মায়ের গালিগালাজ ইসলামে কী বলে
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার প্রতি আম্মুর গালিগালাজ, অপবাদ ও বদদোয়া অন্যায় ও গুনাহ; আল্লাহ তা কবুল করবেন না — বরং এতে আম্মু নিজেই গুনাহগার হবেন। তবে সন্তান হিসেবে আপনার উপর আম্মুর সদ্ব্যবহার ও আনুগত্য (যা গুনাহ নয়) ফরজ। আপনি সাধ্যমত খেদমত করেছেন — এটাই যথেষ্ট; আপনার উপর বোন ও তার সন্তানদের ভরণপোষণ বা খেদমত করা ওয়াজিব নয়। আর রাগের সময় কথা কাটাকাটি থেকে বিরত থাকুন, ধৈর্য ধরুন।
১. বদদোয়া ও গালি সম্পর্কে শরীয়াহর বিধান
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ، مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ» "বান্দার দুআ কবুল হতে থাকে যতক্ষণ সে গুনাহের বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার দুআ না করে এবং তাড়াহুড়া না করে।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৩৫
আম্মুর বদদোয়া যদি অন্যায়ভাবে হয় (আপনি তো বোনের কাজ না করার বৈধ অধিকার রাখেন), তাহলে তা "ইসম" বা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত — আল্লাহ তা কবুল করবেন না। বরং হাদীসে এসেছে:
«مَنْ دَعَا عَلَى مَنْ لَمْ يَظْلِمْهُ فَإِنَّ الدَّعْوَةَ تَرْجِعُ عَلَى صَاحِبِهَا»
"যে ব্যক্তি এমন কারো বিরুদ্ধে বদদোয়া করে যে তার প্রতি জুলুম করেনি, সেই বদদোয়া তার নিজের উপরই ফিরে আসে।" — সহীহুল জামি', আলবানী, হাদীস নং ৬২৮১ (হাসান)
আর গালিগালাজ সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেছেন:
«سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»
"মুসলিমকে গালি দেওয়া ফিসক (গুনাহ), আর তাকে হত্যা করা কুফর।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৪
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, মাজলুমের বদদোয়া কবুল হয়, কিন্তু যালিমের বদদোয়া আল্লাহর কাছে প্রত্যাখ্যাত; বরং তা যালিমের নিজের বিরুদ্ধেই প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। (দেখুন: মাজমুউল ফাতাওয়া)
২. সন্তানের উপর আম্মুর হক — এবং তার সীমা
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا﴾
"আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" — সূরা আল-আহকাফ: ১৫
﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا﴾
"আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না, এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — সূরা আন-নিসা: ৩৬
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ»
"প্রভুর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে, আর প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" — তিরমিযী, হাদীস নং ১৮৯৯ (সহীহ)
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি:
«لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ»
"সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" — সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মূলনীতি; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১০৯৫ (সহীহ)
শাইখ ইবন উসাইমীন রহ. বলেন: পিতা-মাতার আনুগত্য ওয়াজিব কেবল শরীয়াহসম্মত বিষয়ে; আর যদি তারা সন্তানকে জুলুম বা অন্যায় কাজে বাধ্য করে, তবে তা মানা ফরজ নয় — তবে নরম ভাষায়, সম্মানের সাথে অসম্মতি জানাতে হবে। (শারহুল মুমতি', ১৪/১১)
সুতরাং: আম্মুর নিজের খেদমত করা আপনার দায়িত্ব — আপনি তা করছেন, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু বোনের সংসার ও তার সন্তানদের দেখাশোনা করা আপনার উপর ওয়াজিব নয়; এটি ইহসান (সদকা) হিসেবে করা যায়, বাধ্যতামূলক নয়। শাইখ ইবন বায রহ. বলেন, ভাই-বোনের মধ্যে খেদমতের বাধ্যবাধকতা নেই; এটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সদাচার। (ফাতাওয়া ইবন বায)
৩. রাগ ও কথা কাটাকাটি নিয়ন্ত্রণে রাখা
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ»
"শক্তিশালী সেই নয় যে কুস্তিতে জেতে; শক্তিশালী সেই যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬১১৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০৯
«إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ»
"তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে চুপ থাকুক।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২১৩৭ (সহীহ)
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, রাগের সময় নীরবতা ও আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করে। (যাদুল মা'আদ)
৪. ব্যবহারিক করণীয় (ধাপে ধাপে)
- আম্মুর নিজের খেদমত চালিয়ে যান — এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি; কিন্তু বোনের সংসারের কাজে সীমা নির্ধারণ করুন।
- নরম ভাষায় স্পষ্ট বলুন: "আম্মু, আমি সাধ্যমত আপনার কাজ করি; কিন্তু শরীর অসুস্থ হলে বোনের কাজ করতে পারব না — এতে রাগ করবেন না।" (সূরা ত্বা-হা: ৪৪-এর ভাষায় নরম কথা)
- রাগের সময় চুপ থাকুন, ওযু করুন, "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন।
- বদদোয়ার জবাবে বদদোয়া নয় — বরং আম্মুর জন্য হেদায়াতের দুআ করুন; এটাই ইহসানের সর্বোচ্চ স্তর (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)।
- বোনের সাথে কথা কাটাকাটি এড়িয়ে চলুন — তিনি বড়; সম্মান রক্ষা করুন, তবে অন্যায় দাবি মেনে নেবেন না।
- বিশ্বস্ত কাউকে (পিতা/আত্মীয়/ইমাম) মধ্যস্থতা করতে দিন — সূরা আন-নিসা: ৩৫-এর মূলনীতি অনুযায়ী।
- ধৈর্য ও ইহতিসাব — মাজলুমের দুআ কবুল হয়; আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চাইতে পারেন, বদদোয়া নয়।
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য, হিকমাহ ও আম্মুর হেদায়াত দান করুন। আমীন।