তালাকের পর ইদ্দত পালন না করে বিয়ে করার বিধান কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার ১ম প্রশ্ন হলো, এই ২য় বিয়ে ঠিক আছে কিনা? আমার আব্বুর এই বিয়েতে কোনো মত ছিল না। ইদ্দত পালন হয় নাই। এখন কি ওর ইদ্দত চলছে?
আর ২য় প্রশ্ন হলো, আমাদের ওর সাথে কেমন সম্পর্ক রাখতে হবে? আমরা ঢাকা থাকি আর ওরা গ্রামে।
Answer
দ্বিতীয় বিয়ে জায়েজ কিনা এবং আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রাখার বিধান
প্রথম প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিয়ে ও ইদ্দতের বিধান
উত্তর
এই দ্বিতীয় বিয়ে শরীয়ত অনুযায়ী সহীহ হয়নি। কারণ প্রথম স্বামী মুখে তালাক দেওয়ার আগেই দ্বিতীয় কাবিন সম্পন্ন হয়েছে। তালাকের পর ইদ্দত পালন না করে বিয়ে করা হয়েছে—এটি সুস্পষ্ট হারাম ও কবীরা গুনাহ। এখন তাকে অবশ্যই নতুন স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ইদ্দত পালন করতে হবে।
তালাকের পর ইদ্দত পালন ফরজ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ "তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েজ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।" (সূরা বাকারা: ২২৮)
وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَن يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ "তাদের গর্ভে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তা গোপন করা তাদের জন্য হালাল নয়।" (সূরা বাকারা: ২২৮)
ইদ্দতের মূল উদ্দেশ্য হলো—গর্ভ সংক্রান্ত সন্দেহ দূর করা এবং পূর্ব স্বামীর সাথে সম্পর্কের পূর্ণ সমাপ্তি নিশ্চিত করা। ইদ্দত পালন ছাড়া বিয়ে করা হলে বংশ-সংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
ইদ্দতকালে বিয়ে করা হারাম ও বাতিল
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত হলো—ইদ্দতকালীন নারীর সাথে বিয়ে সম্পূর্ণ বাতিল (বাতিল আকদ)। এমন বিয়েতে সহবাস হলে তা যিনার শামিল হবে।
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬৪: "ইদ্দত পালনকারী নারীর বিয়ে বাতিল; এমনকি বিয়ের পর সহবাস হলে তা যিনা হিসেবে গণ্য হবে।"
আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ: "ইদ্দত পালনকারী নারীর নিকাহ সহীহ নয়।"
ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭৪: "ইদ্দত পালনকারী নারীর নিকাহ বাতিল।"
এই ঘটনার সঠিক বিশ্লেষণ
প্রশ্ন অনুযায়ী ক্রমধারা হলো:
- শুক্রবার: নতুন কাবিন সম্পন্ন হয়
- ঐদিনই: পূর্ব স্বামী মুখে তালাক দেন
অর্থাৎ, তালাকের আগেই দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে। সুতরাং দ্বিতীয় বিয়েটি সম্পূর্ণ বাতিল। তালাকের পর ইদ্দত শুরু হয়েছে, যা এখনো চলছে। ইদ্দতকালীন অবস্থায় দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাস বা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রাখা সম্পূর্ণ হারাম।
- এখন করণীয়**
- দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সরাসরি সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে (যেহেতু বিয়ে বাতিল)।
- প্রথম স্বামীর তালাকের পর তিন হায়েজ (বা তিন মাস) ইদ্দত পালন করতে হবে।
- ইদ্দত শেষ হলে শরীয়তসম্মতভাবে পুনরায় বিয়ে করা যাবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রাখার বিধান
শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
সিলাতুর রাহিম (আত্মীয়তার সম্পর্ক) ফরজ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ "আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও, এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাক।" (সূরা নিসা: ১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারি: ৫৯৮৪; সহীহ মুসলিম: ২৫৫৬)
তবে গুনাহের কাজে সহযোগিতা নয়
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "নেক কাজে ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা কর, কিন্তু গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
ব্যবহারিক নির্দেশনা
- সম্পর্ক রাখুন, কিন্তু ভুলকে সমর্থন করবেন না। ফোনে খোঁজখবর নিন, সালাম-দুআ বিনিময় করুন, প্রয়োজনে সাহায্য করুন।
- এই বাতিল বিয়েকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেবেন না। তাকে বোঝান যে ইদ্দত পালন করা ফরজ এবং দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া হারাম।
- ঢাকা থেকে গ্রামে: নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রাখুন, ঈদে বা ছুটিতে দেখা করুন। দূরত্ব সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ নয়।
- কঠোরতা নয়, হিকমতের সাথে বোঝান। নরম ভাষায় দ্বীনের বিধান বোঝান, প্রয়োজনে স্থানীয় মুফতির সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করুন।
- গুনাহের কাজে সরাসরি সহযোগিতা করবেন না—যেমন বাতিল বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা তাতে উৎসাহ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।