কাফফারা সম্পর্কে জানা
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমার মাসিক আয় ৪০০০ টাকা যার পুরোটাই খরচ করতে হয় আর সঞ্চয় বলতে ৬০০০০ টাকা আছে যা আমি একটা চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত খরচ করতে পারবো,, এই টাকাই আমার শেষ সম্বল তাই আমি রোজা রাখতে চাচ্ছি,,,এখন রোজা রাখলে কি আমার কাফফারা আদায় হবে?
বি.দ্র. কোরআন ছুয়ে ঠিক কি বলেছিলাম তার কিছুই আমার মনে নেই,। শুধু অন্য কাউকে বিয়ে করবো না বলেছিলাম এইটুকুই মনে আছে।
Answer
কাফফারা সম্পর্কে বিস্তারিত জবাব
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
জবাব
১. কুরআন স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করার শরঈ অবস্থান:
- কসমের বিধান: ১৩ বছর বয়সে আপনি যদি বালেগা (প্রাপ্তবয়স্ক) হয়ে থাকেন, তবে কুরআন শরীফ স্পর্শ করে "অন্য কাউকে বিয়ে করব না" বলে প্রতিজ্ঞা করায় তা ফিকহের দৃষ্টিতে একটি শরঈ কসম (যমীন) হিসেবে গণ্য হয়েছিল।
- বর্তমান করণীয়: এখন অন্য কাউকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে সেই কসম বা প্রতিজ্ঞাটি ভাঙা সম্পূর্ণ বৈধ ও শরীয়তসম্মত; বরং সুন্নাত পালনের উদ্দেশ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া আবশ্যক। তবে এই কসম ভাঙার জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করার পাশাপাশি একটি কসমের কাফফারা (Kaffarah of Oath) আদায় করা ওয়াজিব।
২. আপনার জন্য রোযা রাখলে কি কাফফারা আদায় হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩ দিন রোযা রাখলে কসমের কাফফারা আদায় হবে না; বরং আপনাকে ১০ জন মিসকীনকে খাবার দিতে হবে বা এর সমপরিমাণ টাকা প্রদান করতে হবে।
শরঈ কারণ ও ফিকহী ব্যাখ্যা: ১. কাফফারার মূল নিয়ম (ক্রম): কুরআনুল কারীমের সূরা আল-মায়েদার ৮৯ নম্বর আয়াতের স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী কসমের কাফফারা আদায়ের প্রাথমিক নিয়ম হলো:
- ১০ জন মিসকীনকে দুই বেলা পেট পুরে আহার করানো, অথবা
- ১০ জন মিসকীনকে ১টি করে 'সাদকাতুল ফিতর'-এর সমপরিমাণ খাদ্য/টাকা প্রদান করা (বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ জন মিসকীনের জন্য মোট আনুমানিক ১,১৫০ টাকা থেকে ১,৫০০ টাকা), অথবা
- ১০ জন মিসকীনকে ১ জোড়া করে মাঝারি মানের পোশাক দেওয়া। ২. রোযা রাখার শর্ত: শরীয়তের বিধান অনুযায়ী কেবল সেই ব্যক্তিই ৩ দিন ধারাবাহিকভাবে রোযা রেখে কাফফারা দিতে পারবে, যার কাছে ১০ জন মিসকীনকে এক বেলা খাবার দেওয়ার মতো বিন্দুমাত্র কোনো টাকা বা সম্পদ নেই (অর্থাৎ যে চরম অর্থকষ্টে ও সম্পূর্ণ অক্ষম)। ৩. আপনার সামর্থ্যের বিবেচনা: আপনার আয় ৪,০০০ টাকা হলেও আপনার কাছে ৬০,০০০ টাকা সঞ্চয় আছে। ১০ জন মিসকীনের জন্য সাদকাতুল ফিতর বাবদ ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকা খরচ করলে আপনার সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে যাবে না বা আপনার জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়বে না। তাই শরীয়তের বিচারে আপনি কাফফারা আদায়ের আর্থিক সামর্থ্য রাখেন। সামর্থ্য থাকা অবস্থায় রোযা রাখলে কাফফারা আদায় হবে না।
৩. কসমের সুনির্দিষ্ট কথা মনে না থাকার বিধান:
ঠিক কী বাক্যে বলেছিলেন তা হুবহু মনে না থাকলেও যেহেতু মূল বিষয়টি ("অন্য কাউকে বিয়ে করব না") আপনার স্পষ্ট মনে আছে, তাই বিবাহ করার পূর্বে ১০ জন মিসকীনকে ১,২০০–১,৫০০ টাকা (বা খাদ্য) প্রদান করে ১টি কাফফারা আদায় করে নিলেই আপনি এই কসম থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন এবং নিশ্চিন্তে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫৬ (অধ্যায়: কসম, ১ম অনুচ্ছেদ: 'কসমের শর্তাবলি ও নিয়মাবলী')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৯, মাসআলা: ১ ও ২ (অধ্যায়: কসম, ২য় অনুচ্ছেদ: 'কাফফারার বিধান — সামর্থ্যবান ও অক্ষম ব্যক্তির রোযা ও খাদ্য দানের শর্তাবলী')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৬, মাসআলা: ১৮ (কসমের শব্দ মনে না থাকলে তাওবা ও কাফফারার বিধান)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩ ও ৯৫ (অধ্যায়: 'বাবুল আইমান — কসমের কাফফারা ও মিসকীনদের খাদ্য দান')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৭–৩৯ ও ৭৫–৭৬ (কুরআন শরীফ ধরে বলা কসমের হুকুম); এবং পৃষ্ঠা: ৭৭, ৮২–৮৩ (আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রোযা রাখলে কাফফারা না হওয়ার বিবরণ)।
- নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ১২৮ (পরিচ্ছেদ: 'কসমের কাফফারা আদায়ের সঠিক নিয়ম')।
আল্লাহ তাআলা আপনার তাওবা কবুল করুন এবং উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।