স্বামী বলে অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি গেলে চিরজীবনের জন্য তালাক হয়ে যাবে—এখন প্রতিবার অনুমতি নিতে হবে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6032
Questioner: H J
Question Asked: 27 Sep 2026, 08:39 PM
Reviewed & Published: 27 Sep 2026, 09:07 PM
Views: 35
Tokens: 3,650
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্বামী বলে অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি গেলে চির জীবনের জন্য যাবে। এখন প্রতিবার অনুমতি নিয়ে যেতে হবে? একেবারে সব সময়ের জন্য অনুমতি দিলে হবে না? সে বার বার জিজ্ঞাসা করলে বলে একেবারে অনুমতি দিয়ে রাখছি।আর বলতে চায় না।।এখন এভাবে গেলে তালাক হবে কি?

Answer

প্রশ্নের বিশ্লেষণ ও উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: স্বামী বলেছে—"আমার অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি গেলে চিরজীবনের জন্য (তালাক) হয়ে যাবে।" এখন স্ত্রী প্রতিবার অনুমতি নিয়ে যাবে কি? একবারে সব সময়ের জন্য অনুমতি নিলে হবে কি? স্বামী বার বার জিজ্ঞাসা করলে বলে—"একেবারে অনুমতি দিয়ে রাখছি, আর বলতে চাই না।" এভাবে গেলে কি তালাক হবে?


১. মূল নীতি: তালাক শর্তের সাথে ঝুলিয়ে রাখা (তালাক তা'লীক)

স্বামী যদি বলে—"তুমি অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি গেলে তালাক হয়ে যাবে"—এটি তালাক তা'লীক (শর্তসাপেক্ষ তালাক)। অর্থাৎ শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে, নাহলে হবে না।

আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে: শর্তসাপেক্ষে তালাক ঘোষণা করলে শর্ত পাওয়া গেলে তালাক পতিত হয়, অন্যথায় নয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক)

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্বামী "চিরজীবনের জন্য" বলেছে, যা সাধারণত এক তালাক বা তিন তালাক বোঝায় কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।


২. "চিরজীবনের জন্য যাবে" — এর অর্থ কী?

স্বামীর কথার দু'টি সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে:

(ক) এক তালাক বায়েন — অর্থাৎ এক তালাক হবে, যা ইদ্দত শেষে বায়েন হয়ে যাবে। এতে স্ত্রী চিরজীবনের জন্য হারাম হবে না; নতুন মোহরে নতুন বিবাহ সম্ভব।

(খ) তিন তালাক — অর্থাৎ তিন তালাক হবে, যা চিরজীবনের জন্য হারাম করে দেবে (মুগাল্লাযা)।

ফতোয়ার নীতি: স্বামী যদি স্পষ্টভাবে "তিন তালাক" না বলে শুধু "চিরজীবনের জন্য যাবে" বলে, তবে তা এক তালাক বায়েন হিসেবে গণ্য হবে। কারণ "চিরজীবনের জন্য" শব্দটি কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) এবং এতে তিন তালাকের নিয়ত ছাড়া তিন তালাক পতিত হয় না।

ফতোয়া আলমগিরি-তে আছে: কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত থাকলে তালাক পতিত হয়, তবে তা রাজ'ঈ (এক তালাক) হিসেবে। (ফতোয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক)

তবে যদি স্বামী অন্তরে তিন তালাকের নিয়ত করে থাকে, তাহলে তিন তালাকই পতিত হবে।


৩. এখন প্রশ্ন: প্রতিবার অনুমতি নিতে হবে কি?

হ্যাঁ, প্রতিবার অনুমতি নেওয়াই নিরাপদ ও শরীয়তসম্মত পন্থা। কারণ:

  • স্বামীর শর্ত হলো—"অনুমতি ছাড়া গেলে তালাক।" সুতরাং যতবার যাবে, ততবার অনুমতি নিলে শর্ত পূরণ হবে না, তালাক পতিত হবে না।
  • একবার অনুমতি নিয়ে গেলে সেই অনুমতি শুধু সেই সফরের জন্য কার্যকর; পরবর্তী সফরের জন্য নতুন অনুমতি প্রয়োজন—এটাই احتیاط (সতর্কতা)।

৪. একবারে সব সময়ের জন্য অনুমতি দেওয়া কি বৈধ?

হ্যাঁ, বৈধ। স্বামী যদি স্পষ্টভাবে বলে—"আমি তোমাকে সারাজীবনের জন্য অনুমতি দিলাম, তুমি যখন ইচ্ছা বাপের বাড়ি যেতে পারবে"—তাহলে এই সাধারণ অনুমতি (ইযনে আম) দ্বারা শর্ত রহিত হয়ে যায়। তখন স্ত্রী যতবার ইচ্ছা যেতে পারবে, তালাক হবে না।

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: স্বামী যদি সাধারণভাবে অনুমতি দেয়, তবে তা সকল সফরের জন্য প্রযোজ্য হয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইযন)

কিন্তু এখানে সমস্যা: স্বামী বলতে চায় না, বার বার জিজ্ঞাসা করলে বিরক্ত হয়ে বলে—"একেবারে অনুমতি দিয়ে রাখছি।" এ কথাটি যদি স্পষ্ট ও ইচ্ছাকৃত হয়, তবে তা সাধারণ অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যদি শুধু বিরক্তির কারণে বলে থাকে এবং অন্তরে অনুমতি না দেয়, তবে তা অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে না।

ফতোয়ার নীতি: তালাকের শর্তে সন্দেহ থাকলে তালাক পতিত হয় না। কারণ তালাক ইয়াকীন (নিশ্চিত) দ্বারা প্রমাণিত হয়, সন্দেহ দ্বারা নয়।

শরহু মা'আনিল আসার ও আল-হিদায়া-তে আছে: الشك لا يرفع اليقين — সন্দেহ নিশ্চয়তা দূর করে না।


৫. চূড়ান্ত ফতোয়া

| অবস্থা | হুকুম | |---|---| | স্বামী স্পষ্টভাবে সারাজীবনের অনুমতি দিয়েছে (ইচ্ছাকৃতভাবে) | অনুমতি কার্যকর, তালাক হবে না | | শুধু বিরক্তির কারণে "অনুমতি দিয়ে রাখছি" বলেছে, অন্তরে দেয়নি | অনুমতি গণ্য হবে না; অনুমতি ছাড়া গেলে তালাক পতিত হবে (এক তালাক বায়েন, যদি তিন তালাকের নিয়ত না থাকে) | | প্রতিবার অনুমতি নিয়ে যায় | তালাক হবে না, এটাই নিরাপদ পন্থা | | সন্দেহ আছে অনুমতি দিয়েছে কি না | তালাক পতিত হবে না (ইয়াকীন না হওয়া পর্যন্ত) |

পরামর্শ: স্ত্রী প্রতিবার অনুমতি নিয়ে যাওয়াই উত্তম ও নিরাপদ। আর স্বামী যদি সত্যিই সারাজীবনের অনুমতি দিতে চায়, তবে স্পষ্ট ভাষায় বলুক—"আমি সারাজীবনের জন্য অনুমতি দিলাম।" তাহলে আর বার বার জিজ্ঞাসার প্রয়োজন হবে না এবং তালাকের কোনো আশঙ্কা থাকবে না।


তথ্যসূত্র:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), কিতাবুত তালাক
  • আল-হিদায়া (বুরহানুদ্দীন মারগীনানি)
  • ফতোয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক
  • শরহু মা'আনিল আসার (ইমাম তাহাবি)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • ফতোয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.