ইসলামে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি লাগে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
ইসলামে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি প্রয়োজন?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, ইসলামি শরিয়তে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া শর্ত নয়। তবে একাধিক বিবাহ করা শরিয়তের অনুমতি থাকলেও তা নিছক অধিকার নয়; বরং কঠোর শর্ত ও দায়িত্বের সাথে সম্পৃক্ত। প্রথম স্ত্রীর সাথে ইনসাফ (সমতা) রক্ষা করা ফরজ।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً
"তোমাদের জন্য যেসব নারী হালাল, তাদের মধ্যে দুই, তিন বা চারজনকে বিবাহ করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, তোমরা ইনসাফ করতে পারবে না, তবে একজনকেই বিবাহ করো।" — (সূরা নিসা: ৩)
وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ
"তোমরা কখনোই স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ইনসাফ করতে পারবে না, যদিও তোমরা তা কামনা করো। অতএব তোমরা একজনের প্রতি সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না।" — (সূরা নিসা: ১২৯)
মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) উল্লেখ করেন: এই আয়াতে বহুবিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে ইনসাফের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। ইনসাফ বলতে বাসস্থান, ভরণপোষণ ও রাত যাপনে সমতা বোঝানো হয়েছে; ভালোবাসার তারতম্য মানুষের আয়ত্তের বাইরে।
হাদিসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا دُونَ الْأُخْرَى جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شِقًّا
"যার দু'জন স্ত্রী আছে, আর সে একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে অন্যজনকে অবহেলা করে, সে কিয়ামতের দিন একপাশ বাঁকা অবস্থায় উপস্থিত হবে।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২১৩৩; সুনানে তিরমিজি: ১১৪১)
إِنَّ أَوَّلَ مَا سَيَلِيكَ مِنْ أَمْرِ النَّاسِ...
রাসূল ﷺ বলেছেন: "তোমরা স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।" — (সহিহ মুসলিম: ১২১৮)
শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবি) ও মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ-এ বর্ণিত আছে, নবী ﷺ-এর যুগে সাহাবিগণ একাধিক বিবাহ করেছেন, এবং প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা শরিয়তে উল্লেখ নেই।
হানাফি ফিকহের বিস্তারিত
১. প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শর্ত নয়
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ) ও ফাতাওয়া আলমগিরি (খণ্ড ১, কিতাবুন নিকাহ)-তে স্পষ্ট: দ্বিতীয় বিবাহের বৈধতার জন্য প্রথম স্ত্রীর সম্মতি বা অনুমতি কোনো শর্ত নয়। স্বামী শরিয়তের অনুমতিক্রমে স্বাধীনভাবে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবে।
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ২)-তে উল্লেখ: "একাধিক বিবাহ ইসলামে বৈধ, তবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া শরিয়তের শর্ত নয়। হ্যাঁ, পারিবারিক শান্তি ও সদ্ভাব রক্ষার জন্য তার সাথে পরামর্শ করা উত্তম।"
২. তবে শর্তগুলো কঠোর
আল-হিদায়া (মারগিনানি, কিতাবুন নিকাহ)-তে বলা হয়েছে, বহুবিবাহের অনুমতি ইনসাফের শর্তের অধীন। নিম্নোক্ত বিষয়ে সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব:
- বাসস্থান (সমান মানের ঘর)
- ভরণপোষণ (খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা)
- রাত যাপন (পালাক্রমে সমানভাবে)
- সন্তানদের প্রতি সমান আচরণ
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি, খণ্ড ২)-তে উল্লেখ: "যদি স্বামী ইনসাফ করতে অক্ষম হয় বা আশঙ্কা থাকে, তবে দ্বিতীয় বিবাহ তার জন্য নিষিদ্ধ বা মাকরুহ হবে।"
৩. প্রথম স্ত্রীর ক্ষতিপূরণের অধিকার
বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভি)-তে উল্লেখ: প্রথম স্ত্রী চাইলে বিবাহের সময় চুক্তিতে (নিকাহনামায়) শর্ত দিতে পারে যে, স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে তার তালাকের অধিকার থাকবে। এটি শরিয়তসম্মত শর্ত।
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন বলেন: নিকাহর সময় স্ত্রী নিজের জন্য তালাকের ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফবিজ) শর্ত হিসেবে রাখতে পারে; এটি বৈধ।
৪. ইনসাফ না করতে পারলে
ফাতাওয়া উসমানি-তে সতর্ক করা হয়েছে: কেবল যৌন চাহিদা বা শখ পূরণের জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করা এবং প্রথম স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করা জুলুম। হাদিসে এসেছে:
مَنْ ظَلَمَ امْرَأَةً... "যে ব্যক্তি কোনো নারীর প্রতি জুলুম করবে..." — (সুনানে আবু দাউদ)
ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | প্রথম স্ত্রীর অনুমতি | শর্ত নয়, তবে পরামর্শ উত্তম | | ইনসাফ রক্ষা | ফরজ (ওয়াজিব) | | আর্থিক সক্ষমতা | শর্ত (ভরণপোষণ দিতে হবে) | | নিকাহনামায় শর্ত | প্রথম স্ত্রী তালাকের অধিকার রাখতে পারে | | ইনসাফে অক্ষম হলে | দ্বিতীয় বিবাহ মাকরুহ/নিষিদ্ধ |
উপসংহার
ইসলামে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শরিয়তের শর্ত নয়। তবে এটি নিছক অধিকার নয় — বরং কঠোর দায়িত্ব। ইনসাফ রক্ষা করা ফরজ; অন্যথায় দ্বিতীয় বিবাহ জুলুম হিসেবে গণ্য হবে। প্রথম স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা, তার অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং নিকাহনামায় তার অধিকার সুরক্ষার শর্ত রাখা উত্তম ও বাঞ্ছনীয়।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।