ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির দ্বিতীয় বিয়ে করা কি বৈধ?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নোক্ত মাসআলার বিস্তারিত জবাব
মূল প্রশ্ন
কারও যদি প্রায় ১০–২০ লাখ টাকা ঋণ থাকে, জমিজমাও না থাকে, সুদ পরিশোধ করার জন্য এই মুহূর্তে তেমন কোনো উপায় না থাকে, তাহলে তার জন্য কি এই মুহূর্তে দ্বিতীয় বিয়ে করা বৈধ হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, দ্বিতীয় বিয়ে করা মূলত বৈধ (জায়েয)। ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি রয়েছে (সর্বোচ্চ চারটি পর্যন্ত), তবে তা শর্তসাপেক্ষ। ঋণগ্রস্ততা বা সুদ পরিশোধে অক্ষমতা নিজে থেকে বিয়েকে হারাম করে না। তবে—
১. ঋণ পরিশোধের নিয়ত ও চেষ্টা থাকতে হবে — ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য ঋণ শোধ করা ফরজ; বিয়ের কারণে ঋণ পরিশোধে আরও বিলম্ব বা অবহেলা করা জায়েয নয়। ২. স্ত্রীর হক (নফকা, বাসস্থান, ভরণপোষণ) আদায়ের সামর্থ্য বা সৎ নিয়ত থাকতে হবে — অন্যথায় দ্বিতীয় বিয়ে করা মাকরুহ/গুনাহের কারণ হবে। ৩. সুদ পরিশোধের জন্য বিয়েকে উপায় হিসেবে ব্যবহার করা নাজায়েয — বিয়ে করে স্ত্রীর মোহরানা বা সম্পদ দিয়ে সুদ পরিশোধের চিন্তা করা শরীয়তসম্মত পন্থা নয়; বরং এটি বিয়ের উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে। ৪. সুদ পরিশোধে অক্ষম হলে তাওবা ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা — সুদ নেওয়া/দেওয়া কবিরা গুনাহ; কিন্তু বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে (দারিদ্র্য, প্রয়োজনে) সুদ পরিশোধে বাধ্য হলে গুনাহ কমার আশা আছে, তবে সুদ ব্যবস্থাকে বৈধ মনে করা যাবে না।
দলিল ও বিশ্লেষণ
১. একাধিক বিয়ের মূল বিধান
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা বিবাহ করো নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে—দুই, তিন বা চারজন। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, তোমরা ইনসাফ করতে পারবে না, তবে একজনকেই।" (সূরা নিসা: ৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে বিয়ে করুক; কারণ বিয়ে দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে রোজা রাখুক; কারণ রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৫; সহীহ মুসলিম: ১৪০০)
শিক্ষা: বিয়ের অনুমতি সামর্থ্যের সাথে সম্পর্কিত। সামর্থ্য না থাকলে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ এসেছে। তবে "সামর্থ্য" বলতে শুধু বর্তমান আর্থিক সচ্ছলতা নয়; বরং নফকা আদায়ের সক্ষমতা বা বৈধ উপার্জনের ব্যবস্থা থাকাও অন্তর্ভুক্ত।
২. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির বিয়ে
হানাফি ফিকহে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির বিয়ে করা নিষিদ্ধ নয়, তবে—
- যদি বিয়ের কারণে স্ত্রীর নফকা (ভরণপোষণ) আদায় করতে না পারে এবং স্ত্রীর হক নষ্ট হয়, তবে তা গুনাহ।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য বিয়ে করা জায়েয, তবে নফকা আদায়ের সামর্থ্য না থাকলে সে আল্লাহর উপর ভরসা করে বিয়ে করতে পারে; তবে স্ত্রীর হক আদায়ে অবহেলা করা যাবে না।
রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির বিয়ে করা জায়েয; তবে নফকা আদায়ে অক্ষম হলে সে যেন বিয়ে না করে, কারণ এতে স্ত্রীর হক নষ্ট হবে।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:
"ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি বিয়ে করে এবং নফকা আদায়ে অক্ষম হয়, তবে সে গুনাহগার হবে; তবে বিয়ে বাতিল হবে না।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুন নিকাহ)
৩. সুদ পরিশোধের জন্য বিয়ে করা
সুদ পরিশোধের জন্য বিয়ে করাকে উপায় বানানো শরীয়তে নাজায়েয। কারণ—
- বিয়ের উদ্দেশ্য হলো পবিত্রতা, বংশ রক্ষা, ও পারস্পরিক সহযোগিতা—আর্থিক লাভ নয়।
- স্ত্রীর মোহরানা বা সম্পদ নিজের ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা স্ত্রীর হক নষ্ট করার শামিল হতে পারে।
মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা নিসার ৩ নং আয়াতের তাফসীরে মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) বলেন:
"বহুবিবাহের অনুমতি শর্তসাপেক্ষ—ইনসাফ ও নফকা আদায়ের সামর্থ্য থাকতে হবে। সামর্থ্য না থাকলে এক স্ত্রীতেই সন্তুষ্ট থাকা কর্তব্য।"
৪. সুদ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তির করণীয়
- তাওবা ও ইস্তিগফার: সুদ নেওয়া/দেওয়া কবিরা গুনাহ; কিন্তু বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে তা পরিশোধে বাধ্য হলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
- হালাল উপার্জনের চেষ্টা: ঋণ পরিশোধের জন্য বৈধ উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা করা ফরজ।
- ঋণদাতার সাথে আলোচনা: সুদ মাফ বা কমানোর জন্য ঋণদাতার সাথে সদাচরণ ও অনুরোধ করা।
- দোয়া: রাসূলুল্লাহ ﷺ ঋণ থেকে মুক্তির জন্য এই দোয়া শিখিয়েছেন:
"আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসাল, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবন, ওয়া দালাইদ দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।" (সহীহ বুখারী: ২৮৯৩)