"স্বামী বলল অনুমতি ছাড়া গেলে তালাক হয়ে যাবে"এখন কি প্রতিবারই অনুমতি নিয়ে যেতে হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি যাওয়া প্রসঙ্গে
সংক্ষিপ্ত উত্তর
স্বামী যদি একবার বলে দেয় "সব সময়ের জন্য অনুমতি দিলাম" — তবে সেই সাধারণ অনুমতিই যথেষ্ট; প্রতিবার আলাদা করে অনুমতি নেওয়া আবশ্যক নয়। তবে শর্ত হলো—স্বামীর দেওয়া অনুমতি তার নিজের ইচ্ছায় হতে হবে, রাগ বা চাপের কারণে নয়। আর স্ত্রীর উচিত স্বামীর সম্মান ও তার অবর্তমানে ঘরের দায়িত্ব রক্ষা করা।
বিস্তারিত আলোচনা
১. স্ত্রীর চলাফেরায় স্বামীর অনুমতির বিধান
ইসলামী শরীয়তে স্ত্রীর জন্য স্বামীর ঘরই তার প্রধান দায়িত্বের ক্ষেত্র। স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর বাইরে যাওয়া—বিশেষত দূরের সফর—নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تُؤْمِنُ امْرَأَةٌ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةَ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
"আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমানদার কোনো নারী তিন দিনের পথের সফর মাহরাম ছাড়া করবে না।" — সহীহ বুখারী: ১০৮৭; সহীহ মুসলিম: ১৩৩৯
আর স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়া সম্পর্কে ফকীহগণ বলেন, এটি স্বামীর হক লঙ্ঘন। রদ্দুল মুহতার-এ আছে:
وَلَيْسَ لَهَا أَنْ تَخْرُجَ مِنْ بَيْتِهِ بِغَيْرِ إِذْنِهِ
"স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বের হওয়া জায়েয নয়।" — রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৪৫ (কিতাবুন নিকাহ)
২. "অনুমতি ছাড়া গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে" — এই কথার হুকুম
স্বামী যদি বলে, "আমার অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি গেলে তুমি চিরজীবনের জন্য (তালাক হয়ে) যাবে" — তবে এ কথার দ্বারা তালাক সংঘটিত হয় না, বরং এটি একটি শর্তমূলক তালাকের ওয়াদা বা হুমকি। এর বিধান হলো:
- যদি স্ত্রী সত্যিই স্বামীর অনুমতি ছাড়া যায়, তবে শর্ত পূর্ণ হওয়ায় এক তালাকে রাজয়ী (ফিরিয়ে আনা সম্ভব) তালাক সংঘটিত হবে — যদি স্বামী "চিরজীবনের জন্য" বা "তালাক" শব্দ ব্যবহার করে থাকে।
- তবে "চিরজীবনের জন্য যাবে" কথাটি যদি তালাকের স্পষ্ট শব্দ না হয় এবং স্বামী তালাকের নিয়তও না করে, তবে তা তালাক নয়, বরং শুধু হুমকি বা ওয়াদা হিসেবে গণ্য হবে।
রদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে শর্তমূলক তালাকের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে:
إِذَا عَلَّقَ الطَّلَاقَ بِشَرْطٍ وَقَعَ عِنْدَ وُجُودِ الشَّرْطِ
"যদি তালাককে কোনো শর্তের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, তবে শর্ত পূর্ণ হলে তালাক সংঘটিত হবে।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫৪
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্বামী যদি শুধু ভয় দেখানোর জন্য বলে এবং তালাকের নিয়ত না থাকে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। ইমাম তাহাবী (রহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত বা স্পষ্ট শব্দ অপরিহার্য।
৩. একবার সাধারণ অনুমতি দিলে প্রতিবার নিতে হবে কি?
না, প্রতিবার আলাদা অনুমতি নেওয়া আবশ্যক নয়। যদি স্বামী স্পষ্টভাবে বলে দেয়—
"আমি তোমাকে সব সময়ের জন্য, যতবার ইচ্ছা, বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দিলাম।"
— তবে এই সাধারণ অনুমতি (ইযনে আম) যথেষ্ট। স্ত্রী প্রতিবার নতুন করে অনুমতি না নিয়েও যেতে পারবে, তবে—
- স্বামীর দেওয়া অনুমতি তার সন্তুষ্টি ও স্বেচ্ছায় হতে হবে — রাগ, চাপ বা বাধ্যবাধকতার কারণে নয়।
- অনুমতির সীমা রক্ষা করতে হবে — যদি স্বামী বলে "মাসে একবার" বা "নির্দিষ্ট সময়ের জন্য", তবে সেই সীমা মানতে হবে।
- স্বামীর অবর্তমানে ঘরের দায়িত্ব ও সন্তান-সন্ততির দেখাশোনা করতে হবে।
- স্বামী যদি পরে অনুমতি প্রত্যাহার করে, তবে তা মানতে হবে।
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
"স্বামী যদি স্ত্রীকে বাপের বাড়ি যাওয়ার সাধারণ অনুমতি দেয়, তবে স্ত্রী সেই অনুমতির আওতায় যেতে পারবে; প্রতিবার অনুমতি নেওয়া জরুরি নয়। তবে স্বামী যদি নির্দিষ্ট সময় বা সংখ্যার সীমা নির্ধারণ করে, তবে তা মানা আবশ্যক।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩২ (কিতাবুন নিকাহ)
৪. স্ত্রীর কর্তব্য
স্ত্রীর উচিত—
- স্বামীর অনুমতি নিয়ে যাওয়া, কারণ এটি স্বামীর হক।
- স্বামীকে বার বার জিজ্ঞাসা করে বিরক্ত না করা, যদি সে একবার সাধারণ অনুমতি দিয়ে থাকে।
- স্বামীর সম্মান ও তার ঘরের হক রক্ষা করা।
- স্বামী যদি অনুমতি দিতে না চায়, তবে ধৈর্য ধারণ করা এবং তার মন জয় করার চেষ্টা করা।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"আর তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — সূরা আন-নিসা: ১৯
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি যাওয়া | নাজায়েয (স্বামীর হক লঙ্ঘন) | | "অনুমতি ছাড়া গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে" | তালাকের নিয়ত থাকলে শর্তমূলক তালাক; নিয়ত না থাকলে শুধু হুমকি | | একবার সাধারণ অনুমতি দিলে | প্রতিবার নেওয়া আবশ্যক নয়, তবে সীমা মানতে হবে | | স্বামী অনুমতি দিতে না চাইলে | ধৈর্য ধারণ ও সদ্ভাব রক্ষা করা |
পরামর্শ: স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত পরস্পরের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। স্ত্রী যদি স্বামীর অনুমতি নিয়ে বাপের বাড়ি যায় এবং স্বামী যদি সাধারণ অনুমতি দিয়ে রাখে, তবে উভয়ের জন্য তা-ই উত্তম। তবে তালাকের হুমকি দেওয়া বা শর্তমূলক তালাক উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য, কারণ এটি সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী: ১০৮৭
- সহীহ মুসলিম: ১৩৩৯
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৪৫
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫৪
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৫
- বাহিশতী জেওর, নিকাহ অধ্যায়