হাম্বলি-হানাফি মাজহাব ভিন্নতার দরুন ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতা।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১. একজন পাত্রের দ্বীনদারিতা সন্তোষজনক কিন্তু তিনি হাম্বলি মাজহাব অনুসরণ করেন আর পাত্রী হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে। এক্ষেত্রে বিয়েতে এগুনো কি ঠিক হবে?
২. পাত্র এক জেলার এবং সে যথেষ্ট দূর অবস্থান করছে। তাই এ মুহূর্তে দেখতে আসা সম্ভব নয়। তাই পাত্রীর ছবি চাচ্ছে। এবং বলছে, সে ছবি শুধু মা ও বোনকে দেখাবে, কোন গায়রে মাহরামকে না দেখানোর ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ। তার সাথে বিয়ে হবে, এমন নিশ্চয়তাও তো নেই। তাকে ছবি দেয়া ঠিক হবে?
৩. একজন মেয়ে বৌ ও শ্বাশুড়ির পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ব্যাপারে ভীত এবং বিয়ের পর স্বামীসহ আলাদা থাকার ব্যাপারে আগ্রহী। কিন্তু যদি দেখা যায়, যে ছেলের প্রস্তাব এসেছে তিনি মা,বাবা, বোনসহ থাকেন। তবে ছেলে দ্বীনদার হলে, মেয়েটির কী পারিবারিক দিকটি ছাড় দেয়া উচিত?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
নিচে প্রশ্নের তিনটি অংশের উত্তর হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী দেওয়া হলো।
১. মাজহাব ভিন্নতা (হাম্বলি পাত্র ও হানাফি পাত্রী)
** উত্তর:** মাজহাব ভিন্নতা বিয়ের বৈধতায় কোনো বাধা নয়; তবে উভয় পক্ষের আকিদা-বিশ্বাস (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত) ঠিক থাকা এবং দ্বীনদারিতা সন্তোষজনক হওয়া শর্তে এগোনো জায়েয। তবে কিছু ব্যবহারিক বিষয়ে (যেমন: নামাজে রাফউল ইয়াদাইন, আয়াতুল কুরসি ইত্যাদি) পার্থক্য থাকলে পরস্পর সম্মান ও সহনশীলতা রক্ষা করা জরুরি।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
-
কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّىٰ يُؤْمِنُوا"
(সূরা বাকারা: ২২১) — অর্থাৎ কেবল কুফর-শিরকই বিয়ের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ; আহলুস সুন্নাহর মাজহাবগুলোর মধ্যে পার্থক্য বিয়ের বাধা নয়। -
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
"تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ"
(সহিহ বুখারি: ৫০৯০; সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬) — অর্থাৎ দ্বীনদারিতা প্রধান মাপকাঠি। -
হানাফি ফিকহে মাজহাব ভিন্ন ব্যক্তির সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ নয়; বরং কুফর-শিরক ও চরম ফাসেকের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খ. ৩, কিতাবুন নিকাহ; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, কিতাবুন নিকাহ)
পরামর্শ:
১. পাত্রের আকিদা-বিশ্বাস আহলুস সুন্নাহ অনুযায়ী কিনা নিশ্চিত করুন।
২. দ্বীনদারিতা, চরিত্র ও আমানতদারিতা যাচাই করুন।
৩. মাজহাবগত পার্থক্য নিয়ে পরস্পর সহনশীল থাকার মানসিকতা থাকলে এগোনোতে দোষ নেই।
৪. তবে যদি মাজহাবগত পার্থক্য নিয়ে বাড়াবাড়ি থাকে, যা পারিবারিক অশান্তির কারণ হতে পারে, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম।
২. বিয়ের আগে পাত্রীকে ছবি দেওয়া
** উত্তর:** **না, কোনোভাবেই জায়েজ নেই।
পাত্রকে পাত্রীর ছবি দেওয়া জায়েয নয়।** এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ ও ফিতনার কারণ। পাত্রের "শুধু মা ও বোনকে দেখাব" — এই ওয়াদা শরিয়তের হুকুম পরিবর্তন করে না; কারণ ছবি একবার হাতে গেলে তা সংরক্ষণ, কপি ও অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে।
-
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ"
(সূরা নূর: ৩০) এবং মুমিন নারীদের সম্পর্কে: "وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ..." (সূরা নূর: ৩১) — অর্থাৎ গায়রে মাহরামের সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ নিষিদ্ধ। -
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
"كُلُّ الْعَيْنِ زَانِيَةٌ" — (মুসলিম: ২৬৫৭) এবং ছবি সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে (বুখারি: ৫৯৫০; মুসলিম: ২১১০)। -
হানাফি ফিকহে নারীর ছবি গায়রে মাহরামকে পাঠানো নিষিদ্ধ; এমনকি বিয়ের প্রস্তাবের সময়ও সরাসরি দেখা বা পর্দার আড়াল থেকে দেখা শরিয়তসম্মত পদ্ধতি, ছবি পাঠানো নয়। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খ. ৯, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা; ফাতাওয়া উসমানি, খ. ৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খ. ৪)
৩. শাশুড়ি-বউ দ্বন্দ্ব ও আলাদা থাকার আগ্রহ
** উত্তর:** ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর জন্য স্বতন্ত্র বাসস্থান (মালিকানাধীন বা ভাড়া) রাখা জায়েয ও অনেক ক্ষেত্রে উত্তম; তবে পিতা-মাতার খেদমত ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা ফরজ। ছেলে দ্বীনদার হলে শুধু "একসাথে থাকা" কারণে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং বিয়ের পর আলাদা থাকার বিষয়টি বিয়ের শর্ত হিসেবে বা পরবর্তীতে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়।
-
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ" (সূরা নিসা: ১৯) এবং
"وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩) — অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার ও পিতা-মাতার সাথে ইহসান উভয়ই আবশ্যক। -
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
"لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ" (আহমাদ) — অর্থাৎ সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা নয়। -
হানাফি ফিকহে স্বামীর উপর স্ত্রীর নানাফাকা ও স্বতন্ত্র বাসস্থান (মুসকান) প্রদান করা ওয়াজিব; তবে তা শর্তসাপেক্ষ ও সামর্থ্য অনুযায়ী। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খ. ৩, কিতাবুন নাফাকাত; আল-হিদায়া, কিতাবুন নাফাকাত; ফাতাওয়া হিন্দিয়া)
-
হযরত থানভী (রহ.) বাহিশতী জেওর-এ শাশুড়ি-বউ সম্পর্কে সতর্কতা ও সদ্ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন।
পরামর্শ:
১. ছেলের দ্বীনদারিতা, চরিত্র ও পারিবারিক পরিবেশ ভালোভাবে যাচাই করুন।
২. বিয়ের আগে পরিষ্কারভাবে আলোচনা করুন — ভবিষ্যতে আলাদা থাকার সম্ভাবনা আছে কিনা।
৩. বিয়ের শর্ত হিসেবে আলাদা থাকার শর্ত দেওয়া যায়; তবে শর্ত ভঙ্গ হলে বিয়ে বাতিল হবে না, বরং পাপ হবে — এ বিষয়টি জেনে নিন।
৪. শাশুড়ি-বউ দ্বন্দ্ব এড়াতে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও সীমা রক্ষা জরুরি; পাত্রীর উচিত পরিবারকে সম্মান করা এবং পাত্রের উচিত উভয় পক্ষের মধ্যে ইনসাফ করা।
৫. শুধু "একসাথে থাকা" কারণে দ্বীনদার পাত্রকে বাদ দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়; বরং সমঝোতার পথ খুঁজুন।