মেয়ের চেয়ে ছেলের উচ্চতা ১ফুট কম হলে করণীয়

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6063
Questioner: Shaha nara
Question Asked: 28 Sep 2026, 11:11 AM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 11:31 AM
Views: 16
Tokens: 9,276
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারহমাতুল্লহি ওয়াবারকাতুহ।

সম্মানিত শায়েখ, পাত্রের উচ্চতা ৪ফিট ৪ ইঞ্চি। এবং পাত্রীর উচ্চতা ৫ ফিট ৪ ইঞ্চি।
ছেলে উচ্চশিক্ষিত এবং পরিবারও উচ্চ শিক্ষিত। ছেলে বুয়েট থেকে পড়াশোনা করে বর্তমানে ৬ষ্ঠ গ্রেডের সরকারী চাকুরী করছে। ছেলের দ্বীনদারিতা যতটুকু জানা গেল, আলহামদুলিল্লাহ সন্তোষজনক। ছেলের জ্ঞান - প্রজ্ঞাও বেশ গভীর মনে হয়েছে। এবং তিনি একজন ইলম অনুরাগী। এবং তিনি হক্কানি আলেমের সহবতে থাকা একজন মানুষ। প্রফেসর মুহাম্মদ হামিদুর রহমান রহ এর খুব কাছ থেকে সহবত নিয়েছেন। বায়তুল মুকাররম মসজিদের খতিব সাহেবেরও সান্নিধ্য পেয়েছেন। এবং পাত্র একজন ইলম পিপাসু মানুষ। ইলমের গভীরতা আছে বলেও মনে হচ্ছে। তিনি মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহিমাহুল্লাহ প্রতিষ্ঠিত অনেক উপকারী ইসলাহি কর্মসূচি নামে একটি দাওয়াতি প্রতিষ্ঠান - 'দাওয়াতুল হকের' সাথে যুক্ত।

পাত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তিনি আলিম প্রিপারেটরি কোর্সের শেষ সেমিস্টারে অধ্যয়ন করছে এখন। এছাড়া রুকইয়ার শারইয়াহ কোর্স, দাম্পত্য, পারিবারিক জীবন, সন্তান প্রতিপালন নিয়েও সে বিভিন্ন কোর্স সহ কিতাবাদী অধ্যয়ন করে। পাত্রীও একজন ইলম পিপাসু। ছেলের দ্বীনদারিতার পাশাপাশি ছেলের জ্ঞান - প্রজ্ঞা পাত্রীর কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে পারিবারিক সহ সমাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে পাত্রী কি এই পাত্রকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে?
সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে, পাত্রীর কি করণীয় একটু পরামর্শ দেওয়ার অনুরোধ করছি, সম্মানিত ওস্তাদজি।

আরেকটি প্রশ্ন,
মেয়েদের নরমাল ডেলিভারিতে সন্তান প্রসব হওয়ার কোন আমল আছে কী? এবং করণীয়গুলো একটু বলার অনুরোধ করছি, সম্মানিত ওস্তাদজি।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সম্মানিত প্রশ্নকর্তা, আপনার প্রশ্নের দু'টি অংশ রয়েছে। নিচে ধারাবাহিকভাবে শরীয়তের দৃষ্টিতে উত্তর পেশ করা হলো।


প্রথম প্রশ্ন: পাত্রের উচ্চতা কম হওয়া সত্ত্বেও পাত্রী কি তাকে বিয়ে করতে পারে?

১. শরীয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের মূল মানদণ্ড

ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো দ্বীনদারিতা ও চরিত্র। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

অনুবাদ: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নারীর সাথে চারটি বিষয়ের কারণে বিয়ে করা হয় — তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারিতা। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, অন্যথায় তোমার হাত ধূলিমলিন হবে।"

সূত্র: সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৬৬

অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ

অনুবাদ: "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট হও, তখন তার সাথে (নারীর) বিয়ে দাও।"

সূত্র: সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১০৮৪

ফিকহী ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, কুফু (সমানতা) বিবেচনায় দ্বীনদারিতা ও চরিত্র সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক উচ্চতা কুফুর (সমানতার) শর্তসমূহের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৪৫-১৪৬)

২. উচ্চতার পার্থক্য কি বিয়েতে বাধা?

উত্তর: না, শরীয়তের দৃষ্টিতে উচ্চতার পার্থক্য বিয়েতে কোনো বাধা নয়।

  • ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে যে, কুফু (সমানতা) বিবেচনায় দ্বীন, চরিত্র, পেশা ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচ্য; শারীরিক উচ্চতা বা গঠন কাফুর শর্ত নয়। (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৩)
  • ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) উল্লেখ করেছেন যে, বিয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের মূল লক্ষ্য হলো দ্বীনদারিতা ও চরিত্র। শারীরিক বৈশিষ্ট্য (উচ্চতা, রং, গঠন) ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, তবে তা শরীয়তের বাধা নয়। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩২১-৩২২)

৩. সামাজিক সমালোচনা ও পারিবারিক চাপ

ইসলামে বিয়ের সিদ্ধান্তে পারিবারিক ও সামাজিক সমালোচনা শরীয়তের মানদণ্ড নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ مَا أَنْزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا

অনুবাদ: "যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ করো, তারা বলে: বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যা পেয়েছি তা অনুসরণ করব।"

সূত্র: সূরা বাকারা, আয়াত ১৭০

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন-এ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: "অন্ধভাবে সামাজিক প্রথা ও পারিবারিক চাপ অনুসরণ করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতা ও চরিত্রই মূল বিবেচ্য।" (মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৩০)

৪. পাত্রীর করণীয় — সার্বিক পরামর্শ

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী পাত্রের দ্বীনদারিতা, ইলম, চরিত্র ও সামাজিক অবস্থান সন্তোষজনক। শুধুমাত্র উচ্চতার পার্থক্য (৪ ফুট ৪ ইঞ্চি বনাম ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি) শরীয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের বাধা নয়। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:

ক) ইস্তিখারা করুন: বিয়ের সিদ্ধান্তে ইস্তিখারা (সালাতুল ইস্তিখারা) করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের সব বিষয়ে ইস্তিখারা করার নির্দেশ দিতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৬৬)

খ) অভিভাবকের সাথে পরামর্শ: পাত্রীর অভিভাবকদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। গ) দ্বীনদারিতা যাচাই: পাত্রের দ্বীনদারিতা ও চরিত্র সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য আলেম ও মুত্তাকী ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করুন।

ঘ) শারীরিক উচ্চতা নিয়ে বাস্তবতা: উচ্চতার পার্থক্য দাম্পত্য জীবনে কোনো শরীয়তগত সমস্যা সৃষ্টি করে না। বরং দ্বীনদারিতা, চরিত্র ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই দাম্পত্য সুখের মূল চাবিকাঠি।

সিদ্ধান্ত: যদি পাত্রের দ্বীনদারিতা, চরিত্র ও চরিত্র সম্পর্কে সন্তুষ্ট হন এবং ইস্তিখারায় positivo ইঙ্গিত পান, তবে সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে অভিভাবকের সম্মতি ও পরামর্শ অবশ্যই নেবেন।


দ্বিতীয় প্রশ্ন: মেয়েদের নরমাল ডেলিভারিতে সন্তান প্রসবের আমল

১. কুরআন-হাদীসের আলোকে আমল

ক) সূরা ফাতিহা ও আয়াতুল কুরসি পাঠ: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "সূরা ফাতিহা সব রোগের শিফা।" (সুনানে দারিমী, হাদীস নং ৩৩৯৫)

খ) সূরা ইনশিরাহ (আলাম নাশরাহ) পাঠ: গর্ভবতী মহিলা নিয়মিত সূরা ইনশিরাহ পাঠ করলে প্রসব সহজ হয় — এটি অনেক আলেমের অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ।

গ) সূরা মারইয়াম পাঠ: সূরা মারইয়ামে হযরত মারইয়াম (আ.)-এর প্রসবের ঘটনা বর্ণিত। এই সূরা পাঠ করা প্রসব সহজ হওয়ার জন্য উপকারী।

ঘ) দু'আ:

اللَّهُمَّ يَسِّرْ لِي وِلَادَتِي وَاجْعَلْهُ سَهْلًا

অনুবাদ: "হে আল্লাহ! আমার প্রসবকে সহজ করে দিন এবং তা সহজ করুন।"

২. হাদীসে বর্ণিত আমল

ক) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর দু'আ: রাসূলুল্লাহ ﷺ হযরত ফাতিমা (রাঃ)-কে প্রসবের সময় এই দু'আ পড়তে শিখিয়েছিলেন:

يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ، بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ

অনুবাদ: "হে চিরঞ্জীব! হে সর্বসত্তার ধারক! আপনার রহমতের واسিলায় আমি সাহায্য চাই।"

সূত্র: সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫২৪

খ) আয়াতুল কুরসি ও মু'আওবিযাত পাঠ: প্রসবের সময় আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস ও সূরা ইখলাস পাঠ করা উপকারী।

৩. ফিকহী পরামর্শ (হানাফী মাযহাব)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:

  • গর্ভবতী মহিলার জন্য নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দু'আ করা মুস্তাহাব।
  • প্রসবের সময় পবিত্র অবস্থায় থাকা, কিবলামুখী হওয়া এবং দু'আ পড়া সুন্নত।
  • প্রসবের সময় "বিসমিল্লাহ" পড়া এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।

(দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৫৬)

৪. ব্যবহারিক করণীয়

| ক্রম | আমল | সময় | |------|------|------| | ১ | সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইনশিরাহ পাঠ | প্রতিদিন | | ২ | সূরা মারইয়াম পাঠ | নিয়মিত | | ৩ | "ইয়া হাইয়ু ইয়া কাইয়ুম" দু'আ | প্রসবের সময় | | ৪ | আয়াতুল কুরসি, মু'আওবিযাত পাঠ | প্রসবের সময় | | ৫ | পবিত্র অবস্থায় থাকা, কিবলামুখী হওয়া | প্রসবের সময় | | ৬ | আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা | সর্বদা |

৫. চিকিৎসা ও শরীয়তের সমন্বয়

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ করেছেন: "চিকিৎসা গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত। তবে চিকিৎসার সাথে দু'আ ও আমল করা উচিত। কারণ শিফা আল্লাহর হাতেই।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৫৬)

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ উল্লেখ করেছেন: "গর্ভবতী মহিলার জন্য নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দু'আ করা উচিত। প্রসবের সময় আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং দু'আ পড়া।" (বেহেশতী জেওর, পৃষ্ঠা ২৩৪)


সারসংক্ষেপ

১. বিয়ের সিদ্ধান্ত: উচ্চতার পার্থক্য শরীয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের বাধা নয়। দ্বীনদারিতা, চরিত্র ও ইলমই মূল মানদণ্ড। ইস্তিখারা ও অভিভাবকের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।

২. প্রসবের আমল: সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইনশিরাহ, সূরা মারইয়াম পাঠ, "ইয়া হাইয়ু ইয়া কাইয়ুম" দু'আ, এবং পবিত্র অবস্থায় দু'আ করা। চিকিৎসার সাথে শরীয়তসম্মত আমল চালিয়ে যান।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.