কোনো পুরুষ কি কামভাব ছাড়া বিনা প্রয়োজনে নারীর দিকে তাকাতে পারবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কোনো প্রয়োজন বা শরয়ি কারণ ছাড়া কামভাব না থাকলেও অপরিচিত নারীর দিকে তাকানো জায়েজ নয়। বরং দৃষ্টি অবশ্যই সংযত রাখতে হবে। এ বিষয়ে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবগুলোতে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
প্রধান দলিল:
কুরআন:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।" (সূরা আন-নূর, ২৪:৩০)
এ আয়াতে পুরুষদের সাধারণভাবে দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো শর্ত ছাড়া।
হাদিস:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমরা দৃষ্টির যিনা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ দৃষ্টির যিনা চোখের দৃষ্টি।" (বুখারি, মুসলিম)
এ হাদিসে কামভাব বা ফেতনার শর্ত না দিয়ে সাধারণভাবে দৃষ্টিকে "যিনা" বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতামত:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বক্তব্যকে ভিত্তিহীন অপবাদ বলা চলে। বাস্তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং তার অনুসারী ফকিহগণ দৃষ্টি সংযত করাকে ফরজ বলেছেন।
-
রদ্দুল মুহতার (হানাফি ফিকহের বিশ্বকোষ)-এ বলা হয়েছে:
"অপরিচিত নারীর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হারাম, যদিও কামনার আশঙ্কা না থাকে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: 'প্রথম দৃষ্টি মাফ, দ্বিতীয় দৃষ্টি ইচ্ছাকৃত, তাই নিষিদ্ধ'।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৭) -
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগিরি)-তে আছে:
"অপরিচিত নারীর দিকে কামনা-বাসনা ছাড়া তাকানোও জায়েজ নয়, যদি এর মধ্যে ফেতনার আশঙ্কা থাকে বা তা শয়তানের ওয়াসওয়াসার কারণ হয়।" -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভি):
"ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, অপরিচিত নারীর দিকে কেবল দৃষ্টি দেওয়া হারাম। 'প্রথম দৃষ্টি মাফ' বলতে বুঝানো হয়েছে অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত দৃষ্টি কখনো জায়েজ নয়।"
সঠিক ব্যাখ্যা:
কেউ কেউ ভুলবশত ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নামে বলে থাকেন যে, "ফেতনার আশঙ্কা না থাকলে কামভাব ছাড়া দেখা যাবে।" এটি ভুল ও বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাবে:
- প্রথম অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি (যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়) ক্ষমার যোগ্য।
- ইচ্ছাকৃত দৃষ্টি (দ্বিতীয় বার) কামনা-বাসনা ছাড়াও হারাম।
- প্রয়োজন (যেমন চিকিৎসা, বিচার বা কেনাবেচা) ছাড়া কোনো নারীর দিকে তাকানো জায়েজ নয়।
হানাফি ফকিহদের মতামত:
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.): দ্বিতীয় দৃষ্টিও নিষিদ্ধ, প্রথম দৃষ্টি শুধু অনিচ্ছাকৃত হলে মাফ।
- ইবন আবিদিন (রহ.): "অপরিচিত নারীর দিকে ইচ্ছাকৃত দৃষ্টি দেওয়া হারাম, যদিও ফেতনার আশঙ্কা না থাকে।" (রদ্দুল মুহতার)
- মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.): "দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশ সাধারণ, কোনো বিশেষ শর্ত ছাড়াই।" (মা’আরিফুল কুরআন)
সতর্কতা:
ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া শয়তানের পথে প্রথম পদক্ষেপ। কামনা-বাসনা না থাকলেও অভ্যাসগত দৃষ্টি ধীরে ধীরে পাপের দিকে নিয়ে যায়। তাই হাদিসে দৃষ্টিকে "শয়তানের তীর" বলা হয়েছে। (তিরমিজি)
সারসংক্ষেপ:
- প্রশ্নে উল্লেখিত মতামতটি ভিত্তিহীন।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: অপরিচিত নারীর দিকে ইচ্ছাকৃত দৃষ্টি হারাম, তা কামস্পৃহা থাকুক বা না থাকুক।
- প্রথম অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি ক্ষমাযোগ্য, দ্বিতীয় দৃষ্টি ইচ্ছাকৃত হওয়ায় নিষিদ্ধ।
- প্রয়োজন (যেমন ডাক্তারি পরীক্ষা, সাক্ষ্য ইত্যাদি) ছাড়া দৃষ্টি সংযত করাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দৃষ্টির হেফাজত করার তাওফিক দিন।
রেফারেন্স:
- কুরআন (সূরা আন-নূর: ৩০)
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪৩
- রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৭
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৪২৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২০৫