না জেনে ইসলামি হুকুম সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করা কি কুফর? ছবি ও পাত্র নির্বাচনে দ্বীনদারি বনাম কোমলতার প্রশ্ন?
Faith and Belief · Hanafi
Question
যেমন- হারানো বিজ্ঞপ্তিতে ছবি দেয়া বিষয়টায় আগে আমি মানুষের ছবি রিলেটেড একটা লেখা পড়েছিলাম যেটায় ছিল- "আমাদের উলামারা এত কঠোর না, যে এতটা বাধ্য হলেও ছবি তুলতে দেবেননা(সম্ভবত পাসপোর্ট বা আইডি বিষয়ে ছিল সেটা)"।
সেটা থেকে আমি আগেই ধারণা করে ফেলি যে হারানো বিজ্ঞপ্তিতেও বড় ছবি দেয়া যাবেই। এরপক্ষে যুক্তিও দেই, যে আগেরসময়ে তো এত দূরদূরান্তে মানুষ যেতেননা আর এত খারাপ মানুষও ছিলনা। এখন তো বাচ্চারা হারিয়ে যাবার ক্ষতি ভয় অনেক বেশি। গুগলে সার্চ দিলেও এটাই আসে, যে এটা ইমারজেন্সি প্রয়োজন তাই এতে ছবি ব্যবহার করা যাবে।
এরপরে যখন এই ওয়েবসাইটে প্রশ্ন করে উত্তর পাই যে ছবি না দিলেই উত্তম, দিলেও অস্পষ্ট ছবি দেয়া ভালো তখন মাথায় বারবার আসতে হবে, এত কঠোর ইসলাম? আবার অস্পষ্ট ছবি দেয়ার সময় মাথায় আসে- তাহলে ছবি দিয়ে লাভ কী চেহারাই বোঝা না গেলে খুঁজবে কীভাবে?
মানে, সহজে ব্যাপারটা হজম হচ্ছিলনা।
পরে নিজেকে বোঝাই, যে আল্লাহ চাইলে ছবি ছাড়াই খুঁজে পাবে৷ অনেক জোর করে নিজেকে এটাই বিশ্বাস করাই৷
এতে কি আমার ঈমান চলে গেছে? কালিমা পড়তে হবে? আল্লাহর কাছে আগের ভুল ধারণার জন্য মাফ চাইতে হবে? (অন্য মাজহাব বা অন্য হানাফি আলেমরাও তো ভিন্ন মত রাখেন ছবির ব্যাপারে)।
২. আমার জন্য পাত্র খোজা হচ্ছে। একটা বায়োডাটা আমার মায়ের অনেক পছন্দ হলেও আমি বলি যে এ ছেলে বেশি আমল করে, তাই আমার থেকেও অনেক বেশি আশা করবে। অনেক অনেক চাহিদার কথা লেখা। এছাড়া লেখার ধরণও আমার ভালো লাগেনি,
'কূটনামি করা যাবেনা', 'আমাকে সব চাচা-মামারা অন্য ভাইদের থেকে বেশি পছন্দ করে তাই বিয়ের পরেও যাতে এটা বজায় থাকে এটা বউকে নিশ্চিত করতে হবে', 'দরকার ছাড়া সোশাল মিডিয়া ব্যবহার শূন্য হওয়া চাই'৷
এছাড়া তার একটা চাহিদা ছিল- স্বামীর পূর্ণ আনুগত্য করতে হবে।
এখন এগুলো আমি জানি যে স্ত্রী হিসেবে এগুলো করতে হবে। কিন্তু লেখার ধরণটা একটু বেশি কন্ট্রোলিং লেগেছে আমার কাছে। মনে হয়েছে এতটা হুকুম হয়তো আমি মানতে পারবনা। মানে, জানি স্বামীর বৈধ আনুগত্য করা ফরজ কিন্তু আমি এমন ছেলে চেয়েছিলাম যে নিজে থেকেই আমাকে কিছুটা ছাড় দেবে স্বাধীনতা দেবে। স্বাধীনতা মানে এটা না যে আমি বাইরে গিয়ে চাকরি করব ছেলেদের সাথে মিশব ঝগড়া করব।
কিন্তু আমার একটু ফ্রি-স্পেস থাকবে(ভুলত্রুটি করলে বা লোভে পড়ে গুনাহ করলে সেটার জন্য অনেক বেশি শাস্তি পেতে হবেনা বা কঠোরতা হবেনা)।
তাই আমি মাকে বলি- "শুধু ধনসম্পদ বেশি হলেই যে খোঁটা দেবে এমন না, বরং দ্বীনের দিকেও যদি সে অগ্রগামী হয় তাহলে তো আমাকে সবসময় দোষ ধরতে পারে, অনেক কঠোর হতে পারে। তাই এরথেকে এমন ছেলে হলেও চলবে যে আমার থেকে কম দ্বীনদার হলেও আমাকে ফ্রি-স্পেস দেবে।"
এটা কি কুফর? অবশ্যই আমার চেয়ে হাক্কুল্লাহ আমল বেশি করে(সাথে পর্দা, গীবত না করা) কিন্তু আমার সাথে কোমল হবে আমাকে আরো দ্বীনদার বানাবে এমন ছেলে বেস্ট। কিন্তু দুটো অপশন এমন থাকলে যেখানে একটা ছেলে হাক্কুল্লাহ বেশি করে এবং দ্বীনের ক্ষেত্রে কঠোর(যেটা আমার জন্য ভালো হতে পারে), খারাপ ব্যবহারও করতে পারে।
আরেকটা অপশন দ্বীনের হাক্কুল্লাহর ক্ষেত্রে আমার চেয়ে পিছিয়ে কিন্তু আমার কথা শোনে এরকম হলে আমি দ্বিতীয়টাকে ভালো বলছি(আমি জানি এটা শয়তানের ধোঁকা, কারণ হাক্কুল্লাহর বেলায় আমার থেকে পিছিয়ে থাকা ছেলেও তো কঠোর খারাপ ব্যবহার করতে পারে(যেমন চাকরি নিয়ে খোঁটা দেয়া)। কিন্তু আমি হয়তো দুনিয়াবি জিনিস(ছেলের সৌন্দর্য, চাকরি বা বেদ্বীন শখের জিনিস যেগুলো শয়তান সুন্দর করে দেখায় যেমন মুভি) এর প্রতি আকর্ষণ থেকে সেগুলো আবার করতে পারার লোভে কম দ্বীনী ছেলেকে বেশি পছন্দ করছি৷
কিন্তু মাকে বলার সময় এতকিছু ভাবিনি, এটা বলা কি কুফর হয়েছে? মাফ চাইতে হবে?
না হলে এটাকে কীভাবে চিন্তা করব? আল্লাহর কাছে মাফ চাইব? কীরকম ছেলেকে প্রাধান্য দেয়া উচিত?
Answer
উত্তর
প্রশ্ন ১: না জেনে ভুল ধারণা পোষণ করা কি কুফর?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এটি কুফর নয়। আপনার ঈমান ঠিক আছে, কালিমা নতুন করে পড়তে হবে না। তবে আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করা উত্তম।
দলিল ও ব্যাখ্যা
১. কুফরের শর্ত: কুফর সংঘটিত হয় তখনই যখন কেউ জেনে-বুঝে ইসলামের অকাট্য (কতঈ) বিষয়কে অস্বীকার করে বা অবজ্ঞা (ইস্তিহান) করে। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার (৪/২২৪, বাবুল মুরতাদ) -এ বলেন:
«وَالْكُفْرُ هُوَ إِنْكَارُ مَا عُلِمَ مِنْ الدِّينِ بِالضَّرُورَةِ»
অর্থাৎ কুফর হলো দ্বীনের যেসব বিষয় ضروري (অকাট্যভাবে) জানা, তা অস্বীকার করা। আর আপনি তো হুকুমটাই জানতেন না — অজ্ঞতাবশত ভুল ধারণা পোষণ করেছেন। অজ্ঞতা (জাহল) কুফর নয়।
২. হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ»
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও জোরপূর্বক কাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন।" — সুনানে ইবনে মাজাহ ২০৪৫; শরহু মাআনিল আছার (ইমাম তাহাবি)।
৩. ইজতিহাদি মাসআলায় ভিন্নমত: ছবির ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে (কেউ মুতলাক নিষেধ, কেউ শর্তসাপেক্ষ অনুমতি দিয়েছেন)। ইজতিহাদি মাসআলায় ভুল ইজতিহাদ কুফর নয় — বরং ভুল করলে এক আজর, সঠিক হলে দুই আজর (বুখারি, কিতাবুল ইতিকাদ)। আপনি তো ইজতিহাদও করেননি, শুধু অজ্ঞতাবশত ধারণা করেছিলেন।
৪. "এত কঠোর ইসলাম?" — এই কথাটি: এখানে সতর্কতা জরুরি। যদি কেউ শরীয়তের হুকুমকে দোষারোপ করে বা অবজ্ঞা করে, তবে তা বিপজ্জনক। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আপনি নিজের অজ্ঞতা ও কষ্ট প্রকাশ করেছেন, শরীয়তকে অস্বীকার করেননি — বরং পরে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছেন। এটি কুফর নয়, বরং এটি নফসের সাথে সংগ্রাম (মুজাহাদা), যার জন্য ইনশাআল্লাহ সওয়াবও রয়েছে।
৫. করণীয়:
- আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করুন: "হে আল্লাহ, না জেনে যা ভেবেছি তা ক্ষমা করুন, আমাকে সঠিক হুকুম জানার ও মানার তাওফিক দিন।"
- ছবির মাসআলায় হানাফি ফতোয়া অনুসরণ করুন (প্রয়োজনে অস্পষ্ট/প্রয়োজনীয় ছবি, যা ফেতনা ও ক্ষতির আশঙ্কা কমায়)।
- শরীয়তের কোনো হুকুম সম্পর্কে মনে দ্বিধা জাগলে সাথে সাথে আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করুন — অনুমানে ফতোয়া তৈরি করবেন না।
নীতি: «لَا حُكْمَ لِأَحَدٍ قَبْلَ الْعِلْمِ» — জ্ঞান লাভের আগে কারো উপর হুকুম আরোপিত হয় না (অজ্ঞতা ওযর)। সুতরাং আপনার ঈমান নিরাপদ।
প্রশ্ন ২: পাত্র নির্বাচনে দ্বীনদারি বনাম কোমলতা — এবং মাকে বলা কথাটি
সংক্ষিপ্ত উত্তর: এটিও কুফর নয়। তবে কথাটি বলার ধরন ও উদ্দেশ্য নিয়ে আত্মসমালোচনা ও তাওবা করা উচিত।
দলিল ও বিশ্লেষণ
১. হাদিসে পাত্র নির্বাচনের মানদণ্ড:
«تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ»
"নারীর বিয়ে হয় চার কারণে: তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও।" — সহিহ বুখারি ৫০৯০। পুরুষের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য (মিরাস/কিফায়াত)।
২. দ্বীনদারি ও কোমলতার সমন্বয়: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي»
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" — সুনানে তিরমিজি ৩৮৯৫।
অর্থাৎ প্রকৃত দ্বীনদার কঠোর নয়, বরং পরিবারের প্রতি কোমল ও সহানুভূতিশীল। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার (৩/৫৯) -এ স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন।
৩. আপনার কথার বিশ্লেষণ: আপনি মাকে বলেছেন — "কম দ্বীনদার হলেও চলবে, যদি ফ্রি-স্পেস দেয়।" এখানে দুটি দিক:
- দ্বীনদারিকে কম গুরুত্ব দেওয়া: এটি ভুল প্রবণতা। দ্বীনদারিই দাম্পত্যের ভিত্তি। তবে এটি কুফর নয়, বরং এটি একটি ভুল অগ্রাধিকার (খাতা)।
- কোমলতা ও সহনশীলতা কামনা: এটি বৈধ ও স্বাভাবিক চাহিদা। ইসলামও স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি কোমল হতে নির্দেশ দেয়।
৪. শয়তানের ধোঁকা: আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন — দুনিয়াবি আকর্ষণ (সৌন্দর্য, মুভি, শখ) থেকে কম দ্বীনদার ছেলেকে পছন্দ করছেন। এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আল্লাহ বলেন:
«إِنَّ الشَّيْطَانَ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ»
"শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়।" — সূরা বাকারা ২৬৮।
৫. করণীয়:
- আল্লাহর কাছে তাওবা করুন: "হে আল্লাহ, দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দেওয়ার তাওফিক দিন, দুনিয়ার আকর্ষণ থেকে হেফাজত করুন।"
- পাত্র নির্বাচনে দ্বীনদারি + চরিত্রের কোমলতা — উভয়ের সমন্বয় খুঁজুন। শুধু কঠোর আমলদার নয়, শুধু কোমল নয় — বরং দ্বীনদার ও সদ্ব্যবহারকারী।
- যে বায়োডাটায় "কূটনামি করা যাবে না", "সোশাল মিডিয়া শূন্য" — এ ধরনের অতিরিক্ত কন্ট্রোলিং শর্ত নিয়ে চিন্তা করুন; এটি চরিত্রের কোমলতার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বরং একজন মধ্যপন্থী দ্বীনদার পাত্র খুঁজুন।
- মাকে বলা কথাটি নিয়ে ইস্তিগফার করুন, তবে ভেঙে পড়বেন না — এটি কুফর নয়।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | কুফর? | করণীয় | |---|---|---| | ১. অজ্ঞতাবশত ছবির ভুল ধারণা | না | তাওবা-ইস্তিগফার, হানাফি ফতোয়া অনুসরণ | | ২. কম দ্বীনদার পাত্র পছন্দের কথা | না | তাওবা, দ্বীনদারি+কোমলতার সমন্বয় খোঁজা |
উভয় ক্ষেত্রেই: কালিমা নতুন করে পড়তে হবে না, ঈমান যায়নি। তবে আল্লাহর কাছে তাওবা করুন এবং সঠিক হুকুম জানার পর তা মানার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাওফিক দিন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।