হেদায়েত হারিয়ে ফেলেছি ভেবে হতাশ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7115
Questioner: Mariam
Question Asked: 19 Oct 2026, 07:06 PM
Reviewed & Published: 19 Oct 2026, 07:14 PM
Views: 42
Tokens: 5,588
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন হেদায়েত প্রাপ্ত মেয়ে,স্কুলে ৭ম থাকতেই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যাই।মাদ্রাসায় ভর্তির পরেও অনেক গাফেলতি করছি আমি,ভালো করে পড়াশোনা করি নাই এভবে এভাবে করতে করতে এখন কুদুরি জামাতে পেই, কুদুরিও পড়ি নাই, এখন প্রাইভেট পড়তেছি কিতাব গুলো শেষ করার জন্য।
আমার পরিবার দ্বীনদার নাহ,আমার বয়স এখন ১৮ হচ্ছে আর আমার উপর চাপ পড়ছে, আমার যোগ্যতা চায় তারা,সার্টিফিকেট চায়।বিয়ের চিন্তা করে আমার।এদিকে আমি আমার হেদায়েত পরিপূর্ণ ভাবে হারিয়ে ফেলেছি।
আমি অনেক হতাশ হয়ে যাই আমি কি করব।
তারা চায় আমার ভবিষ্যৎ,।মাদ্রাসায় আমি কি করে পড়ে ভালো রেজাল্ট করতে পারি।
এসব কারণে আমার মাথার উপর অনেক চাপ পড়ে,ভালো করে পড়াশোনাও করতে পারি নাহ আমি,এদিকে আম্মা অসুস্থ।
সব মিলিয়ে সবসময় ডিপ্রেশনে থাকি।বাসায় কিছু বলতেও পারি নাহ,চুপচাপ সহ্য করি,আমার কথা তারা সহ্যও করতে পারে নাহ। নিজেকে অনেক একা লাগে।এদিকে আমি এক আবার আমার জীবনটা গুনাহয় ভরপুর।আল্লাহুম্মাগফিরলি।
হেদায়েত এর ছিটেফোঁটাও নেই আমার মাঝে আর।আমি কীভাবে সব কিছু শুরু করব।কীভাবে পরিবারের গর্বের কারণ হব আমি

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি পড়ে বুঝতে পারছি আপনি ভীষণ মানসিক চাপ ও হতাশার মধ্যে আছেন। প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে নিতে চাই—আপনি যে "হেদায়েত হারিয়ে ফেলেছেন" বলে মনে করছেন, এটি শয়তানের একটি ধোঁকা। আপনি যে নিজের গুনাহ নিয়ে এতটা ব্যথিত, নিজের হেদায়েত নিয়ে এতটা চিন্তিত—এটাই প্রমাণ যে আপনার অন্তরে ঈমানের নূর এখনো জীবিত আছে। হেদায়েত সম্পূর্ণ হারিয়ে গেলে মানুষ নিজের গুনাহ নিয়ে অনুশোচনাই করত না। কাজেই হতাশ হবেন না; বরং এই অনুশোচনাকে তাওবার শক্তিতে রূপান্তর করুন।

প্রথম ধাপ: তাওবা ও আল্লাহর কাছে ফিরে আসা

আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তারা যারা তাওবা করে।" (তিরমিজি: ২৪৯৯)

আপনি নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত নিয়মিত আদায় করুন, বিশেষ করে তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহর কাছে কাঁদুন। ইস্তিগফার বেশি পড়ুন—"আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি"। রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে নিজের অভ্যাস বানিয়ে নেয়, আল্লাহ তার প্রতিটি সংকটের জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন।" (আবু দাউদ: ১৫১৮)

দ্বিতীয় ধাপ: পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনা

কুদুরি জামাতের কিতাবগুলো শেষ করা আপনার জন্য কঠিন কিছু নয়, ইনশাআল্লাহ। নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করুন:

১. নিয়ত ঠিক করুন—শুধু সার্টিফিকেটের জন্য নয়, দ্বীন শেখার নিয়তে পড়ুন। নিয়ত ঠিক হলে আল্লাহ বরকত দেন। ২. দৈনিক রুটিন তৈরি করুন—ফজরের পর কিছুক্ষণ, প্রতিটি ক্লাসের আগে-পরে নির্দিষ্ট সময়ে পড়া। একসাথে অনেক না পড়ে অল্প অল্প করে নিয়মিত পড়ুন। ৩. প্রাইভেট শিক্ষকের সাথে খোলামেলা কথা বলুন—কোন কিতাব কতটুকু বাকি, কীভাবে ধরবেন, তা নিয়ে পরিকল্পনা করুন। ৪. দোয়া করুন—"রাব্বি যিদনী ইলমা" (হে আমার রব! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও—সূরা ত্বহা: ১১৪) এবং পড়ার আগে "রাব্বিশরাহ লী সদরী ওয়া ইয়াসসির লী আমরী" পড়ুন। ৫. মোবাইল ও অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট কমান—এটি মনোযোগ ফেরানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

তৃতীয় ধাপ: পারিবারিক চাপ ও বিয়ের বিষয়

আপনার বয়স ১৮, পরিবার যোগ্যতা ও সার্টিফিকেট চায়—এটি তাদের উদ্বেগ, যা স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখবেন, রিযিক ও বিয়ের সময় আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন। রাসূল ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা চারটি জিনিস নির্ধারণ করেছেন—রিযিক, আয়ু, আমল ও চূড়ান্ত পরিণতি।" (মুসলিম: ২৬৫৩)

বিয়ের চিন্তা নিয়ে অস্থির না হয়ে বরং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং পরিবারকে ধৈর্য ও নম্রতার সাথে বোঝানোর চেষ্টা করুন। আপনার মায়ের অসুস্থতার সময় তার খেদমত করুন—এটি আপনার জন্য সদকা ও জান্নাতের সুযোগ। রাসূল ﷺ বলেছেন: "মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত।" (নাসাঈ: ৩১০৪)

চতুর্থ ধাপ: ডিপ্রেশন ও একাকিত্ব মোকাবিলা

১. নিজেকে একা ভাববেন না—আল্লাহ বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩) ২. কাউকে বিশ্বাস করে কথা বলুন—একজন নেককার শিক্ষিকা বা দ্বীনদার বোনের সাথে মন খুলে কথা বলুন। সব চেপে রাখলে কষ্ট বাড়ে। ৩. সকালে হাঁটুন, ঘুম ঠিক রাখুন—শারীরিক সুস্থতা মানসিক চাপ কমায়। ৪. কৃতজ্ঞতার চর্চা করুন—প্রতিদিন ৩টি নিয়ামতের কথা ভাবুন, যেগুলো আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন। ৫. অতিরিক্ত চাপে থাকলে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—এতে শরীয়তগত কোনো বাধা নেই; এটি চিকিৎসা।

পঞ্চম ধাপ: পরিবারের গর্ব হওয়ার পথ

আপনি পরিবারের গর্ব হতে পারবেন তখনই, যখন আপনি নিজের দ্বীন ও পড়াশোনায় ভারসাম্য রাখবেন। সার্টিফিকেট অর্জন করুন, কিন্তু তার সাথে নামাজ, পর্দা, আখলাক ঠিক রাখুন। আপনার চরিত্র ও দ্বীনদারি দেখে পরিবার নিজেই গর্বিত হবে, ইনশাআল্লাহ। মনে রাখবেন— আপনার সামনে অনেক সময় আছে। হতাশা নয়, ধাপে ধাপে এগিয়ে যান।

আল্লাহ তাআলা আপনার সব দুশ্চিন্তা দূর করুন, আপনার ইলমে বরকত দিন, আপনার মাকে শিফা দান করুন এবং আপনাকে দ্বীনের পথে অবিচল রাখুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.