ইসলামে মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে কি বৈধ? পাত্র পছন্দে মেয়ের মতের প্রাধান্য কতটুকু? বাবা-মায়ের পছন্দে রাজি না হলে কি অবাধ্যতা ও গুনাহ হয়?

Family Life · Hanafi

Question No: 7416
Questioner: Dutty Hussnin
Question Asked: 26 Oct 2026, 10:32 PM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 01:42 AM
Views: 25
Tokens: 5,572
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন মেয়ে আমার বয়স ৩০ বছরের বেশি। আমার বাবা মা আমাকে বিয়ে দিতে চায়। আমিও বিয়ে করতে চাই, কিন্তু পাত্রের ক্ষেত্রে আমার কিছু শর্ত আছে। আমি এমন একজন পাত্র চাই যে দেশের বাইরে থাকে, ইন্জিনিয়ার, উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছে দেশের বাইরে থেকে, একজন দ্বীন দার ছেলে, আমার থেকে বয়শে বড়, ছোট নয় , সৎ এমন ছেলে বিয়ে করতে চাই। আমি নিজেও ইন্জিনিয়ারিং পাশ করেছি । আমি পর্দা করার জন্য বোরখা পরি, আমি একটা চাকরী করি। তবে আমি উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চাই। আমার বাবা মা এমন পাত্র না নিয়ে এসে, আমার জন্য দেশেই সরকারি চাকরি করে এইরকম ছেলে নিয়ে আসে। তবে তারা অতটা দ্বিনদার নয়। আমার চেয়ে বয়সে ছোট। এই ক্ষেত্রে আমি বিয়েতে রাজি না হলে কি অবাধ্যতা হয়ে যাবে। আমার গুনাহ হবে। মেয়েদের মতের প্রাধান্য কতটুকু ?

Answer

পাত্র নির্বাচনে মেয়ের মতের প্রাধান্য ও পিতামাতার অবাধ্যতার বিধান

সংক্ষিপ্ত উত্তর

ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে কনের সম্মতি অপরিহার্য। জোরপূর্বক বিয়ে ইসলামে নিষিদ্ধ ও বাতিলযোগ্য। আপনার বাবা-মা যে পাত্র পছন্দ করেছেন তাতে আপনি রাজি না হলে এবং তাতে সম্মতি না দিলে এটি অবাধ্যতা (আক-ই-ওয়ালিদাইন) হিসেবে গণ্য হবে না, বরং এটি আপনার শরীয়তপ্রদত্ত অধিকার। তবে পিতামাতার সাথে সদাচরণ, সম্মান ও ভদ্র ভাষায় আলোচনা করা আবশ্যক।


১. কনের সম্মতি ছাড়া বিয়ে বৈধ নয়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ»

"কোনো বিধবা নারীকে তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না, আর কুমারী মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।" — সহীহ বুখারী, হাদিস ৫১৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪১৯

অন্য হাদিসে:

«الْبِكْرُ تُسْتَأْذَنُ فِي نَفْسِهَا»

"কুমারী মেয়ের নিজের ব্যাপারে তার অনুমতি নিতে হবে।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪২১

আপনি ৩০ বছরের বেশি বয়সী, কর্মজীবী ও শিক্ষিত — আপনার সম্মতি আরও বেশি জরুরি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে প্রাপ্তবয়স্কা কন্যার সম্মতি ছাড়া পিতা-কর্তৃক বিয়ে দেওয়া নাফিজ (কার্যকর) হয় না।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৩, পৃ. ৫৬ — "لا تجوز على بالغة بغير رضاها" (প্রাপ্তবয়স্কার সন্তুষ্টি ছাড়া বিয়ে জায়েজ নয়)
  • আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ — বালিগা কন্যার সম্মতির শর্ত
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ২৭৬

২. জোরপূর্বক বিয়ে বাতিলযোগ্য

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, পিতা যদি প্রাপ্তবয়স্কা কন্যাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেন, তবে তা মওকুফ (স্থগিত) থাকে — মেয়ে সম্মতি দিলে কার্যকর হবে, না দিলে বাতিল। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে তা বাতিল।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৬
  • বাহিশতী জেওর, নিকাহ অধ্যায় — "মেয়ের সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেওয়া জায়েজ নয়"

৩. পাত্র নির্বাচনে মেয়ের মতের প্রাধান্য

শরীয়তে কুফু (সামঞ্জস্য) বিবেচনায় রাখা সুন্নত — দ্বীনদারি, চরিত্র, শিক্ষা, বয়স ইত্যাদি। হাদিসে এসেছে:

«تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ»

"নারীকে চারটি কারণে বিয়ে করা হয় — তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও।" — সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৬

আপনার শর্তগুলো (দ্বীনদার, বয়সে বড়, শিক্ষিত, প্রবাসী) শরীয়তসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত। তবে মনে রাখবেন — সব শর্ত একসাথে পাওয়া কঠিন হতে পারে; অগ্রাধিকার দিন দ্বীন ও চরিত্রকে। মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন, বিয়েতে দ্বীনদারি ও চরিত্রই মূল মাপকাঠি, বাহ্যিক শর্তগুলো গৌণ।

রেফারেন্স:

  • মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১৯-এর তাফসীর — নারীর সম্মতির গুরুত্ব
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২ — কন্যার সম্মতি ও পাত্র নির্বাচন প্রসঙ্গে

৪. অবাধ্যতা (আক-ই-ওয়ালিদাইন) কখন হয়?

পিতামাতার অবাধ্যতা তখনই হয় যখন তারা শরীয়তসম্মত কোনো আদেশ দেন এবং সন্তান তা অমান্য করে। কিন্তু বিয়ে একটি ব্যক্তিগত অধিকার, এবং শরীয়ত আপনার সম্মতিকে শর্ত করেছে। তাই ভিন্ন পাত্রে রাজি না হওয়া অবাধ্যতা নয়।

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

«وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ»

"তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — সূরা আন-নিসা ৪:১৯

আর পিতামাতার ব্যাপারে:

«وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا»

"পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩

অর্থাৎ, না বলার অধিকার আছে, কিন্তু অসম্মান বা রুক্ষ আচরণের অধিকার নেই।

রেফারেন্স:

  • তাফসীরে উসমানি, সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩
  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩ — "لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق" (সৃষ্টির আনুগত্য স্রষ্টার অবাধ্যতায় নয়)

৫. করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)

  1. ভদ্রভাবে আলোচনা করুন — বাবা-মাকে বুঝান যে আপনি বিয়ে করতে চান, কিন্তু পাত্র পছন্দে শরীয়ত আপনার সম্মতি চায়।
  2. আপনার শর্তগুলো স্পষ্ট করুন — দ্বীনদারি ও চরিত্রকে প্রধান করুন, বাকি শর্তে কিছুটা নমনীয়তা রাখুন।
  3. জোরপূর্বক বিয়ে হলে — কাজী/ইসলামি স্কলারের মাধ্যমে তা বাতিল করানোর অধিকার আপনার আছে।
  4. ধৈর্য ও দু'আ — সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪-এর দু'আ পড়ুন: «رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ»
  5. ইস্তিখারা করুন এবং একজন বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন।

উপসংহার

  • আপনার সম্মতি ছাড়া বিয়ে শরীয়তসম্মত নয়।
  • ভিন্ন পাত্রে রাজি না হওয়া অবাধ্যতা নয়, গুনাহ নয় — এটি আপনার শরীয়তপ্রদত্ত অধিকার।
  • তবে পিতামাতার সাথে সদাচরণ, সম্মান ও ধৈর্য অবশ্যই রক্ষা করুন।
  • বিয়ের সিদ্ধান্তে দ্বীনদারি ও চরিত্র-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিন, বাকি শর্তে বাস্তবতা বিবেচনা করুন।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.