স্বামী আমাকে বলেছিলেন যে, "তোমার যদি আমাকে ভালো না লাগে, অন্য কাউকে ভালো লাগে, তাহলে চিটিং না ক
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
প্রশ্ন: স্বামীর এই কথার দ্বারা কি কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয়?
প্রশ্নের সারমর্ম: স্বামী বলেছেন — "তোমার যদি আমাকে ভালো না লাগে, অন্য কাউকে ভালো লাগে, তাহলে চিটিং না করে ডিভোর্স দিবা। দিয়ে যা ইচ্ছা করবা।" এতে কি কোনো অধিকার বোঝায়? তিনি না বুঝেই বলেছেন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, শুধু মুখে বলা এই ধরনের কথার দ্বারা স্ত্রীর জন্য কোনো স্বতন্ত্র "অধিকার" সাব্যস্ত হয় না। তবে এর দ্বারা তালাকের ইখতিয়ার (তালাক-ই-তাফবিজ) বা শর্তযুক্ত তালাক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে — যদি স্বামী সচেতনভাবে ও ইচ্ছাকৃতভাবে তা বলে থাকে। আর "না বুঝে বলা" কথার দ্বারা তালাক পতিত হয় না — কারণ তালাকের জন্য ইচ্ছা ও জ্ঞান (নিয়ত ও কাসদ) শর্ত।
১. তালাকের মূল অধিকার স্বামীর হাতেই
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের হিসাব রেখে তালাক দাও..." — (সূরা আত-তালাক: ১)
"তালাক দুইবার। এরপর হয় সদ্ভাবে রাখা, নয়তো সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তালাকের অধিকার তারই, যে স্ত্রীর পায়ের গোছা ধারণ করে (অর্থাৎ স্বামীর)।" — (সুনান ইবনে মাজাহ: ২০৮১; শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)
সারকথা: মূলত তালাকের অধিকার স্বামীর। স্ত্রী চাইলে স্বামী তাকে তালাকের ইখতিয়ার দিতে পারে — এটাকে তাফবিজুত তালাক বলা হয়।
২. স্বামী যদি বলে "তুমি চাইলে নিজেকে তালাক দিতে পারো" — এটা তাফবিজ
এক্ষেত্রে স্ত্রী চাইলে নিজেকে তালাক দিতে পারে। কিন্তু শর্ত হলো:
- স্বামী সচেতনভাবে ও ইচ্ছাকৃতভাবে এই ইখতিয়ার দিতে হবে।
- শুধু "ডিভোর্স দিবা, দিয়ে যা ইচ্ছা করবা" — এই ধরনের অস্পষ্ট কথায় সাধারণত তাফবিজ সাব্যস্ত হয় না, কারণ এতে স্পষ্টভাবে ইখতিয়ার হস্তান্তরের নিয়ত নেই।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন:
"তালাকের ইখতিয়ার হস্তান্তর তখনই সাব্যস্ত হয়, যখন স্বামী স্পষ্টভাবে তা বলে এবং তার নিয়ত থাকে। অস্পষ্ট বা আবেগের বশে বলা কথায় ইখতিয়ার সাব্যস্ত হয় না।" — (ইগাসাতুল লাহফান, ১/৩৪০-এর কাছাকাছি)
৩. "না বুঝে বলা" — এর হুকুম
তালাকের জন্য দুটি শর্ত অপরিহার্য:
- নিয়ত (ইচ্ছা) — সচেতনভাবে তালাক দেওয়ার সংকল্প।
- কাসদ (উদ্দেশ্য) — কী বলছে তা জেনে বলা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং জোরপূর্বক যা করানো হয় — তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" — (সুনান ইবনে মাজাহ: ২০৪৩; শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি না জেনে বা ভুলে তালাকের কথা বলে, তার তালাক পতিত হয় না। কারণ তালাক একটি ইচ্ছাকৃত কর্ম।" — (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৩/৮৮)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন:
"তালাকের জন্য অবশ্যই ইচ্ছা ও জ্ঞান থাকতে হবে। কেউ যদি না বুঝে বা আবেগের বশে বলে ফেলে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য নয়।" — (আশ-শারহুল মুমতি', ১৩/৭)
৪. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | এতে কি স্ত্রীর কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয়? | না, স্বতন্ত্র কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয় না। | | তাহলে এটা কী? | এটি একটি শর্তযুক্ত তালাকের সম্ভাবনা — যদি স্বামী সচেতনভাবে বলে থাকে। | | "না বুঝে বলেছেন" — তাহলে? | তালাক পতিত হয় না, কারণ নিয়ত ও জ্ঞান ছিল না। | | স্ত্রী কি এখন ডিভোর্স নিতে পারবে? | স্বামীর সম্মতি ছাড়া নয়; তবে খুলা' (স্বামীর সম্মতিতে মুক্তিপণ দিয়ে বিচ্ছেদ) চাইতে পারে। | | স্ত্রী অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেললে? | এটা হারাম — বিবাহিত অবস্থায় পরপুরুষের প্রতি প্রেম করা ইসলামে নিষিদ্ধ। |
৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
-
বিবাহিত অবস্থায় অন্য কারো প্রতি আসক্ত হওয়া হারাম। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না।" — (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
-
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই ধরনের কথা বলা উচিত নয়। এটি শয়তানের ধোঁকা, যা সংসারে ফাটল ধরায়।
-
সমস্যা হলে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী সমাধান নিন — দুই পরিবারের সৎ লোকদের মাধ্যমে সালিশ, প্রয়োজনে ইসলামী আদালত বা মুফতির পরামর্শ।
-
তালাকের বিষয়ে সন্দেহ হলে সরাসরি নির্ভরযোগ্য মুফতি/আলেমের কাছে যান — কারণ এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
উপসংহার
স্বামীর এই কথাটি শুধু আবেগপ্রবণ বা অসচেতন মন্তব্য হিসেবে গণ্য হবে, যদি তিনি সত্যিই না বুঝে বলে থাকেন। এতে স্ত্রীর জন্য কোনো স্বতন্ত্র অধিকার সাব্যস্ত হয় না, এবং তালাকও পতিত হয় না। তবে স্ত্রী যদি সত্যিই বিচ্ছেদ চান, তাহলে ইসলামী পদ্ধতি হলো — খুলা' বা স্বামীর সম্মতিতে তালাক, অথবা শরীয়াহ আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং মুসলিম পরিবারগুলোকে হেফাজত করুন। আমীন।