স্ত্রীকে বাড়ীতে রেখে স্বামীর জন্য বিদেশ গমন কি জায়েয?

Family Life · Hanafi

Question No: 7420
Questioner: Jannatul Eshra
Question Asked: 27 Oct 2026, 12:07 AM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 01:50 AM
Views: 11
Tokens: 19,185
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিয়ের এক বছর এখন আমার হাসবেন্ড এর সাথে বিরোধ এর একটাই কারণ তার উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়া আমাদের মাঝে আর কোন বিরোধ নেই সবদিকে সুখী আলহামদুলিল্লাহ। আমার হাসবেন্ড নিজের আমলের বিষয়ে উদাসীন হলেও উচ্চমাপের দ্বীনের জ্ঞান রাখে।
আসলে আমি সব সময় দেশের মধ্যে একটা ছোটখাটো সংসার অতি সাধারণ জীবন নিজেদের জীবনে পরিপূর্ণ দিন চর্চা করা এবং অন্যদেরকেও যথা সম্ভব শামিল করা এরকম স্বপ্ন দেখে এসেছি। কখনোই কোন ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমার ছিল না। আমিও মেধাবী ছাত্রী ছিলাম মা-বাবার অনেক আশা ছিল কিছু করবে কিন্তু মেয়েদের ক্যারিয়ার যেহেতু ঘরকে ঘিরে ইচ্ছা করে নিজের ক্যারিয়ার ড্যামেজ করেছি এবং আমার স্বপ্ন ঘর কেন্দ্রিক হয়ে গেছিল ঘরে বসে দিনের জ্ঞান অর্জন করা। তবে বাংলাদেশের বাইরে যাওয়ার কথা আমি কখনো দুঃস্বপ্নে ও চিন্তা করিনি। আমার স্বামীর পড়াশোনা গবেষণা কেন্দ্রিক যেহেতু বাংলাদেশে কোনো স্কোপ নেই তাই সে বিদেশে যেতে চাই হয়তো পড়াশোনা করে চলে আসতেও পারে বা ওখানে সেটেল। তবে তার কথা সে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয় ,দীনের জন্য অকল্পনীয় কার্য সাধন করার জন্য যেতে চাই, কিন্তু কি কাজ সেটা আমার সামনে মোটেও ক্লিয়ার না। আমার শশুর ননদ সবার অনেক বড় ডিগ্রির লোভ, মানুষের সামনে যেন অহংকার করে বলতে পারে, এবং আমি দেখতেছি তারা যেরকম যেরকম চাই আমার স্বামী এখন বিয়ের পরে এসেও সেই ছোট্ট ছেলের মতোই পাই টু পাই তাদের কথায় চলতেছে, স্ত্রী হিসেবে আমার মতামতের কোনো দাম দেখিনা তার জীবনে ,নিজেকে খুব ফেলনা মনেহয় , আমার চেয়ে আমার বিবাহিত ননদের প্রভাব আমার স্বামীর জীবনে বেশি।তাই সে যতই দ্বীনের বড় কিছু আনজাম দেওয়ার কথা বলুক আমার কাছে মনে হচ্ছে তার পরিবারের মত তার মনের কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা চলে এসেছে। আর তার দেওয়া এই অশান্তির কারণে আমার নিজের দিনচর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ,আমি মানসিকভাবে দুর্বল অশান্তি নিতে পারি না।

এইদিকে আমার পরিবার মোটামুটি দীনের বুঝধারী তবে অনেক বেশি না। আমার একটা ছোট প্রতিবন্ধী বোন আছে এবং কোন ভাই নেই। আমার পরিবার এইজন্য চাইতো আমি যেনো সাবলম্বী হয়ে তাদের পাশে থাকি পরে এটা যখন আমি মানিনি। তখন তারা চাইতো এমন একটা বিয়ে দিতে যেন কাছাকাছি থেকে তাদের বিপদের সময় আমি আমার হাসবেন্ড মানসিক ভাবে বা ফিজিক্যালি পাশে থাকতে পারি আসলে আমার ছোট বোনকে নিয়ে আমার আব্বু অনেক বেশি পরীক্ষার মধ্যে যেতে হয়েছে তাই সে মানসিকভাবে খুব দুর্বল।আর্থিক সামর্থ্য তাদের আছে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আমার হাসবেন্ড তার পড়াশোনা ক্যারিয়ার বিষয়ে আমার বা আমার পরিবারের কোনো তোয়াক্কাই করেনা নিজে এবং তার বাবা যেটা বুঝবে তাই ঠিক মনে করে। সে স্টুডেন্ট অবস্থায় আমি তাকে বিয়ে করেছি ১ বছর সবর করছি যে হাসবেন্ড ইনকামের সাথে যুক্ত হবে তাহলে আমার বাবা এবং শশুর এর উপর ডিপেন্ডেন্সি কমবে কিন্তু সে এখনো ইনকাম করার বদলে বাবার টাকাই পড়তে যেতে ইচ্ছুক।

বিয়ের আগে সে বলেছিলো স্কলারশিপ পেলে ইসলামিক কোন দেশে পিএইচডি করার ইচ্ছা আছে , বিয়ের আগে বিয়ের বিষয়ে আমি চারপাশের অনেক প্রেসারে থাকতাম এইজন্য এই বিষয়ে সবাই আমাকে বুঝিয়ে ছিল বিয়ের পরে দুজন কথাবার্তা বলে এগুলা ঠিক করা যায় যেহেতু অন্য বিষয়গুলো সব ঠিক আছে। এজন্য আমার মনে মনে বিদেশে যাওয়ার কোন ইচ্ছা না থাকলেও আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারিনি।। কিন্তু বিয়ের আগে যখন তিনি দীনের জন্য বিদেশে স্থায়ী হওয়ার কথা বলেছিল তখন আমি বলেছিলাম যে আমি এটা সঠিক মনে করি না যে আমার আশেপাশের কাছের মানুষগুলোকে দিনের দিকে না ডেকে নিজের মত দূরে যায়ে আরামে দিন পালন করব, আমি মনে করি তাদের হক বেশি তাই আমি আগে তাদের দিনের জন্য কাজ করতে চাই এরপরে দূরে যাওয়ার চিন্তা।
এখন এমন অবস্থা হচ্ছে যে তার মনে হচ্ছে আমি তার জন্য পারফেক্ট না আমারও মনে হচ্ছে আমি ভুল করেছিলাম এক বছর আগে এই ধরনের ওয়াসওয়াসা কাজ করছে।



বিদেশ যাওয়া অনেকের কাছে ড্রিম কিন্তু এটা যে আমার কাছে কত বেশি কষ্টের কারণ এটা আমি কখনোই কাউকে বোঝাতে পারবো না। আমি সারাদিন কান্নাকাটি করি।তাহলে দীনের বড় কিছু আনজাম দেওয়ার জন্য (আমার সামনে যদিও ক্লিয়ার না) স্ত্রীর এত কষ্ট তোআক্কা না করা কি ঠিক? অন্য কোন উপায় দেখা কি উচিত নয়, আমার চাওয়া তো শুধু দেশে থাকে!

আমি তো মন থেকে কখনোই তার উপর সন্তুষ্ট হতে পারব না। কারণ সে আমার মা বাবা অসুস্থ বোন পুরা পরিবার থেকে আমাকে সম্পূর্ণ বিছিন্ন করে ফেলতেছে। আমার অসুস্থ ছোট বোনটা ওর প্রয়োজনে কখনো আমার কাছে যেতে পারবে না বা আমি আসতে পারবো না। মেয়েদের কি আসলে স্বামীর কাছে ইসলাম এত অসহায় বলে? আমার এই অসন্তুষ্টি কি ওনার জন্য কোন পাত্তা দেওয়ার মত বিষয় না!


আমি হাজবেন্ডের থেকে এক মাসও দূরে থাকতে চাই না আমার শারীরিকভাবে কষ্ট হবে এটা আমি তাকে বলেছি তাও সে উদাসীন আর এক্ষেত্রে আমি শয়তানের ধোঁকায় পতিত হব কিনা সন্দিহান। কিন্তু এই প্রসেসের মধ্যে দিয়ে ওয়াইফ কে কাছে নিতে ৩/ ৪ /৫ মাস বা বেশি পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। সে কি এভাবে ফেলে রেখে চলে যেতে পারে?



আসলে অনেক বড় জটিল সমস্যা উচিত ছিল অফলাইনে কোন আলেমের পরামর্শ নেওয়া কিন্তু আমি আমার হাজব্যান্ডকে বারবার বলার পরেও তিনি এই ব্যবস্থা করেনি একজন মেয়ে হিসেবে তাই এটা ছাড়া আমার কোন উপায় নেই।

Answer

বিয়ের পর স্বামীর বিদেশ গমন, স্ত্রীর মানসিক কষ্ট ও পারিবারিক দায়িত্ব: ইসলামি দৃষ্টিকোণ

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: এক বছর আগে বিয়ে হয়েছে। স্বামী উচ্চশিক্ষা/গবেষণার জন্য বিদেশ যেতে চান। স্ত্রী চান দেশে থেকে সাধারণ জীবনযাপন করতে এবং অসুস্থ প্রতিবন্ধী বোন ও বাবা-মায়ের পাশে থাকতে। স্বামী তার পরিবারের (বাবা, ননদ) প্রভাবে চলেন বলে স্ত্রীর অভিযোগ। স্ত্রী মানসিকভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, সারাদিন কাঁদছেন। জানতে চান—স্বামীর এভাবে চলে যাওয়া কি ঠিক? স্ত্রীর অসন্তুষ্টি কি বিবেচনাযোগ্য? এ অবস্থায় করণীয় কী?


১. ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও পরামর্শ (শূরা)

ইসলামে দাম্পত্য জীবন হলো পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি ও পরামর্শের সম্পর্ক। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তাদের (স্ত্রীদের) জন্য তোমাদের (স্বামীদের) উপর রয়েছে অধিকার, যেমন তোমাদের জন্য তাদের উপর রয়েছে অধিকার—নিয়ম অনুযায়ী।" — (সূরা বাকারা: ২২৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।" — (সহিহ মুসলিম: ১২১৮; সুনানে আবু দাউদ: ১৯০৫)

অর্থাৎ, স্বামী এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, যা স্ত্রীর জীবনে বড় প্রভাব ফেলে—বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি বিদেশ গমনের মতো বিষয়। এতে স্ত্রীর সম্মতি ও পরামর্শ নেওয়া ইসলামি শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ দাম্পত্যের পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন।

তবে মনে রাখতে হবে—স্বামীর বৈধ শিক্ষা/জীবিকা অর্জনের জন্য সফর ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং জ্ঞান অর্জন ও হালাল উপার্জন ইসলামে উৎসাহিত। কিন্তু সেটা হতে হবে স্ত্রীর অধিকার ও মানসিক সুস্থতার সমন্বয়ের সাথে, একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নয়।


২. স্ত্রীর নাফকা (ভরণপোষণ) ও সহবাসের অধিকার

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, স্বামী বিদেশে গেলে স্ত্রীর নাফকা (খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক) নিশ্চিত করতে হবে। ইমাম হাস্কাফি আল-হিদায়া-তে এবং ইবন আবিদিন রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন—স্বামী অনুপস্থিত থাকলেও স্ত্রীর নাফকা তার দায়িত্বে থাকে; প্রয়োজনে তার সম্পত্তি থেকে আদায় করা যায়।

তবে স্ত্রীর সাথে সহবাস (ইস্তিমতা) ও companionship-এর অধিকার সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন—স্বামী দীর্ঘ সময় স্ত্রীকে ছেড়ে থাকলে তা স্ত্রীর জন্য কষ্টদায়ক এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। ইমাম তাহতাবি ও অন্যান্য হানাফি ফুকাহা উল্লেখ করেছেন—স্বামী চার মাসের বেশি দূরে থাকলে স্ত্রী বিচারকের কাছে অভিযোগ করতে পারেন (তবে এটি তালাকের কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না, তা বিচারকের বিবেচনাধীন)।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

"স্বামী যদি স্ত্রীকে ছেড়ে দীর্ঘ সফরে যায় এবং স্ত্রীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে বিচারক তাকে ফিরিয়ে আনতে বা নাফকা নিশ্চিত করতে আদেশ দিতে পারেন।"

তবে আপনার ক্ষেত্রে স্বামী শিক্ষার উদ্দেশ্যে যেতে চান—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ। এখানে সরাসরি বিচারকের দ্বারস্থ হওয়ার আগে পারিবারিক পরামর্শ ও সমঝোতার চেষ্টা জরুরি।


৩. স্ত্রীর মানসিক কষ্ট ও স্বামীর দায়িত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" — (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)

আরও বলেছেন:

"মুমিন পুরুষ মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না। যদি তার একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে অন্যটি পছন্দ হবে।" — (সহিহ মুসলিম: ১৪৬৯)

আপনার স্বামীর উচিত—আপনার মানসিক কষ্টকে হালকাভাবে না নেওয়া। আপনি সারাদিন কাঁদছেন, এটা একটি গুরুতর বিষয়। ইসলামে স্ত্রীর মনোভাব ও আবেগের প্রতি সহানুভূতি দেখানো স্বামীর দায়িত্ব। ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) দাম্পত্য কলহ নিরসনে স্বামীকে ধৈর্য ও স্ত্রীর কথা শোনার গুরুত্ব দিয়েছেন।

তবে একইসাথে আপনারও কিছু বিষয় বিবেচনা করা জরুরি—নিচে সেগুলো আলোচনা করছি।


৪. "দীনের জন্য বিদেশে স্থায়ী হওয়া" — একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা

আপনি বলেছেন, স্বামী দীনের জন্য বিদেশে স্থায়ী হতে চান। এখানে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার:

ক) দীনের খিদমতের নামে পরিবার ত্যাগ করা ইসলামসম্মত নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমরা দুনিয়ায় প্রবৃত্ত হও, আখিরাতের জন্য কাজ করো—কিন্তু পরিবারের প্রতি দায়িত্বও পালন করো।" (মাফহুম—হাদিসের সারমর্ম; দেখুন: সহিহ বুখারি: ১৯৭৫-এ সাওম ও পরিবারের হক নিয়ে হাদিস)

একটি বিখ্যাত হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন:

"নিশ্চয়ই তোমার উপর তোমার পরিবারেরও হক রয়েছে।" — (সহিহ বুখারি: ১৯৭৫; সহিহ মুসলিম: ১১৫৯)

ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) এবং মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন—দীনের খিদমতের নামে পারিবারিক দায়িত্ব অবহেলা করা ইসলামের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

খ) তবে বিদেশে বৈধ শিক্ষা অর্জন নিষিদ্ধ নয়।

যদি স্বামী সত্যিই ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি/গবেষণা করতে চান এবং সেখানে হালাল পরিবেশ, দ্বীন পালনের সুযোগ থাকে, তবে এটি নিষিদ্ধ নয়। বরং ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য সফরকে ফুকাহায়ে কেরাম উৎসাহিত করেছেন। ইমাম শাফি, ইমাম বুখারি (রহ.) প্রমুখ বিদেশ সফর করে জ্ঞান অর্জন করেছেন।

কিন্তু শর্ত হলো:

  1. স্ত্রীর সম্মতি ও সমঝোতা।
  2. স্ত্রীর নাফকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
  3. স্ত্রীকে দীর্ঘকাল একা ফেলে না রাখা—অন্তত তাকে সাথে নেওয়ার চেষ্টা করা, অথবা ঘন ঘন ফিরে আসা।
  4. পরিবারের (বাবা-মা, অসুস্থ বোন) প্রতি দায়িত্বও পালন করা।

৫. স্ত্রীর করণীয় — ধাপে ধাপে ইসলামি সমাধান

ধাপ ১: স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণ আলোচনা (শূরা)

আপনি একা কাঁদছেন, কিন্তু স্বামীকে আপনার মনের কথা শান্তভাবে, অভিযোগের সুর ছাড়া বুঝান। ইসলামে স্ত্রীর মতামতের গুরুত্ব আছে। আয়েশা (রা.)-এর সাথে রাসূল ﷺ পরামর্শ করতেন—এটি সুন্নাহ।

কথা বলার পদ্ধতি:

  • প্রথমে তার ভালো দিকগুলোর প্রশংসা করুন (আপনি বলেছেন—সবদিকে সুখী, দ্বীনের জ্ঞান আছে)।
  • তারপর আপনার কষ্টের কথা বলুন—"আমি তোমার দ্বীনি খিদমতের ইচ্ছাকে সম্মান করি, কিন্তু আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি।"
  • একসাথে সমাধান খুঁজুন—যেমন: "তুমি বিদেশ যাও, কিন্তু আমাকে সাথে নেওয়ার চেষ্টা করো" অথবা "প্রথমে দেশে থেকে গবেষণার স্কোপ খোঁজো" অথবা "তুমি গেলে প্রতি ৩ মাসে ফিরে আসো।"

ধাপ ২: উভয় পরিবারের বড়দের মধ্যস্থতা

আপনার বাবা ও শ্বশুরকে বিষয়টি জানান। ইসলামে পারিবারিক বিরোধে বড়দের পরামর্শ নেওয়া সুন্নাহসম্মত। ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) দাম্পত্য কলহে পারিবারিক মধ্যস্থতার গুরুত্ব দিয়েছেন।

ধাপ ৩: একজন বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ

আপনি অফলাইনে আলেমের পরামর্শ নিতে চেয়েছিলেন—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি/আলেমের সাথে সরাসরি দেখা করুন। স্বামীকে সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। যদি না আসেন, আপনি একা যান—স্ত্রীরও নিজের দ্বীনি ও মানসিক সমস্যার সমাধানে আলেমের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার আছে।

ধাপ ৪: ধৈর্য ও দুআ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও।" — (সূরা বাকারা: ১৫৩)

আপনি বলেছেন—"আমি শয়তানের ধোঁকায় পতিত হব কি না সন্দিহান।" এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসচেতনতা। শয়তান দাম্পত্যে বিভেদ সৃষ্টি করে (সহিহ মুসলিম: ২৮১৩)। তাই রাগের সময় ধৈর্য ধরা, বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দুআ করা জরুরি।


৬. আপনার কিছু দাবি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

আপনি বলেছেন—"আমি মন থেকে কখনোই তার উপর সন্তুষ্ট হতে পারব না।" এখানে কয়েকটি বিষয় স্মরণ রাখুন:

ক) স্বামীর বৈধ কাজে অসন্তুষ্টি কি ইসলামসম্মত?

যদি স্বামী বৈধ শিক্ষা অর্জনের জন্য যায় এবং স্ত্রীর নাফকা ও অধিকার নিশ্চিত করে, তবে শুধু "আমি দেশে থাকতে চাই" এই কারণে তাকে বাধা দেওয়া ইসলামি দৃষ্টিতে সমীচীন নয়। তবে যদি সে স্ত্রীর অধিকার লঙ্ঘন করে, তাকে দীর্ঘকাল একা ফেলে রাখে, নাফকা না দেয়—তাহলে আপনার অভিযোগ বৈধ।

খ) "মেয়েদের ইসলামে এত অসহায়" — এই ধারণা সঠিক নয়।

ইসলামে নারীকে অনেক অধিকার দিয়েছে—সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকারের অধিকার, সম্মতিতে বিয়ের অধিকার, নাফকা ও নিরাপত্তার অধিকার, খোলা (তালাকের আবেদন) করার অধিকার। রাসূল ﷺ স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করতেন, তাদের সম্মান করতেন। বাহিশতী জেওর-এ হযরত থানভি (রহ.) নারীর অধিকার ও সম্মান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তবে হ্যাঁ—স্বামীর অবাধ্যতা বা একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত ইসলামে সমর্থিত নয়। আপনার অসন্তুষ্টি বৈধ কারণ থাকলে গুরুত্বপূর্ণ।

গ) "আমি ভুল করেছিলাম" — এই আত্মদোষারোপ থেকে বেরিয়ে আসুন।

বিয়ের আগে আপনি স্পষ্ট বলেছিলেন—আপনি দূরে গিয়ে আরামে দিন পালন সমর্থন করেন না। এটি আপনার সৎ মতামত ছিল। এখন সমাধান খোঁজা জরুরি, নিজেকে দোষারোপ নয়।


৭. সরাসরি প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্ন ১: দীনের বড় কাজের জন্য স্ত্রীর এত কষ্ট তোয়াক্কা না করা কি ঠিক?

উত্তর: না, ঠিক নয়। ইসলামে স্ত্রীর মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা স্বামীর দায়িত্ব। রাসূল ﷺ বলেছেন—"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)। দীনের খিদমতের নামে স্ত্রীর কষ্ট উপেক্ষা করা ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। তবে স্ত্রীরও উচিত স্বামীর বৈধ ইচ্ছাকে সম্মান করা এবং সমঝোতার পথ খোঁজা।

প্রশ্ন ২: অন্য কোনো উপায় দেখা কি উচিত নয়?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই উচিত। উপায়গুলো:

  • স্বামীকে দেশে থেকে গবেষণার বিকল্প খুঁজতে বলা (অনলাইন গবেষণা, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযোগ)।
  • স্বামীকে সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা (যদি সম্ভব হয়)।
  • স্বামী গেলে প্রতি ৩-৪ মাসে ফিরে আসার শর্ত।
  • পারিবারিক মধ্যস্থতা ও আলেমের পরামর্শ।

প্রশ্ন ৩: আমার অসন্তুষ্টি কি তার জন্য পাত্তা দেওয়ার মতো বিষয় না?

উত্তর: অবশ্যই পাত্তা দেওয়ার মতো বিষয়। স্ত্রীর অসন্তুষ্টি ও কষ্ট স্বামীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অসন্তুষ্টির কারণ বৈধ হতে হবে। আপনি যদি শুধু "দেশে থাকতে চাই" এই কারণে বাধা দেন, আর স্বামীর বিদেশ যাওয়া বৈধ শিক্ষার জন্য হয় এবং সে আপনার নাফকা ও অধিকার নিশ্চিত করে—তাহলে শুধু এই কারণে অসন্তুষ্ট থাকা ইসলামি দৃষ্টিতে সমীচীন নয়। কিন্তু যদি সে আপনার অধিকার লঙ্ঘন করে, দীর্ঘকাল একা ফেলে রাখে, নাফকা না দেয়—তাহলে আপনার অসন্তুষ্টি বৈধ।

প্রশ্ন ৪: ৩/৪/৫ মাস বা বেশি দূরে থাকলে শয়তানের ধোঁকায় পতিত হব কি না সন্দিহান—এটা কি ঠিক?

উত্তর: আপনার এই ভয় বৈধ। ইসলামে দাম্পত্যে সহবাস ও companionship গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী দীর্ঘকাল দূরে থাকলে ফিতনার আশঙ্কা থাকে। তাই স্বামীর উচিত—সম্ভব হলে স্ত্রীকে সাথে নেওয়া, অথবা ঘন ঘন ফিরে আসা, অথবা স্ত্রীর সম্মতি নিয়ে যাওয়া। ফাতাওয়া আলমগিরি ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে—স্বামী দীর্ঘ সফরে গেলে স্ত্রীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে বিচারক হস্তক্ষেপ করতে পারেন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.