নারীদের স্কলারশিপ সম্পর্কিত
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার প্রশ্নটি হচ্ছে মাহরাম ছাড়া নারীদের বাইরে স্কলারশিপ এ পড়াশুনা করা সংক্রান্ত। আমার পরিবার থেকে চাপপ্রয়োগ করা হচ্ছে চাকরি পরীক্ষায় বসার জন্য। তারা চাচ্ছেন ন্যাশনাল এ ভর্তি করিয়ে রাখবেন, পাশাপশি চাকরির আবেদন করতে থাকবেন। শুরুতে বাসায় সহশিক্ষার বিষয়টাতে নাকচ করে দিয়েছি। তাঁরা চেয়েছিলেন ল নিয়ে পড়াতে। এবং এর পরে বার কাউন্সিল এর দিকে নিতে। যতটুকু জানি চাকরি পরীক্ষা এবং বার কাউন্সিল গুলোতে নারীদের মুখ খুলে পুরো সময় জুড়ে পরীক্ষা দিতে হয়, এবং কান ও বের করে রাখতে হয়। আর ভাইবার সময়েও। আমার মা যখন পরীক্ষা দিয়েছেন এবং অন্যান্য আত্মীয় রাও যখন এক্সাম দিয়েছেন এমনই হয়েছিলো। আমার পক্ষে কোনোভাবেই এটা সম্ভব না। এটা আমার জন্য মৃত্যু সমতুল্য। তবে পরিবারকে বোঝানোর মতো পরিস্থিতিও নেই। যেহেতু পরিবারে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস চলছে। তাই আমি সৌদি স্কলারশিপ এ ব্যাচেলর এ আবেদন করতে চাচ্ছিলাম। যদি টিকে যাই তাহলে ফ্যামিলি তেও কিছু সাপোর্ট দিতে পারবো ইন শা আল্লাহ্। এখন যদি আমি এটা না করি আমার পরিবার আমায় চাকরি র পরীক্ষা বা অন্যান্য বিষয়ে প্রেশার ক্রিয়েট করবে। কিন্তু এখানে তাদের প্ল্যানে চললে দ্বীন পালন করা প্রপার্লি সম্ভব না। তাই আমি আমার প্রোফাইল সেভাবে রেডি করছি যাতে স্কলারশিপ এর জন্য এগিয়ে থাকি। আর আমি যতটুকু জানি সৌদি তে ছেলে মেয়ী ক্যাম্পাস আলাদা হয়ে থাকে। পর্দার ক্ষেত্রে কোনরকম সমস্যা হওয়ার কথা না। একজনের সাথে এই স্কলারশিপ সংক্রান্ত কথা বার্তা চলাকালীন মা শুনে ফেলেছিলেন, আর বলেছিলেন এসবের দিকে না যেতে। কিন্তু তাদের প্ল্যানে অনুযায়ী আগালে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে দ্বীন পালনে। যেটা মেনে নেয়া আমার জন্য অসম্ভব। এখন আমার কি স্কলারশিপ এর আবেদনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ হবে?
Answer
উত্তর: মাহরাম ছাড়া নারীদের বাইরে স্কলারশিপে পড়াশোনা ও চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
উত্তর
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নারীর জন্য মাহরাম (মহরম) পুরুষ ছাড়া সফর করা এবং বেগানা পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা করা নিষিদ্ধ (হারাম)। তবে আপনার প্রশ্নে দুটি ভিন্ন বিষয় জড়িত আছে — (১) সৌদি স্কলারশিপে পড়াশোনা, এবং (২) দেশে চাকরির পরীক্ষা ও বার কাউন্সিলে অংশগ্রহণ। এ দুটির হুকুম আলাদা। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. নারীর সফর ও মাহরামের বিধান
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
"কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৬২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৩৯
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তিন দিন ও তিন রাতের দূরত্বের সফরে মাহরাম ছাড়া নারীর সফর করা জায়েয নয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৪; আল-হিদায়া, খণ্ড ১)
তবে হানাফি ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাফসীল রয়েছে: যদি নারী সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে থাকে — যেমন আলাদা নারী ক্যাম্পাস, আলাদা হোস্টেল, পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা, বেগানা পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশার সুযোগ না থাকে — এবং মাহরামের সাথে যাওয়া-আসা সম্ভব হয়, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্যে সফরের অনুমতি রয়েছে। ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতও এদিকে ঝুঁকে আছে কিছু ক্ষেত্রে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৬৩; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৯৭)
২. সৌদি স্কলারশিপের ক্ষেত্রে
আপনি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন:
- সৌদিতে ছেলে-মেয়ের ক্যাম্পাস আলাদা
- পর্দার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই
- নারীদের জন্য আলাদা পরিবেশ
এগুলো সঠিক হলে এবং নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হলে সৌদি স্কলারশিপে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হতে পারে:
| শর্ত | বিবরণ | |------|--------| | ১ | মাহরাম পুরুষের সাথে সফর (বাবা/ভাই/চাচা/মামা) | | ২ | সম্পূর্ণ পর্দার ব্যবস্থা | | ৩ | বেগানা পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা না থাকা | | ৪ | নিরাপত্তা নিশ্চিত | | ৫ | দ্বীনি পরিবেশ বজায় থাকা |
বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ: মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানিতে উল্লেখ করেছেন যে, নিরাপত্তা ও পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা থাকলে নারীদের শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে, তবে মাহরামের সাথে যাওয়া অপরিহার্য। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৯৭-৪৯৮)
৩. চাকরির পরীক্ষা ও বার কাউন্সিলের ক্ষেত্রে
আপনি যে সমস্যাগুলোর কথা বলেছেন:
- মুখ খুলে পুরো সময় পরীক্ষা দিতে হয়
- কান ও বের করে রাখতে হয়
- ভাইবার সময়েও একই অবস্থা
এগুলো নিঃসন্দেহে শরীয়তবিরোধী। কারণ:
-
মুখ খোলা রাখা — বেগানা পুরুষের সামনে নারীর মুখ খোলা রাখা হানাফি মাজহাবে হারাম। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৯; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৮)
-
কান বের করে রাখা — কানও নারীর সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে বেগানা পুরুষের সামনে তা প্রদর্শন করা নিষিদ্ধ। (বাহিশতী জেওর, পৃ. ২৩)
-
ভাইভা/মৌখিক পরীক্ষা — বেগানা পুরুষের সাথে সরাসরি কথা বলা, বিশেষত দীর্ঘ সময় ধরে — এটি খালওয়া (নির্জন মেলামেশা)-এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা হারাম।
وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى
"আর তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রকাশ করো না।" — সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৩
সুতরাং, যে পরীক্ষায় পর্দার বিধান লঙ্ঘন করতে হয়, তা আপনার জন্য জায়েয নয়। এমতাবস্থায় পরিবারের চাপে পড়ে তা করা আপনার জন্য জায়েয হবে না।
৪. আপনার করণীয়
ক. সৌদি স্কলারশিপের জন্য প্রস্তুতি
যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো নিশ্চিত হয়:
- ✅ মাহরামের সাথে যাওয়া-আসা সম্ভব
- ✅ পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা
- ✅ নিরাপদ পরিবেশ
- ✅ দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ
তাহলে আপনি সৌদি স্কলারশিপের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন। এটি চাকরির পরীক্ষার চেয়ে অনেক বেশি দ্বীনসম্মত।
খ. পরিবারকে বোঝানো
পরিবারকে শান্তভাবে ও হিকমতের সাথে বোঝানোর চেষ্টা করুন:
- কুরআন-হাদীসের দলিল পেশ করুন
- হানাফি ফিকহের বক্তব্য তুলে ধরুন
- সৌদি স্কলারশিপের সুবিধা ব্যাখ্যা করুন — যেমন: দ্বীনি পরিবেশ, পর্দার ব্যবস্থা, আর্থিক সহায়তা
- ধৈর্য ও দুআ অবলম্বন করুন
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" — সূরা আত-তালাক, আয়াত ২
গ. চাকরির পরীক্ষার বিষয়ে
যেহেতু চাকরির পরীক্ষায় পর্দার বিধান লঙ্ঘন করতে হয়, তাই:
- এটি আপনার জন্য জায়েয নয়
- পরিবারের চাপে পড়ে হারাম কাজ করা যাবে না
- "আল্লাহর অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই" — এই হাদীসটি স্মরণ রাখুন
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
"সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১০৯৮
উল্লেখ্য, তবে এক্ষেত্রে চাকুরী করা আপনার জন্য বিশেষ আবশ্যকীয় হলে,ইহা ছাড়া আপনার ভরনপোষণ কোনোক্রমেই সম্ভব না হলে,সেক্ষেত্রে কিছু কিছু ফুকাহায়ে কেরামগন এক্ষেত্রে এভাবে চেহারা খুলে ভাইভা পরীক্ষা দিতে অনুমতি দিয়েছেন। তবে ইস্তিগফার শর্ত বলেছেন।