বিয়ে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এজন্য আমরা বিয়েটা করে রাখি। কারণ, সম্পর্কটা হালাল বানাতে চাচ্ছিলাম। পরে সময়মতো পরিবারের অনুমতি নিয়ে সংসার শুরু করব, ইনশাআল্লাহ।
তো, বিয়েটা আমাদের এক পরিচিত ভাই ছিলেন, উনি করাতে সাহায্য করেন। তার সাথে আমার কোনো আত্মীতার সম্পর্ক নেই। উনি উকিলের দায়িত্ব পালন করেন। ওনার এক ফ্রেন্ড ছিলেন, যিনি কাজীর দায়িত্ব পালন করেন। যিনি মূলত কাজীর ছেলে ছিলেন।ওনার বাবার বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় ছেলের উপর কিছু বিয়ে পড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে দেন। তো, ওনার পরিবর্তে ওনার ছেলে এই দায়িত্ব পালন করেছেন। তো পরে বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়, আমরা সাক্ষর করি। উকিল হিসেবে যিনি ছিলেন উনি আমাকে বিয়ের শুরুতে এটা জিজ্ঞাসা করেন যে আমি এই বিয়ের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত কি না। আর বলেছিল আমি এই বিয়ে টা করা নিয়ে sure কিনা। আমি তা তে হ্যাঁ বলি। আর সাক্ষী হিসেবে ৪ জন ছিলেন। তার মধ্যে ২ জন সাক্ষী কে দেখি।একজন বিয়ে পড়ানো দেখে যান। আর একজন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন। আর দেনমোহরও ধার্য করা হয় ৩ লাখ ১০১ টাকা। এখন সমস্যা হচ্ছে, বিয়েতে আলাদাভাবে কবুল বলতে বলা হয়নি বা শেষে দোয়া করা হয়নি।
এই ঘটনার পর কিছু বিষয়ে সন্দেহের কারণে আলেমকে প্রশ্ন করি ও জানতে পারি ইজাব-কবুল পালন না হওয়ায় ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে পালন হয়নি।
পরে অন্য একদিন আমরা আবার একজন হুজুর বা মাওলানা দ্বারা বিয়ে পড়িয়ে নিই।
সেখানে ইজাব-কবুল, সাক্ষীর শর্ত ভালোভাবে পালন করি। হুজুর শুরুতে খুতবাও দেন, শেষে দোয়াও করি।
কিন্তু হুজুর দ্বারা বিয়ে পড়ানোর সময় আলাদাভাবে দেনমোহর নিয়ে কোনো কথা হয়নি বা উল্লেখ করা হয়নি। যেদিন রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল সেদিন দেনমোহর ধার্য্য করা হয়েছিল।
এতে কি বিয়ে সহিহ হওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা আছে?
Answer
বিবাহের বৈধতা সম্পর্কে ফতোয়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী অভিভাবকের অজান্তে একজনের সঙ্গে বিবাহ করেছেন। প্রথমবার একজন উকিল ও কাজীর পক্ষ থেকে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হয়, তবে সেখানে ইজাব-কবুল আলাদাভাবে উচ্চারণ করা হয়নি এবং দোয়া হয়নি। পরে সন্দেহের কারণে একজন মাওলানার মাধ্যমে পুনরায় বিবাহ সম্পন্ন করেন, যেখানে ইজাব-কবুল, সাক্ষী ও খুতবা সবকিছু যথাযথভাবে পালিত হয়, কিন্তু দ্বিতীয়বার দেনমোহর আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। প্রশ্ন হলো—এতে বিবাহ সহিহ হওয়ায় কোনো সমস্যা আছে কি?
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. প্রথম বিবাহের হুকুম
ইসলামী শরীয়তে বিবাহের মূল أركان (স্তম্ভ) হলো:
- ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ)
- সাক্ষী (দুইজন পুরুষ বা এক পুরুষ ও দুই নারী মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী)
- মহর নির্ধারণ (তবে মহর উল্লেখ না করলেও বিবাহ সহিহ হয়, মহরুল মিসল ধার্য হবে)
প্রথম বিবাহে যদি ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে উচ্চারিত না হয়ে থাকে, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সহিহ নাও হতে পারে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ইজাব-কবুল মৌখিকভাবে স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক। রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"الإيجاب والقبول شرطان لصحة النكاح، ولا ينعقد بمجرد الرضا القلبي" (ইজাব ও কবুল বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার শর্ত; শুধু অন্তরের সম্মতিতে বিবাহ সংঘটিত হয় না।) — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ
তবে যদি উকিল ও কাজী উভয়েই উপস্থিত ছিলেন এবং সাক্ষীরা উপস্থিত ছিলেন, এবং প্রশ্নকারী "হ্যাঁ" বলে সম্মতি দিয়েছেন—এটি ইজাব-কবুলের একটি প্রকার হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে স্পষ্ট উচ্চারণ না হলে সতর্কতামূলক পুনরায় বিবাহ করা উত্তম।
২. দ্বিতীয় বিবাহের হুকুম
দ্বিতীয়বার মাওলানার মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে:
- ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে পালিত হয়েছে
- সাক্ষীর শর্ত পূর্ণ হয়েছে (কমপক্ষে দুইজন সাক্ষী)
- খুতবা ও দোয়া সম্পন্ন হয়েছে
দেনমোহর দ্বিতীয়বার উল্লেখ না করা: এটি বিবাহের সহিহতায় কোনো প্রভাব ফেলে না। কারণ—
"النكاح يصح بدون تسمية المهر، ويجب مهر المثل" (মহর উল্লেখ না করলেও বিবাহ সহিহ হয়, এবং মহরুল মিসল ওয়াজিব হবে।) — আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ
যেহেতু প্রথমবার দেনমোহর ৩ লক্ষ ১০১ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল এবং তা রেজিস্ট্রিতে লিপিবদ্ধ আছে, সেটিই বহাল থাকবে। দ্বিতীয়বার আলাদাভাবে উল্লেখ না করলে প্রথম নির্ধারিত মহরই কার্যকর হবে। ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে আছে:
"لو تزوجها ثانياً ولم يذكر المهر، يجب المهر المسمى في العقد الأول" (যদি দ্বিতীয়বার বিবাহ করে মহর উল্লেখ না করে, তবে প্রথম চুক্তিতে নির্ধারিত মহরই ওয়াজিব হবে।) — ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুন নিকাহ
৩. অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ
হানাফি মাজহাবে প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগ) ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নারী নিজের বিবাহের চুক্তি সম্পাদন করতে পারেন—এটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, কুমারী নারীর জন্য অভিভাবকের অনুমতি উত্তম ও প্রয়োজনীয়। রাদ্দুল মুহতার-এ ইমাম আবু হানিফার মতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে:
"وقال أبو حنيفة: للبالغة العاقلة أن تزوج نفسها" (ইমাম আবু হানিফা বলেন: প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেকবতী নারী নিজেকে বিবাহ দিতে পারে।) — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ
তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, কুমারী নারীর অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহে কিছুটা অপছন্দ (কারাহাত) রয়েছে। ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হযরত থানভী (রহ.) বলেন:
"والأولى والأحوط أن لا تتزوج البكر نفسها بغير إذن الولي، وإن كان العقد صحيحاً على قول الإمام" (উত্তম ও সতর্কতামূলক পথ হলো—কুমারী নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নিজেকে বিবাহ না দেওয়া, যদিও ইমামের মত অনুযায়ী চুক্তি সহিহ।) — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩
উপসংহার: অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ হানাফি মাজহাবে সহিহ, তবে সামাজিক ও পারিবারিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অপছন্দনীয়। ভবিষ্যতে পরিবারের সম্মতি নিয়ে সংসার শুরু করা উত্তম।
৪. কাজীর ছেলের দ্বারা বিবাহ সম্পাদন
কাজীর ছেলে পিতার পক্ষ থেকে বিবাহ সম্পাদন করেছেন—এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ, কারণ কাজী বা তার প্রতিনিধি (নায়েব) বিবাহ সম্পাদন করতে পারেন। ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে আছে:
"يجوز للنائب أن يعقد النكاح بإذن القاضي" (কাজীর অনুমতিক্রমে নায়েব বিবাহ চুক্তি সম্পাদন করতে পারেন।) — ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুন নিকাহ
চূড়ান্ত ফতোয়া
প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
১. দ্বিতীয়বার বিবাহ সহিহ হয়েছে। ইজাব-কবুল, সাক্ষী ও খুতবা যথাযথভাবে পালিত হওয়ায় বিবাহ শরীয়ত মোতাবেক সহিহ। দেনমোহর দ্বিতীয়বার উল্লেখ না করা বিবাহের সহিহতায় কোনো প্রভাব ফেলে না; প্রথম নির্ধারিত ৩ লক্ষ ১০১ টাকা মহরই বহাল থাকবে।
২. প্রথম বিবাহের বিষয়ে: যদি প্রথমবার ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে উচ্চারিত না হয়ে থাকে, তবে সেটি সহিহ নাও হতে পারে। তবে দ্বিতীয়বার সঠিকভাবে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ায় এখন আর কোনো সমস্যা নেই। দ্বিতীয় বিবাহই কার্যকর।
৩. অভিভাবকের অনুমতি: হানাফি মাজহাবে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর অভিভাবক ছাড়া বিবাহ সহিহ, তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী এটি অপছন্দনীয়। ভবিষ্যতে পরিবারের সম্মতি নিয়ে সংসার শুরু করা উত্তম ও বরকতময়।
৪. দেনমোহর: প্রথম নির্ধারিত ৩ লক্ষ ১০১ টাকা মহর বহাল আছে। দ্বিতীয়বার উল্লেখ না করলে প্রথম মহরই কার্যকর হবে।
পরামর্শ: যেহেতু উভয়ের বয়স ২৩ বছর এবং উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক, তাই এখন পরিবারকে জানিয়ে সামাজিকভাবে বিবাহের স্বীকৃতি নেওয়ার চেষ্টা করুন। এটি দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় দিক থেকেই কল্যাণকর।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।