে পারে।


৪. হানাফি ফিকহের মূলনীতি: হারামতা পারস্পরিক (مُتَقَابِل)

আল-হিদায়া (কিতাবুন নিকাহ)-তে ইমাম আল-মারগিনানি (রহ.) বলেন, নসব, সিহর ও রিদা (দুধপান)—এই তিন কারণে সৃষ্ট হারামতা পারস্পরিক; অর্থাৎ এক পক্ষের জন্য হারাম হলে অপর পক্ষের জন্যও হারাম। রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) এ মূলনীতির সমর্থনে বলেন:

الْحُرْمَةُ تَثْبُتُ مِنَ الْجَانِبَيْنِ "হারামতা উভয় পক্ষ থেকেই সাব্যস্ত হয়।"

ফাতাওয়া আলমগিরি (কিতাবুন নিকাহ, ফাসল ফিল মুহাররামাত) ও বাদায়েউস সানায়ে-তেও একই মূলনীতি বর্ণিত।


৫. "শুধু পুরুষের জন্য কেন নয়" — সম্বোধনের প্রজ্ঞা

কুরআনে অনেক জায়গায় পুরুষকে সম্বোধন করা হয়েছে, কারণ:

  1. আরবি ভাষার রীতি: পুরুষবাচক সর্বনাম (তোমরা) সাধারণত উভয় লিঙ্গকে শামিল করে (তাগলিবের নীতি)।
  2. পরিবারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব: বিবাহের প্রস্তাব, চুক্তি ও অভিভাবকত্ব সাধারণত পুরুষের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তাই সম্বোধন পুরুষকে করা হয়েছে।
  3. আয়াতের শেষে "তোমাদের পুত্রদের স্ত্রী" (وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمْ) — এখানে পুত্রের স্ত্রী পিতার জন্য হারাম; এর বিপরীত দিকও একই আয়াতে প্রমাণিত—সেই নারীর জন্য শ্বশুর হারাম। এভাবে আয়াত নিজেই দ্বিমুখী।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা নিসার ২৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এ আয়াতে বর্ণিত হারাম সম্পর্কগুলো "উভয় পক্ষের জন্য" প্রযোজ্য; কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষকে সম্বোধন করা হয়েছে শুধু ভাষার স্বাভাবিক ধারার কারণে।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.