স্বামী যদি তালাকের অধিকার প্রদানের নিয়ত ছাড়া শুধু উপদেশ হিসেবে বলে "ভবিষ্যতে খারাপ হলে ডিভোর্স নিয়ে নিও"—তাহলে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী স্ত্রী তালাকের অধিকার পায় কি না?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6243
Questioner: Alisha Tasnim
Question Asked: 02 Oct 2026, 01:48 PM
Reviewed & Published: 02 Oct 2026, 02:50 PM
Views: 19
Tokens: 4,349
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্বামী যদি বলেন যে, তোমার যদি ফিউচারে আমাকে ভালো না লাগে তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দিবা, চিট করবা না। বা ডিভোর্স নিয়ে নিস বা নিস বা নিবি নিয়ে দিয়ে খারাপ হোস অথবা ডিভোর্স দিবি দিয়ে খারাপ হস
—এগুলা অধিকার প্রদানের নিয়ত ছাড়া বলেছেন, তাহলে কি অধিকার পাওয়া যায়?" তিনি মূলত বুঝিয়েছেন আমাকে খারাপ না হয়ে ভালোভাবে থাকার জন্য উপদেশ দিয়েছেন, খারাপ হওয়ার ইচ্ছা হলে তাঁর থেকে তালাক চেয়ে নিয়ে আলাদা হয়ে তখন যা ইচ্ছা করতে পারি নিজে থেকে তালাক নেওয়ার কোনো অধিকার দেননি।

Answer

প্রশ্নের বিশ্লেষণ ও উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
স্বামী বলেছেন—"ভবিষ্যতে যদি আমাকে ভালো না লাগে, তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দেব; চিট করবে না। অথবা ডিভোর্স নিয়ে নিও, নিও বা নেবে—নিয়ে খারাপ হয়ে যাও, অথবা ডিভোর্স দেব—দিয়ে খারাপ হও।"
প্রশ্নকারীর বক্তব্য: স্বামী এসব কথা বলেছেন তালাকের অধিকার প্রদানের নিয়ত ছাড়া, বরং উপদেশ হিসেবে—যাতে স্ত্রী খারাপ না হয়ে ভালোভাবে থাকে। খারাপ হওয়ার ইচ্ছা হলে স্বামীর কাছ থেকে তালাক চেয়ে নিয়ে আলাদা হয়ে যেন যা ইচ্ছা করতে পারে। অর্থাৎ স্বামী নিজে থেকে তালাক নেওয়ার কোনো অধিকার দেননি।

উত্তর:

১. তালাকের অধিকার প্রদান (তাফবিজ) কী?

ইসলামী ফিকহে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের অধিকার প্রদান করতে পারেন। একে বলা হয় তাফবিজুত তালাক (تفويض الطلاق)। এর ভিত্তি হলো কুরআনের আয়াত:

«وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ...» — সূরা আল-বাকারা: ২২৮

আরও একটি দলিল হলো সূরা আল-আহযাবের ২৮ নম্বর আয়াত, যেখানে নবী ﷺ তাঁর স্ত্রীদেরকে ইখতিয়ার দিয়েছিলেন।

হাদিসে এসেছে, নবী ﷺ বলেছেন:

«أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَكَحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ...» — সুনানে তিরমিজি: ১১০২

তবে তাফবিজের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো স্বামীর স্পষ্ট ইচ্ছা ও নিয়ত।

২. হানাফি মাযহাবের মূলনীতি

হানাফি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো:

«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ» — সহিহ বুখারি: ১

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:

"তালাকের তাফবিজ (অধিকার প্রদান) তখনই কার্যকর হয়, যখন স্বামী প্রকৃতপক্ষে তালাকের অধিকার প্রদানের ইচ্ছা করে। যদি সে শুধু উপদেশ বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বলে, তবে তা তাফবিজ হিসেবে গণ্য হবে না।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩০০-৩০৫ (কিতাবুত তালাক)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:

"যদি স্বামী বলে, 'তুমি যদি চাও তালাক নিতে পারো'—এবং তার নিয়ত হয় উপদেশ দেওয়া, অধিকার প্রদান নয়—তবে তা তাফবিজ নয়।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৫

আল-হিদায়া-তে ইমাম মারগিনানি (রহ.) বলেন:

"তাফবিজের ক্ষেত্রে স্বামীর স্পষ্ট ইচ্ছা শর্ত। শুধু শর্তমূলক বাক্য বা উপদেশমূলক বাক্য তাফবিজ সাব্যস্ত করে না, যদি না স্বামী তা অধিকার হিসেবে দিতে চায়।" — আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক, অধ্যায়: তাফবিজ

৩. প্রশ্নের প্রয়োগ

প্রশ্নে স্বামী বলেছেন:

  • "তোমার যদি ফিউচারে আমাকে ভালো না লাগে তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দিব" — এটি ভবিষ্যতে তালাক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, বর্তমানে তালাকের অধিকার প্রদান নয়।
  • "চিট করবা না" — এটি উপদেশ।
  • "ডিভোর্স নিয়ে নিস বা নিস বা নিবি নিয়ে খারাপ হোস" — এটি শর্তমূলক বাক্য, তবে প্রশ্নকারীর বক্তব্য অনুযায়ী স্বামীর নিয়ত ছিল উপদেশ দেওয়া, অধিকার প্রদান নয়।
  • "ডিভোর্স দিবি দিয়ে খারাপ হস" — এটিও উপদেশমূলক।

যেহেতু প্রশ্নকারী স্পষ্ট করেছেন যে স্বামী তালাকের অধিকার প্রদানের নিয়ত করেননি, বরং উপদেশ দিয়েছেন—তাই হানাফি মাযহাব অনুযায়ী স্ত্রী নিজে থেকে তালাক নেওয়ার অধিকার পায়নি।

৪. ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে দলিল

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানিতে বলেন:

"তাফবিজুত তালাকের জন্য স্বামীর স্পষ্ট নিয়ত বা স্পষ্ট শব্দ প্রয়োজন। যদি শব্দগুলো উপদেশমূলক হয় এবং নিয়তও উপদেশের হয়, তবে তাফবিজ সাব্যস্ত হবে না।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০০-৩০৫

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় বলেন:

"স্বামী যদি বলে 'তুমি খারাপ হলে তালাক নিয়ে নিও'—এবং তার উদ্দেশ্য হয় সতর্ক করা, অধিকার দেওয়া নয়—তবে তা তাফবিজ নয়।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫০

আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বেহেশতী জেওরে বলেন:

"স্ত্রী নিজে থেকে তালাক দিতে পারে না, যদি না স্বামী স্পষ্টভাবে তালাকের অধিকার প্রদান করে।" — বেহেশতী জেওর, তালাক অধ্যায়

৫. উপসংহার

প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে:

১. স্বামী তালাকের অধিকার প্রদানের নিয়ত করেননি—তাই স্ত্রী নিজে থেকে তালাক নেওয়ার অধিকার পায়নি।
২. স্বামীর বাক্যগুলো উপদেশমূলক ও শর্তমূলক—এগুলো তাফবিজুত তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
৩. স্ত্রী যদি খারাপ হতে চায় বা আলাদা হতে চায়, তবে তাকে স্বামীর কাছ থেকে তালাক চেয়ে নিতে হবে (খুলা বা তালাকের অনুরোধ)। নিজে থেকে তালাক দেওয়ার অধিকার তার নেই।
৪. তবে স্ত্রী যদি স্বামীর সাথে থাকতে না চায়, ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী সে খুলা (বিনিময়ভিত্তিক তালাক) বা স্বামীর কাছ থেকে তালাক চাইতে পারে।
৫. স্বামী যদি পরে স্পষ্টভাবে বলে "তোমাকে তালাকের অধিকার দিলাম" এবং সেই নিয়ত করে, তাহলে স্ত্রী তালাক নিতে পারবে।

সতর্কতা: তালাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কোনো সন্দেহ থাকলে সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত মুফতি বা দারুল ইফতার সাথে পরামর্শ করা উচিত।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.