অনলাইনে প্রতারিত হয়ে ৪২,০০০ টাকা হারানোর পর মনের কষ্ট, বদদুআ, মুখে মাফ বলার বিধান ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার কষ্টও সম্পূর্ণ বাস্তব। প্রথমে একটি বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার: আপনি যে টাকা প্রতারকদের দিয়েছেন, সেটি আপনি স্বেচ্ছায় দেননি; বরং প্রতারণা ও ছলনার মাধ্যমে তারা নিয়েছে। সুতরাং শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি আপনার উপর ঋণ হিসেবে বহাল থাকে না—বরং তারা যুলুম করেছে এবং তাদের উপর আপনার পাওনা বাকি থাকে। তবে আপনার মনের ভেতরে যে কঠিন কথা বারবার আসছে, সেটি শরীয়তের দৃষ্টিতে কী—তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করছি।
১. প্রতারিত হওয়া কি গুনাহ?
না। আপনি প্রতারিত হয়েছেন, আপনি অপরাধী নন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ ضَمَانٌ فِي خَطَأٍ وَلَا نِسْيَانٍ وَلَا إِكْرَاهٍ» — (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২০৪৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৫৯২)
অর্থাৎ ভুলবশত, বিস্মৃতিবশত বা বাধ্য হয়ে কেউ কিছু করলে তার উপর দায় থাকে না। আপনি প্রতারিত হয়েছেন—এতে আপনার কোনো গুনাহ নেই। বরং প্রতারকরা যুলুম করেছে; কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
«إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَٰكِنَّ النَّاسَ أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ» — (সূরা ইউনুস: ৪৪)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
«وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ» — (সূরা ইবরাহীম: ৪২)
সুতরাং প্রতারকদের যুলুম আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত আছে; আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি অবশ্যই ইনসাফ করবেন।
২. মুখে মাফ বললে কি মাফ হয়ে যায়?
এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি মাসআলা। ফিকহের মূলনীতি হলো: হক দুই প্রকার—হক্কুল্লাহ (আল্লাহর হক) ও হক্কুল ইবাদ (বান্দার হক)। বান্দার হক কেবল বান্দার নিজের মাফ করলেই মাফ হয়, আর তা তখনই সহিহ হয় যখন অন্তর থেকে মাফ করা হয়। মুখে শুধু "মাফ করলাম" বলা—অথচ অন্তরে মাফ করার ইচ্ছা নেই—এটি মাফ হিসেবে গণ্য হয় না।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বান্দার হক সম্পর্কে বলেন:
«وَحَقُّ الْعَبْدِ لَا يَسْقُطُ إِلَّا بِإِسْقَاطِهِ أَوْ بِأَدَائِهِ» — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল গাসব ওয়া ইতলাফ)
অর্থাৎ বান্দার হক কেবল বান্দা নিজে ছেড়ে দিলে বা আদায় করলে স্খলিত হয়। আর মাফ করার শর্ত হলো অন্তরের সন্তুষ্টি; মুখের উচ্চারণ যথেষ্ট নয়। হাদিসে এসেছে:
«إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ» — (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৬৪)
সুতরাং আপনি যদি মুখে "মাফ করলাম" বলেন কিন্তু অন্তরে মাফ না করেন, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে মাফ হয়নি। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: আপনি মাফ না করলেও আপনি গুনাহগার নন। কারণ মাফ করা আপনার অধিকার; আপনি চাইলে মাফ করতে পারেন, না করলে না। তবে ইসলাম আমাদের ক্ষমার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে।
৩. মনের ভেতরে কঠিন কথা আসা কি ঠিক?
এখানে দুটি দিক আলাদা করতে হবে:
(ক) প্রতারকদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া ও তাদের যুলুমের কথা বলা—এটি জায়েজ। আপনি মাজলুম; মাজলুমের দুআ কবুল হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ» — (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯)
অর্থাৎ মাজলুমের দুআ ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই। সুতরাং আপনি আল্লাহর কাছে ইনসাফের দুআ করতে পারেন, তাদের হেদায়াতের দুআ করতে পারেন, অথবা তাদের থেকে আপনার হক ফিরে পাওয়ার দুআ করতে পারেন।
(খ) কিন্তু অন্তরে বিদ্বেষ, ঘৃণা ও প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে রাখা এবং "তাদের অঙ্গে কাটার মতো ফুটুক, তারা হজম করতে না পারুক" এ ধরনের বদদুআ করা—এটি ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ» — (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৯৭৭)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
«وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ» — (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)
তবে হ্যাঁ, আপনি যদি মনের ভেতরে কষ্ট ও ঘৃণা অনুভব করেন—এটি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি; এতে গুনাহ নেই, যতক্ষণ না আপনি মুখে বা হাতে যুলুম করেন। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে অন্তরের খটকা ও ওয়াসওয়াসা পর্যন্ত মুয়াফ করা হয়, যতক্ষণ না তা কর্মে বা মুখে প্রকাশ পায়। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাজার ওয়াল ইবাহা)
৪. তাহলে আপনার করণীয় কী?
১. আল্লাহর কাছে তাওবা করুন—কঠিন বদদুআ ও ঘৃণার অনুভূতির জন্য ক্ষমা চান। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ» — (সূরা নূর: ৩১)
২. প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিন—পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করুন। এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার হক আদায়ের বৈধ পথ; বরং এটি অন্যদের রক্ষার জন্যও জরুরি।
৩. আল্লাহর কাছে দুআ করুন—তাদের হেদায়াতের জন্য, আপনার হক ফিরে পাওয়ার জন্য, এবং আপনার অন্তরকে শান্ত করার জন্য। মাজলুমের দুআ কবুল হয়।
৪. মাফ করার ইচ্ছা অন্তরে জাগানোর চেষ্টা করুন—যদিও এখন কঠিন, তবে এটি আপনার নিজের শান্তির জন্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ» — (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৯৭)
৫. ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করুন—আপনি যে ধার করে দোকানের পাওনা বুঝিয়েছেন, সেটি আপনার দায়িত্ব; আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, তিনি রিযিকের ব্যবস্থা করবেন।
৫. সংক্ষেপে উত্তর
- প্রতারিত হওয়ায় আপনার কোনো গুনাহ নেই।
- মুখে মাফ বললে অন্তর থেকে না বললে মাফ হয় না; তবে মাফ না করলেও আপনি গুনাহগার নন।
- মনের কষ্ট ও ঘৃণা স্বাভাবিক, কিন্তু বদদুআ ও প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়।
- আল্লাহর কাছে ইনসাফের দুআ করুন, আইনি ব্যবস্থা নিন, এবং অন্তরকে ক্ষমার দিকে নরম করার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দূর করুন, আপনার হক ফিরিয়ে দিন, এবং আপনার অন্তরকে শান্তি ও সন্তুষ্টিতে ভরে দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র:
- সূরা ইউনুস: ৪৪; সূরা ইবরাহীম: ৪২; সূরা ফুসসিলাত: ৩৪; সূরা নূর: ৩১
- সহিহ বুখারি: ১৪৯৩, ৫৯৯৭
- সহিহ মুসলিম: ১৯, ২৫৬৪
- সুনানে তিরমিজি: ১৯৭৭
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৫
- সুনানে আবু দাউদ: ৪৫৯২
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): কিতাবুল গাসব, কিতাবুল হাজার ওয়াল ইবাহা
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)