না জেনে কুফরি-শিরকি কথা বললে ইমান যায় কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 6779
Questioner: Forhad miah tuhin
Question Asked: 12 Oct 2026, 10:11 AM
Reviewed & Published: 12 Oct 2026, 10:32 AM
Views: 51
Tokens: 6,357
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ইমানের ব্যাপারে কিছু বিষয় জনাতে চাচ্ছি,,
, ১) না জেনে কুফরি বা শিরকি কথা বললে তাহলে ইমান চলে যাবে,, সেটা যে কোন ধরনের কুফরি বা শিরকি কথা হোক, নাকি এইখানে কথা আছে যে অমুক কথা কথা বললে, আর সেটা না জেনে বললেও ইমান চলে যাবে,,,,
২) বদ নজর এর ব্যাপারে,, আমাদের সমাজে এই কথা প্রচলিত আছে যে অমুকের মুখ লাগছে,, এইটা বলা ঠিক কিনা,, আমি ত দুস্টামি করে একজনকে বলেছিলাম যে তাদের টাকা দেয়া হয় off হয়ে গেছে শুকুনের মুখ লাগছে,,,, এখন এইসব কথায় কি ইমান চলে যায়,, বিশাস করে বলেছিল্মা কিনা বলতে গেলে বদ নজর সঠিক এই চিন্তায় বলা আর কি,,
, ৩) আল্লাহ পাকের হুকুমের ব্যাপারে কেউ যদি এই চিন্তা করে যে এইটা গুনাহ কিন্তু এখন এইটা দরকার আছে,, তাহলে? যদি সে না জানে এই ধরনের কথায় ইমান এর সমস্যা হয়,পরে জানতে পরে নিজে ভয়ে থাকে ইমান নিয়ে,,,,

Answer

ইমান সম্পর্কিত তিনটি প্রশ্নের উত্তর

উত্তর (বাংলা):

ভূমিকা

ইমান হলো দ্বীনের মূল ভিত্তি। কুফরি ও শিরকি বিষয় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত ইমান ও আকিদা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং মুখকে কুফরি-শিরকি কথা থেকে হেফাজত করা। নিচে আপনার তিনটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।


১) না জেনে কুফরি বা শিরকি কথা বলা

মূলনীতি: কুফরি বা শিরকি কথা বলার দ্বারাই ইমান চলে যায় — যদি তা ইচ্ছাকৃতভাবে বা জেনে-বুঝে বলা হয়। তবে না জেনে বলা হলে ফকিহগণের মধ্যে تفصيل (বিস্তারিত) রয়েছে:

(ক) যে বিষয়গুলোতে ইজমা (সর্বসম্মতি) আছে — সেগুলো না জেনেও বললে ইমান চলে যায়

যেমন:

  • আল্লাহকে গালি দেওয়া
  • নবী ﷺ-কে গালি দেওয়া
  • কুরআনকে অস্বীকার করা বা অবমাননা করা
  • আল্লাহর একত্ব (তাওহিদ) অস্বীকার করা
  • রিসালাত অস্বীকার করা
  • জানা-অজানা নির্বিশেষে এ ধরনের কথা কুফরি

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ "যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা বলবে: আমরা তো কেবল হাসি-তামাশা করছিলাম। বলুন: তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে?" — (সূরা তাওবা: ৬৫)

এই আয়াতের পর আল্লাহ বলেন:

لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ "অজুহাত দেখিও না, তোমরা ইমান আনার পর কুফরি করেছ।" — (সূরা তাওবা: ৬৬)

ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

"কুফরি কালাম ইচ্ছাকৃতভাবে বললে ইমান চলে যায়, আর ভুলবশত বা না জেনে বললে — যদি সে বিষয়টি এমন হয় যা দ্বীনের ضروری বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত (যা প্রত্যেক মুসলিমের জানা আবশ্যক), তাহলে তাও কুফরি।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪, কিতাবুল জিহাদ)

(খ) যে বিষয়গুলো সূক্ষ্ম — সেগুলো না জেনে বললে ইমান যায় না

যেমন:

  • কোনো সূক্ষ্ম মাসআলায় ভুল ব্যাখ্যা
  • শব্দের অর্থ না জেনে বলা
  • ভুল করে জিহ্বা থেকে বেরিয়ে যাওয়া (যা অন্তরে বিশ্বাস করে বলা হয়নি)

মূলনীতি: ইমান চলে যায় তখনই, যখন অন্তরে বিশ্বাস থাকে কুফরির, অথবা জেনে-বুঝে কুফরি কালাম বলা হয়। শুধু মুখে উচ্চারণ করলেই ইমান যায় না, যদি না তা কুফরি হিসেবে জানা থাকে।

আল-হিদায়া-তে আছে:

"الكفر هو جحود ما يجب الإيمان به" "কুফর হলো সেই বিষয়কে অস্বীকার করা যা ইমান আনা আবশ্যক।" — (আল-হিদায়া: কিতাবুল ইমান)

(গ) আপনার প্রশ্নের সরল উত্তর

  • সাধারণ কুফরি-শিরকি কথা (যা দ্বীনের ضروری বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত) — না জেনে বললেও ইমান চলে যায়।
  • সূক্ষ্ম বিষয় — না জেনে বললে ইমান যায় না, তবে তাওবা করতে হবে এবং জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
  • সন্দেহ হলে — তাওবা করুন, কালিমা পড়ুন, এবং ইমানের আকিদা নবায়ন করুন।

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

"যে ব্যক্তি না জেনে কুফরি কালাম বলেছে, তার উচিত তাওবা করা এবং ইমান নবায়ন করা। যদি সে জানত না যে এটি কুফরি, তবে ইমান যায়নি — তবে তাওবা জরুরি।" — (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৭২)


২) বদ নজর ও "অমুকের মুখ লাগছে" বলা

(ক) বদ নজরের হাকিকত

বদ নজর (নজর) শরীয়তসম্মত একটি বাস্তবতা। রাসূল ﷺ বলেন:

الْعَيْنُ حَقٌّ "নজর লাগা সত্য।" — (সহিহ বুখারি: ৫৭৪০, সহিহ মুসলিম: ২১৮৭)

তবে নজর লাগা আল্লাহর হুকুমেই হয় — নজর নিজে স্বাধীনভাবে কোনো কিছু করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا هُم بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ "তারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে না।" — (সূরা বাকারা: ১০২)

(খ) "অমুকের মুখ লাগছে" বলা

এই ধরনের কথা বলার হুকুম:

  1. যদি বিশ্বাস করা হয় যে নজর নিজে ক্ষতি করে — এটি শিরক। কারণ ক্ষতি করার একমাত্র ক্ষমতা আল্লাহর।
  2. যদি বিশ্বাস করা হয় যে আল্লাহর হুকুমে নজর লাগে — এটি জায়েজ, তবে এভাবে বলা অনুচিত।
  3. "শুকুনের মুখ লাগছে" — এ ধরনের কথা বলা:
    • যদি বিশ্বাস করে বলা হয় যে শুকুন বা তার মুখ নিজে ক্ষতি করেছে → শিরক
    • যদি বিশ্বাস করে বলা হয় যে আল্লাহর হুকুমে হয়েছে → জায়েজ, তবে অনুচিত ও কুসংস্কার

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:

"من اعتقد أن شيئا من المخلوقات يضر أو ينفع بذاته فقد كفر" "যে বিশ্বাস করে কোনো মাখলুক নিজে ক্ষতি বা উপকার করতে পারে, সে কুফরি করেছে।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি: ২/২৭৬)

(গ) আপনার প্রশ্নের সরল উত্তর

  • আপনি যদি বিশ্বাস করে বলে থাকেন যে "শুকুনের মুখ লাগছে" — অর্থাৎ শুকুন নিজে ক্ষতি করেছে → ইমান চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, তাওবা ও ইমান নবায়ন করুন।
  • আপনি যদি বিশ্বাস করে বলে থাকেন যে "আল্লাহর হুকুমে নজর লাগছে" → ইমান যায়নি, তবে এভাবে বলা উচিত নয়।
  • সন্দেহ থাকলে — তাওবা করুন, কালিমা পড়ুন, ইমান নবায়ন করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:

"নজর লাগা সত্য, কিন্তু নজরকে স্বাধীন ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করা শিরক। 'অমুকের মুখ লাগছে' — এ ধরনের কথা যদি আল্লাহর হুকুমের অধীন মনে করে বলা হয়, তবে কুফরি নয়, তবে কুসংস্কারমূলক কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত।" — (ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৪৭)


৩) আল্লাহর হুকুমের ব্যাপারে "এটা গুনাহ কিন্তু এখন দরকার" — চিন্তা করা

(ক) এই চিন্তার বিশ্লেষণ

যদি কেউ মনে করে:

  • "এটা গুনাহ, কিন্তু এখন আমার দরকার" — এবং হালাল মনে করে সেই কাজ করে → কুফরি (কারণ হালাল-হারাম নির্ধারণের অধিকার আল্লাহর)।
  • যদি গুনাহ জেনেই দুর্বলতাবশত করে → গুনাহগার, কিন্তু কুফরি নয়।
  • যদি না জানে যে এই চিন্তা বা কাজ ইমানের জন্য ক্ষতিকর → ইমান যায় না, তবে তাওবা করতে হবে।

দলিল: আল্লাহ বলেন:

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ "যে আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফির।" — (সূরা মায়িদা: ৪৪)

তবে ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"استحلال الحرام كفر، وارتكاب الحرام مع الاعتقاد بالحرمة ليس كفرا بل فسق" "হারামকে হালাল মনে করা কুফরি, আর হারামকে হারাম জেনে করা কুফরি নয় বরং ফিসক।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪)

(খ) আপনার প্রশ্নের সরল উত্তর

  • যদি না জেনে এই ধরনের চিন্তা করে থাকেন → ইমান যায়নি।
  • যদি জেনে-বুঝে হারামকে হালাল মনে করেন → ইমান চলে যাওয়ার আশঙ্কা।
  • পরে জেনে ভয় পাওয়া — এটি ইমানের আলামত। ভয় পাওয়া মানে ইমান জীবিত আছে।
  • তাওবা করুন, ইস্তিগফার করুন, ইমান নবায়ন করুন।

মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

"গুনাহকে গুনাহ জেনে করা ঈমান নষ্ট করে না, কিন্তু হালাল মনে করা ঈমান নষ্ট করে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং হারামকে হালাল মনে করা থেকে বেঁচে থাকা।" — (মা'আরিফুল কুরআন: ৩/১৩৫)


সারসংক্ষেপ ও আমল

| বিষয় | ইমান যায়? | করণীয় | |------|-----------|--------| | না জেনে সাধারণ কুফরি কথা | হ্যাঁ (ضروری বিষয় হলে) | তাওবা + ইমান নবায়ন | | না জেনে সূক্ষ্ম বিষয় | না | তাওবা + জ্ঞান অর্জন | | নজরকে স্বাধীন ক্ষমতা মনে করা | হ্যাঁ (শিরক) | তাওবা + ইমান নবায়ন | | আল্লাহর হুকুমে নজর — বিশ্বাস | না | তাওবা, কুসংস্কার বর্জন | | হারামকে হালাল মনে করা | হ্যাঁ | তাওবা + ইমান নবায়ন | | গুনাহ জেনে করা | না (ফিসক) | তাওবা + ইস্তিগফার |

আমল:

  1. তাওবা করুন — «أستغفر الله ربي من كل ذنب وأتوب إليه»
  2. কালিমা পড়ুন — «لا إله إلا الله محمد رسول الله»
  3. ইমান নবায়ন করুন — «آمنت بالله كما هو بأسمائه وصفاته»
  4. মুখকে কুফরি-শিরকি কথা থেকে হেফাজত করুন
  5. আকিদা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুন

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইমানের উপর অটল রাখুন এবং কুফরি-শিরক থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.