স্ত্রী ছাড়া অন্য মেয়ে হারাম এভাবে কসম করা কি জায়েজ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এভাবে কসম করা কি জায়েজ?
স্ত্রীর মৃত্যুপরবর্তীতে অন্য কাউকে বিয়ে করলে কি তা হারাম হবে?
Answer
প্রশ্ন: স্ত্রীর সাথে এভাবে কসম করা যে "তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করলে সব মেয়ে হারাম হয়ে যাবে" — এ কসম করা কি জায়েজ? স্ত্রীর মৃত্যুর পর অন্য কাউকে বিয়ে করলে কি তা হারাম হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
এ ধরনের কসম করা জায়েজ নয়; বরং তা শরীয়তবিরোধী, গুনাহের কাজ। আর এ কসমের কারণে স্ত্রীর মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারী বা জান্নাতের হূর হারাম হবে না। কেউ যদি এ কসম করার পর স্ত্রীর মৃত্যুর পর অন্য কাউকে বিয়ে করে, তবে তা জিনা হবে না, বরং বৈধ বিয়ে হবে। তবে কসম ভঙ্গের কারণে কাফফারা দিতে হবে।
বিস্তারিত উত্তর
১. এ ধরনের কসম করা কি জায়েজ?
না, জায়েজ নয়। কারণ:
- ইসলামে কোনো হালাল বস্তুকে নিজের উপর হারাম করা শরীয়তসম্মত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হালাল করেছেন, তা তোমরা হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।"
— (সূরা মায়িদা: ৮৭)
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ فَرَأَى غَيْرَهَا خَيْرًا مِنْهَا فَلْيَأْتِ الَّذِي هُوَ خَيْرٌ وَلْيُكَفِّرْ عَنْ يَمِينِهِ
"যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম করল, অতঃপর অন্য কিছুকে তার চেয়ে উত্তম দেখল, সে যেন উত্তম কাজটি করে এবং কসমের কাফফারা দেয়।"
— (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৫০)
- এ ধরনের কসম মূলত জাহেলি যুগের "যিহার" ও "হারাম ঘোষণা" প্রথার অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলাম বাতিল করেছে।
২. স্ত্রীর মৃত্যুর পর অন্য কাউকে বিয়ে করলে কি হারাম হবে?
না, কখনোই হারাম হবে না। কারণ:
- কোনো বান্দার কসম আল্লাহর হালাল করা বস্তুকে হারাম করতে পারে না। হালাল সর্বদা হালালই থাকে।
- স্ত্রীর মৃত্যু হলে ইদ্দত শেষে অন্য নারীকে বিয়ে করা সম্পূর্ণ বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَٰلِكُمْ
"এবং এদের ছাড়া অন্য নারীরা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে।"
— (সূরা নিসা: ২৪)
- জান্নাতের হূর তো আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার; কোনো বান্দার কসম তা হারাম করতে পারে না।
৩. কসম ভঙ্গের বিধান
স্ত্রীর মৃত্যুর পর কেউ যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে, তবে সে গুনাহগার হবে না (বরং বিয়ে বৈধ হবে), কিন্তু কসম ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে।
কসম ভঙ্গের কাফফারা হলো (যেকোনো একটি):
- দশজন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো (মধ্যম মানের), অথবা
- দশজন মিসকিনকে বস্ত্র দান, অথবা
- একজন দাস মুক্ত করা (বর্তমানে প্রযোজ্য নয়)।
এগুলোর কোনোটি করতে অক্ষম হলে তিন দিন রোজা রাখবে।
فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ
— (সূরা মায়িদা: ৮৯)
৪. হানাফি ফিকহের দলিল
-
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামি)-এ উল্লেখ আছে: কেউ যদি নিজের উপর হালাল বস্তু হারাম করে, তবে তা হারাম হয় না; বরং কসম হিসেবে গণ্য হয় এবং ভঙ্গ করলে কাফফারা ওয়াজিব হয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল আইমান, ৩/৭২৪-৭২৬)
-
ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে আছে: "যদি কেউ বলে 'অমুক নারী আমার জন্য হারাম', তবে তা কসম হিসেবে বিবেচিত হবে, হারাম হিসেবে নয়।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল আইমান, ২/৫৭)
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)-এ স্পষ্ট করা হয়েছে: নিজের উপর হালালকে হারাম করা বা এ ধরনের কসম করা জায়েজ নেই; তবে তা দ্বারা হালাল হারাম হয় না, কেবল কাফফারা ওয়াজিব হয়।
-
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)-তেও অনুরূপ বিধান বর্ণিত হয়েছে।
৫. বিশেষ সতর্কতা
- এ ধরনের কসম করা গুনাহ, তাই তাওবা করা উচিত।
- কসম ভঙ্গ হলে কাফফারা আদায় করতে হবে।
- স্ত্রীর মৃত্যুর পর অন্য নারীকে বিয়ে করা সুন্নত ও বৈধ; বরং একাকী থাকা বা বিয়ে না করার শর্ত আরোপ করা ভুল।
- জান্নাতের হূর সম্পর্কে এ ধরনের কসম করা সম্পূর্ণ অজ্ঞতা ও বাতিল বিশ্বাসের ফল।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | এভাবে কসম করা | জায়েজ নয়, গুনাহ | | কসমের কারণে অন্য নারী হারাম হবে? | না, কখনোই না | | স্ত্রীর মৃত্যুর পর বিয়ে করা | বৈধ ও সুন্নত | | বিয়ে করলে জিনা হবে? | না, বরং বৈধ বিয়ে হবে | | জান্নাতের হূর হারাম হবে? | না, কখনোই না | | কসম ভঙ্গের কাফফারা | ১০ মিসকিনকে খাবার/বস্ত্র বা ৩ রোজা |
উপসংহার: এ ধরনের কসম করা জায়েজ নয়, বরং গুনাহ। তবে এ কসমের কারণে স্ত্রীর মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারী বা জান্নাতের হূর হারাম হবে না। বিয়ে করলে তা বৈধ হবে, জিনা হবে না; কেবল কসম ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক ফিকহি জ্ঞান দান করুন। আমিন।