। স্বামী-স্ত্রীর মাযহাব ভিন্ন হলে কার মাযহাব গ্রহণযোগ্য হবে এবং মাযহাব পরিবর্তনে বাতিলকৃত অধিকার ফিরে আসবে কি না ?
Marriage and Divorce · Shafei
Question
মুহতারাম মুফতি সাহেব, শরীয়তের একটি জটিল মাসআলা জানার জন্য আপনার শরণাপন্ন হলাম।
ঘটনার বিবরণ:
এক দম্পতির মধ্যে স্ত্রী শাফেয়ী মাজহাব অনুসরণ করেন। তবে স্বামী নির্দিষ্ট কোনো মাজহাব অনুসরণ করেন কিনা, তা স্ত্রীর জানা নেই। কিছুদিন আগে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের অধিকার (তাফভীয-ই-তালাক) প্রদান করেন। কিন্তু স্ত্রী তার স্বামীকে অত্যন্ত ভালোবাসেন এবং এই অধিকার নিজের কাছে রাখতে চাননি। তাই তিনি স্বামীকে বলেন তার দেওয়া তালাকের অধিকারটি বাতিল করে দিতে। স্ত্রীর অনুরোধে স্বামী মৌখিকভাবে স্ত্রীকে বলেন, "আমি তোমাকে দেওয়া তালাকের অধিকার বাতিল করলাম।"
শাফেয়ী মাজহাবের নিয়ম অনুযায়ী, স্বামীর এই মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে তালাকের অধিকারটি বাতিল হয়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রশ্ন:
এখন কিছুদিন পর স্ত্রী যদি চিন্তা-ভাবনা করেন বা সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি অন্য কোনো মাজহাব অনুসরণ করবেন—যে মাজহাবের নিয়ম অনুযায়ী স্বামী মুখে বললেও তালাকের অধিকার বাতিল হয় না—তাহলে:
১. যেহেতু স্বামী নির্দিষ্ট কোনো মাজহাব মানেন কিনা তা জানা নেই, তাই তালাকের অধিকার প্রদান এবং তা মৌখিকভাবে বাতিল করার ক্ষেত্রে কার মাজহাব (স্বামীর নাকি স্ত্রীর) গ্রহণযোগ্য হবে?
২. স্ত্রী পরবর্তীতে অন্য মাজহাব অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিলে, স্বামীর পূর্বে মুখে বাতিল করা সেই অধিকারটি কি আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ত্রীর কাছে ফিরে আসবে স্ত্রী অন্য মাযহাবে গেলে যেখানে স্বামী একবার অধিকার দিলে তা বাতিল করতে পারেনা?
Answer
শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী তাফবীয-ই-তালাক বাতিলের মাসআলা
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার উত্থাপিত জটিল ও সংবেদনশীল ফিকহী বিষয়টির শরঈ সমাধান এবং ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব থেকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ বিস্তারিত বিবরণ নিচে পর্যায়ক্রমে প্রদান করা হলো:
১. তালাকের অধিকার প্রদান ও তা বাতিলের ক্ষেত্রে কার মাযহাব গ্রহণযোগ্য হবে?
উত্তর: উক্ত ঘটনার ক্ষেত্রে ঘটনাটি সংঘটিত হওয়ার সময়কালের শরঈ অবস্থা এবং স্বামীর সিদ্ধান্তই মূল ভিত্তিস্বরূপ পরিগণিত হবে।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ: ১. তালাক ও তাফভীযের মূল মালিকানা: ইসলামী শরীয়তে তালাক প্রদান এবং তালাকের অধিকার অন্যকে তাফভীয (হস্তান্তর) করার মূল অধিকার একমাত্র স্বামীর। ২. তৎকালীন আমল ও সম্মতি: স্বামী যখন স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে স্ত্রীরই অনুরোধে স্বামী মুখে তা বাতিল ঘোষণা করেন, তখন স্ত্রী নিজে শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং শাফেয়ী ফিকহ অনুযায়ী স্ত্রীর অনুরোধ ও স্বামীর মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে উক্ত তাফভীযের অধিকারটি চূড়ান্তভাবে বাতিল ও নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ৩. সিদ্ধান্তের চূড়ান্ততা: যেহেতু তৎকালীন সময়ে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতেই শাফেয়ী ফিকহের নিয়ম মেনে অধিকারটি বাতিল করা হয়েছিল, তাই উক্ত বাতিল প্রক্রিয়াটি শরীয়তসম্মতভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৭ (অধ্যায়: তালাক — "তালাক দেওয়ার ক্ষমতা ও অধিকার একমাত্র স্বামীর, স্ত্রীর নয়।")।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৩০ ও ৩৩৫ (কিতাবুত তালাক, ৩য় পরিচ্ছেদ: 'তাফবীযে তালাক ও ইখতিয়ারের বিবরণ')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৫ ও ১৫৩ (অধ্যায়: 'বাবুত তাফবীয — তাফবীযে তালাকের কার্যকারিতা')।
২. স্ত্রী পরবর্তীতে অন্য মাযহাব অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিলে সেই বাতিলকৃত অধিকার কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসবে?
উত্তর: না, স্ত্রী পরবর্তীতে হানাফী বা অন্য কোনো মাযহাব অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিলেও পূর্বে বাতিল হয়ে যাওয়া তালাকের অধিকারটি কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ত্রীর কাছে ফিরে আসবে না।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ:
১. অতীতের নিষ্পন্ন হুকুম অপরিবর্তনীয় (ما مضى لا ينتقض): ফিকহে ইসলামী ও উসূলে ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি হলো—কোনো একটি শরঈ ঘটনা বা লেনদেন যখন তার সংঘটনকালে কোনো গ্রহণযোগ্য মাযহাবের শরঈ নিয়ম অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে ফায়সালা বা বাতিল হয়ে যায়, পরবর্তীতে কোনো পক্ষ মাযহাব পরিবর্তন করলেও অতীতে ঘটে যাওয়া ও নিষ্পন্ন হওয়া বিষয় নতুন করে বাতিল বা উল্টে যায় না।
২. বিলুপ্ত অধিকার পুনরুজ্জীবিত হয় না: শাফেয়ী মাযহাবের নিয়ম অনুযায়ী স্বামী যখন মুখে বাতিল বলেছিলেন, তখনই স্ত্রীর নিকট থাকা তাফভীযের অধিকারটি শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন ও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে স্ত্রী মাযহাব পরিবর্তন করলেও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কোনো অধিকার নিজে নিজে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ নেই।
৩. প্রবৃত্তি ও সুবিধাবাদী মাযহাব পরিবর্তন (তাতাব্বু'উর রুখাছ) নিষিদ্ধ: শরীয়তে নিজ সুবিধা অনুযায়ী যখন-তখন মাযহাব পরিবর্তন করা অথবা কোনো একটা বিষয়ে পূর্বের ফায়সালাকে আবার নিজের পক্ষে আনার উদ্দেশ্যে মাযহাব বদল করা ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী 'তাতাব্বু'উর রুখাছ' (প্রবৃত্তি অনুযায়ী সহজ পথ খোঁজা), যা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয ও অপছন্দনীয়।
৪. বর্তমান অবস্থা: স্ত্রী যদি এখন হানাফী মাযহাবও গ্রহণ করেন, তবুও অতীতে বাতিল হয়ে যাওয়া তাফভীয আর ফিরে আসবে না। বর্তমানে স্ত্রীর নিকট তালাকের কোনো অধিকার অবশিষ্ট নেই। স্বামী যদি ভবিষ্যতে নতুন করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্ত্রীকে আবার তালাকের অধিকার (তাফভীয) প্রদান করেন, কেবল তখনই স্ত্রী সেই অধিকার লাভ করবেন; অন্যথায় নয়।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা: ১২১–১২২ (কায়দা: 'আল-ইয়াকীনু লা ইযালু বিশ-শাক্ক' এবং অতীতের নিষ্পন্ন বিধান বহাল থাকার নিয়ম)।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৫১ (অনুচ্ছেদ: 'তাকলীদ ও ভিন্ন মাযহাব অনুসরণের ফিকহী মূলনীতি — অতীতে নিষ্পন্ন বিষয় মাযহাব পরিবর্তনের কারণে বাতিল না হওয়ার বিবরণ')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৪৯, ১৫২–১৫৩, প্রশ্ন নং: ৯৯৬১ ও ৯৯৬৩ (অধ্যায়: 'বাবুত তাকলীদ — সুবিধাজনক ফতোয়া খোঁজা ও তাতাব্বু'উর রুখাছ নিষিদ্ধ হওয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫৮–২৫৯ (ভূমিকায় 'তাকলীদের বিবরণ ও আবশ্যকতার আলোচনা')।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং শাফেয়ী মাযহাবের উপর অটল রাখুন। আমীন।
ওয়াল্লাহু আ'লাম।