তালাক, তালাকের অধিকার, কাবিননামায় তালাকের অধিকার সহ বিবিধ প্রশ্ন।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
২। আবার এরকম মনে হচ্ছে, আমি বলেছিলাম, তুমি আমার জীবনে যন্ত্রনা, আমি তোমার থেকে তালাক চাই। তখন আমার স্ত্রী বলেছিল, আচ্ছা, তোমাকে মুক্তি দিলাম।
আমি বুঝতে পারছিনা, কোন কথাটা বলেছিলাম।
তবে মাঝে খুব টেনশন হত, এমন টা, আমি বলেছি, তালাক চাই। স্ত্রী বলল, দিলাম। আমি এই কথা হুজুর কে জিজ্ঞাসা করি নাই, কারন, আমি ভাবি তাম, আমি ত চেয়েছি, দিই ত নাই। আর স্ত্রী ত তালাক দিতে পারে না। তাই জিজ্ঞাসা করি নাই। তবে এখন আমি স্মরণ করতে পারছিনা, কবে কখন আমি এমন কথা বলেছি।
ভাবলে মনে হচ্ছে ২নং ঘটনা আর ১ নং ঘটনা একই ঘটনা।
গত ২/৩ ধরে মনে হচ্ছিল, আমি একথা বলেছি যে, আমি মুক্তি চাই, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যে আমি বলেছি, আমি তালাক চাই। এবং এখন মনে হচ্ছে আমি এটাই বলেছি। অথচ গত ২/৩ দিন আমার এরকম মনে হয়নি।
৩। আমি একদিন আমার স্ত্রীকে ফোনে বলেছিলাম, তুই আমাকে তালাক দিবি। আমি বুএছিলাম, বাড়িতে বলতে। সে বুএছিল, আমি পারব না, তুমি বলো। আমি বলেছিলাম, আমি বলব না, তুমি বলো। আমি বলেছিলাম, আমি কেন বলবো, তুই বলবি।এই কথার দ্বারা কি স্ত্রী তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত হয়ে গেছেন?উল্লেখ্য, এই সময় পর্যন্ত কাবিননামায় আমার স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছিল কি না, তা আমি জানি না। কারণ, আমি শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষর করেছিলাম; এর বাকি বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না।
4. আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমার মা অভিযোগ করেছিলেন। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বকাঝকা করেছিলাম। এরপর আমার স্ত্রী বলেছিল, “তুমি এ রকম করলে আমি আর সংসার করব না।” আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে বলেছিলাম, “তুমি এই কথা কেন বললে? এই কথা কখনো বলবে না। আমি তোমাকে এই কথা বলতে নিষেধ করেছি।” তখন সে বলেছিল, “তুমি এ রকম ব্যবহার করলে সত্যিই আর সংসার করব না।” আমি বলেছিলাম, “আবার ওই কথা বললে, চুপ করো।”
উল্লেখ্য, এই ঘটনার কয়েক দিন আগে আমি বিদেশে এসেছিলাম। এরপর আমাদের নতুন করে কাবিননামা করতে হয়। সেই কাবিননামায় স্ত্রীর তালাকের অধিকারসংক্রান্ত ঘরে ‘হ্যাঁ’ লেখা ছিল এবং শর্ত হিসেবে লেখা ছিল, ‘দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে।’
আমি ২০২২ সাল থেকে এই সমস্যায় ভুগছি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমাম মুফতি আবদুল কুদ্দুস হুজুরের কাছ থেকে আমি ফতোয়া নিতাম। একটি বিষয়ে ফতোয়া নিয়ে বাসায় ফিরে আসার পর আবার অনেক নতুন নতুন কথা মনে পড়ত। এভাবে আমি তাঁর কাছে অনেকবার গিয়েছি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ফতোয়া নিয়েছি।
এখনো অতীতের সেই কথাগুলো আমার মনে পড়ে। সেগুলো মনে পড়লে আমি আবার দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই এবং অসুস্থ বোধ করি। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে আমি মানসিকভাবে কষ্ট পাচ্ছি।
সমস্যাটি এখন আর শুধু তালাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন হুরমতে মুসাহারাতের বিষয়েও গিয়ে পৌঁছেছে.
আমার মনে যদি আবার নতুন করে কোনো প্রশ্ন বা কথা জেগে ওঠে, তাহলে কি আমাকে আবার নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে? আর যদি আমি এই বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন না করি, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?
Answer
উত্তর: তালাক, তালাকের অধিকার ও ওয়াসওয়াসা সংক্রান্ত মাসআলার সমাধান
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনার বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে আপনি দীর্ঘদিন ধরে ওয়াসওয়াসা (শয়তানী কুমন্ত্রণা) ও মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। প্রথমে একটি মূলনীতি মনে রাখবেন—
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা ও কুমন্ত্রণাগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা মুখে বলে বা আমল করে।" — সহীহ বুখারী: ৫২৬৯, সহীহ মুসলিম: ১২৭
অর্থাৎ, শুধু মনে সন্দেহ বা কুমন্ত্রণা আসলে কোনো তালাক পতিত হয় না। তালাকের জন্য স্পষ্ট উচ্চারণ বা লিখিত স্পষ্ট ঘোষণা প্রয়োজন।
১ম ও ২য় ঘটনা: "মুক্তি চাই" বনাম "তালাক চাই"
জবাবঃ- প্রশ্নের বিবরণ মতে এক্ষেত্রে তালাক পতিত হবেনা।
৩য় ঘটনা: "তুই আমাকে তালাক দিবি" — স্ত্রী কি তালাকের অধিকার পেয়েছে?
জবাবঃ- এর দরুন আপনার স্ত্রী তালাকের অধিকার প্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে।
৪র্থ ঘটনা: "আমি আর সংসার করব না" — এটি কি তালাক?
জবাবঃ- প্রশ্নের বিবরণ মতে এক্ষেত্রে তালাক পতিত হবেনা।
হুরমতে মুসাহারাত প্রসঙ্গে:
আপনার বর্ণনায় হুরমতে মুসাহারাতের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। এটি আপনার ওয়াসওয়াসার অংশ। আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে আপনি এমন কিছু করেছেন, তাহলে হুরমতে মুসাহারাত সংঘটিত হয়নি।
রাদ্দুল মুহতার (৩/৩১)-এ উল্লেখ আছে: "হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হওয়ার জন্য নিশ্চিত প্রমাণ প্রয়োজন।"
আপনার মূল প্রশ্নের উত্তর:
প্রশ্ন ১: আমার মনে যদি আবার নতুন করে কোনো প্রশ্ন বা কথা জেগে ওঠে, তাহলে কি আমাকে আবার নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে?
উত্তর: না, প্রতিবার নতুন করে প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই। এটি ওয়াসওয়াসা। আপনি যখনই নতুন সন্দেহে পড়েন, তখন এই মূলনীতি মনে রাখবেন:
"আল-ইয়াকীনু লা ইয়াযুলু বিস-শাক্ক" — নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না।
আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে তালাক হয়েছে, তাহলে তালাক হয়নি। বারবার প্রশ্ন করে সন্দেহ দূর করা সম্ভব নয়; বরং এটি ওয়াসওয়াসা বাড়ায়।
প্রশ্ন ২: যদি আমি এই বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন না করি, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?
উত্তর: না, কোনো সমস্যা হবে না। বরং ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য এটি উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"শয়তান তোমাদের কাছে এসে বলবে: 'এটা কে সৃষ্টি করেছে, ওটা কে সৃষ্টি করেছে?' এমনকি বলবে: 'তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে?' যখন সে এমন প্রশ্ন করে, তখন বলো: 'আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি।'" — সহীহ বুখারী: ৩২৭৬
আপনার করণীয়:
- ওয়াসওয়াসাকে উপেক্ষা করুন — এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা।
- আপনার স্ত্রীর সাথে স্বাভাবিকভাবে সংসার চালিয়ে যান — কারণ তালাক পতিত হয়নি।
- নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির বাড়িয়ে দিন — এটি মানসিক শান্তি দেবে।
- প্রয়োজনে মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন — কারণ দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।
- আর নতুন করে প্রশ্ন করবেন না — যদি সত্যিই কোনো স্পষ্ট ঘটনা ঘটে (যেমন: স্পষ্টভাবে তালাক শব্দ উচ্চারণ), তখনই প্রশ্ন করবেন।