বাবার হারাম-হালাল মিশ্র ইনকাম থেকে সন্তানের খরচ নেওয়ার বিধান।
Halal and Haram · Hanafi
Question
১.
আমার বাবার ইনকামের সোর্স ৪টা।
ক. হোমিও ডাক্তার
খ. স্কুলে ড্রয়িং শেখান
গ. কয়েকটা বাচ্চা ড্রয়িং শিখতে আসে
ঘ. কিশোর-কিশোরী ক্লাব(১৪-১৫ বছরের ছেলেমেয়েরা একসাথে গল্প-কবিতা-গান এসব করে সম্ভবত)।
এখন তার ড্রয়িং এর মাঝে ২০% এর মত হয়তো প্রাণীর ছবি থাকতে পারে(গ্রামের দৃশ্য, মাছ), আর হোমিও অষুধ সম্ভবত হালাল৷ কিশোর ক্লাবে ফ্রিমিক্সিং হয় এবং কী শেখায় এটা জানিনা। স্কুলে একটা সমিতির মতও আছে, সেখানে সবাই টাকা দেন আর কোনো মাসে একসাথে বেশকিছু টাকা পান। বাবা হারাম-হালাল মানেননা।
আমার মা আলিয়া মাদ্রাসায় চাকরি করেন।
সেখানে উনি হঠাৎ হঠাৎ হয়তো কম পড়ান। কতটুকু হারাম জানিনা। মায়ের টাকা নরমালি সংসারের দৈনন্দিন কাজে খরচ হয়না, অসুখ-বিসুখ বা পড়াশোনায় লাগে।
আমার কি নিজের ইনকাম করা উচিত? না হলে বাবার ইনকাম থেকে নিজের খরচের কতটুকু নিতে পারব? শুধু ভাত? নাকী মুখরোচক খাবার(বিস্কিট, চিপস, আইসক্রিম) এগুলোও নিতে পারব? আর কাপড়-চোপড়ের নিয়ম কী?
আমার দুয়া ইবাদত কবুল হোক এটা চাই।
২. গতকাল আমি একটা হিন্দু দোকান থেকে চাল কিনেছিলাম, প্রথমে আমি একটা বস্তা দেখালেও দোকানদার ভুল করে অন্য বস্তার চাল দিয়ে ব্যাগ ভরে ফেলে৷ পরে আমি বলে চেঞ্জ করেছি। ঠিক তখন একজন মহিলা একটা বালতি থেকে গ্লাসে পানি এনে দোকানের সামনের মেঝেতে ছিটাতে থাকেন, ততক্ষণে আমার চাল পলিথিনে ভরা শেষ৷ একটু পরে মহিলা ওই পানিটা উপরের দিকে(যেখানে চালের বস্তাটা ছিল) সেখানেও ছিটান। পরে বালতির পানিটা নিজের পায়ে ঢেলে দেন। তখন আমার হঠাৎ মনে হয় এটা গরুর প্রশ্রাব না তো? তখন তাড়াতাড়ি সরে যাই৷ কিন্তু এটা যদি আসলেই গোবরপানি হয় আর এই মহিলা যদি কাল সকালেও পানি ছিটিয়ে থাকেন আর আমি যে চাল নিয়েছি সেখানেও লেগে থাকতে পারে! উল্লেখ্য যে একবার আমি চাল বদলানোর পরে আবার বদলাতে সংকোচ হওয়ায় বদলাইনি৷ পরে চালের প্যাকেটটা তাদের দোকানেই রেখে অন্য বাজার করতে যাই। তখন যদি তারা প্যাকেট খুলে সেখানে নাপাক পানি দেয়?
এখন আমার কী করণীয়? যেহেতু নাপাক পানি চালে লাগতে দেখিনি, তাই চালটাকে পাক ধরে নেব? নাকী সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থা নেব?
Answer
উত্তর (বাংলা)
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আপনার প্রশ্ন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি।
প্রথম প্রশ্ন: বাবার ইনকাম ও নিজের খরচের বিধান
১. বাবার ইনকামের সোর্স বিশ্লেষণ
ক. হোমিও ডাক্তারি:
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও ঔষধ বিক্রি সাধারণত জায়েজ। তবে ঔষধে হারাম উপাদান (যেমন অ্যালকোহল-ভিত্তিক টিংচার) থাকলে সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। সম্ভবত হালাল বলেই ধরে নিচ্ছি।
খ. স্কুলে ড্রয়িং শেখানো:
ছবি আঁকা শেখানোর বিধান নির্ভর করে কী আঁকানো হয় তার উপর।
- প্রাণীর ছবি (জীবন্ত সত্তার ছবি): হানাফি মাযহাবে প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকা ও আঁকানো নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে—
«إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ»
"কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে ছবি নির্মাতারা।" (সহিহ বুখারি: ৫৯৫০, সহিহ মুসলিম: ২১০৯) - তবে গাছ, নদী, পাহাড়, ঘর, মাছ ইত্যাদি প্রাণহীন বস্তুর ছবি আঁকা জায়েজ। মাছ সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ আছে; ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে মাছের ছবিও আঁকা মাকরুহ। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৫৫৬)
গ. বাচ্চাদের ড্রয়িং শেখানো: একই বিধান।
ঘ. কিশোর-কিশোরী ক্লাব:
এখানে ফ্রি-মিক্সিং (ছেলে-মেয়ের অবাধ মেলামেশা) হলে তা নাজায়েজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ»
"আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।" (সহিহ বুখারি: ৫০৯৬)
আর গান-বাজনা শরিয়তে নিষিদ্ধ। (সূরা লুকমান: ৬; তিরমিজি: ১০০০)
সমিতির টাকা:
যদি সমিতি সুদভিত্তিক হয়, তবে তা হারাম। রাসূল ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লানত করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
২. বাবার ইনকাম থেকে খরচ নেওয়ার বিধান
মূলনীতি:
পিতার সম্পদ সন্তানের জন্য হালাল, তবে শর্ত হলো—পিতার উপার্জন মূলত হালাল হওয়া। যদি উপার্জনের বড় অংশ হারাম হয়, তবে সন্তানের জন্য সেখান থেকে খাওয়া জায়েজ নয়।
«يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا»
"হে মানুষ! পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র, তা থেকে খাও।" (সূরা বাকারা: ১৬৮)
আপনার করণীয়:
১. নিজের ইনকাম করা উত্তম ও নিরাপদ—বিশেষত যদি বাবার ইনকামে হারামের আধিক্য থাকে।
২. যদি বাবার ইনকামে হালাল-হারাম মিশ্রিত হয়, তবে যতটুকু প্রয়োজন (ভাত, কাপড়, চিকিৎসা, শিক্ষা) ততটুকু নেওয়া যাবে। মুখরোচক খাবার (বিস্কিট, চিপস, আইসক্রিম) বাদ দেওয়া উত্তম।
৩. কাপড়-চোপড়: প্রয়োজনীয় কাপড় নেওয়া যাবে; বিলাসী পোশাক পরিহার করুন।
৪. মায়ের টাকা: মায়ের চাকরি যদি হালাল হয় এবং পড়ানোর কাজে অবহেলা না থাকে, তবে তার টাকা হালাল। তবে মাদ্রাসার চাকরিতে অবহেলা করলে তা হারাম হবে।
৫. দুয়া-ইবাদত কবুলের জন্য হালাল রুজির বিকল্প নেই। রাসূল ﷺ বলেছেন—
«إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا»
"নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র বস্তুই কবুল করেন।" (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
পরামর্শ:
- বাবাকে হিকমতের সাথে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
- সম্ভব হলে নিজে হালাল উপায়ে ইনকামের ব্যবস্থা করুন (যেমন অনলাইন শিক্ষা, হালাল হস্তশিল্প ইত্যাদি)।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দুয়া করুন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: চালে নাপাক পানি লাগার সন্দেহ
১. মূলনীতি: সন্দেহের উপর ভিত্তি করে নাপাক সাব্যস্ত হয় না
ফিকহের কায়েদা—
«الْأَصْلُ بَقَاءُ مَا كَانَ عَلَى مَا كَانَ»
"মূলনীতি হলো: যা ছিল তা-ই থাকে।"
অর্থাৎ চাল মূলত পাক ছিল; নাপাক পানি লাগার ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ নেই। শুধু সন্দেহের কারণে চাল নাপাক হবে না।
২. আপনার করণীয়
১. চাল পাক ধরে নিন—কারণ আপনি নাপাক পানি লাগতে দেখেননি।
২. যদি নিশ্চিতভাবে জানতেন যে নাপাক পানি চালে লেগেছে, তবে সেই অংশ ধুয়ে ফেলা বা ফেলে দেওয়া জরুরি হতো।
৩. সতর্কতামূলক ব্যবস্থা:
- চাল রান্নার আগে তিনবার ধুয়ে নিন (যদি সম্ভব হয়)।
- প্যাকেটটি দোকানে রেখে এসেছেন—যদি সন্দেহ হয় যে দোকানদার নাপাক পানি দিয়েছে, তবে সেই চাল ব্যবহার না করাই উত্তম।
- নতুন চাল কিনে নিন।
৩. নাপাক পানি সম্পর্কে হানাফি বিধান
- নাপাক পানি (যেমন প্রস্রাব, গোবর) যদি পাক বস্তুতে লাগে এবং লাগার চিহ্ন (রং/গন্ধ/স্বাদ) না থাকে, তবে শুধু ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট।
- যদি চিহ্ন থাকে, তবে তিনবার ধুতে হবে এবং চিহ্ন দূর করতে হবে। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৩১৩)
উপসংহার:
আপনি নিশ্চিত না হলে চাল পাক ধরে নিন। তবে সতর্কতা হিসেবে ধুয়ে নিন বা নতুন চাল কিনুন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | বাবার হারাম ইনকাম | সন্তানের জন্য খাওয়া জায়েজ নয় (যদি হারাম প্রধান হয়) | | মিশ্র ইনকাম | প্রয়োজনীয় খরচ নেওয়া যাবে; বিলাসী বাদ | | নিজের ইনকাম | উত্তম ও নিরাপদ | | প্রাণীর ছবি আঁকা | নিষিদ্ধ (হানাফি) | | ফ্রি-মিক্সিং ক্লাব | নাজায়েজ | | সুদভিত্তিক সমিতি | হারাম | | চালে সন্দেহ | পাক ধরে নিন; ধুয়ে নিন বা নতুন কিনুন |
দুয়া
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
"হে আল্লাহ! তোমার হালাল দিয়ে আমাকে হারাম থেকে রক্ষা করো এবং তোমার অনুগ্রহ দিয়ে আমাকে অন্য সবার থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করো।" (তিরমিজি: ৩৫৬৩)