স্ত্রী বলল আমি তোর জন্য হারাম তালাক হবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার ও আমার স্ত্রীর মধ্যে গতকাল রাতে একটি ঝামেলা হয়। একপর্যায়ে আমি রাগের মাথায় আমার স্ত্রীকে থাপ্পড় দিয়ে ফেলি।
আজ সকালে গত রাতের ঘটনাটি নিয়ে কথা বলার সময় আমার স্ত্রী আমাকে বলেছে: “গতকাল রাতে মাইর খাওয়াতে যদি আমার একটু দোষ থাকে, তাহলে আমি তোর জন্য হারাম।”
এখন হুজুরের কাছে আমার প্রশ্ন হলো—আমার স্ত্রী এভাবে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে “আমি তোর জন্য হারাম” বলার কারণে শরিয়তের দৃষ্টিতে আমাদের বিবাহের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি? তালাক, হারাম হওয়া বা অন্য কোনো হুকুম প্রযোজ্য হবে কি?
কথাটি সে রাগের অবস্থায় বলেছে। আমি বিষয়টি নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। দয়া করে শরিয়তের সঠিক মাসআলাটি জানালে উপকৃত হব। ১৮ নাম্বার কলামে কাজী নিজে তালাকের অধিকার দিয়ে দিছে। এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না
Answer
তালাক সংক্রান্ত মাসআলা: স্ত্রীর "আমি তোর জন্য হারাম" বলার হুকুম
উত্তর (সংক্ষেপে):
আপনার স্ত্রী রাগের অবস্থায় "আমি তোর জন্য হারাম" বলেছে—এ কথায় তালাক পতিত হয়নি এবং বিবাহ ভঙ্গ হয়নি। তবে এ ধরনের বাক্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ। স্ত্রীর জন্য স্বামীকে "হারাম" বলা শরিয়তে কোনো তালাক বা ইলার সাব্যস্ত করে না, বরং এটি একটি অসার ও হারাম ঘোষণা, যা ইসলামে কোনো ভিত্তি নেই।
বিস্তারিত মাসআলা
১. "হারাম" শব্দে তালাক পতিত হয় না
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো—তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট তালাকের শব্দ (صريح) অথবা কিনায়া শব্দ (যা তালাকের নিয়তে বলা হয়) প্রয়োজন। "হারাম" শব্দটি তালাকের স্পষ্ট শব্দও নয়, কিনায়া শব্দও নয়। বরং এটি একটি অসার ঘোষণা।
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট আছে: "হারাম" বা "হালাল" শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, কারণ এটি তালাকের শব্দ নয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাবে "তুই আমার জন্য হারাম" বা "আমি তোর জন্য হারাম"—এ ধরনের বাক্য তালাক হিসেবে গণ্য নয়। এটি শুধু একটি মিথ্যা ও গুনাহের বাক্য।
২. ইলার (إيلاء) হিসেবেও গণ্য নয়
কেউ যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস না করার কসম করে, তবে তা ইলার হতে পারে। কিন্তু "হারাম" বলা ইলার নয়, কারণ ইলার হলো আল্লাহর নামে কসম করা। এখানে কসম হয়নি, তাই ইলারও প্রযোজ্য নয়।
৩. স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের অধিকার (তালাক-ই-তাফবিজ)
আপনি উল্লেখ করেছেন—১৮ নম্বর কলামে কাজী নিজে তালাকের অধিকার দিয়েছে। এ বিষয়ে জানা প্রয়োজন:
- তালাক-ই-তাফবিজ (تفويض الطلاق) হলো—স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার প্রদান করা। এটি শরিয়তে বৈধ, যদি তা স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়।
- কিন্তু স্ত্রী "আমি তোর জন্য হারাম" বললেও তা তালাক-ই-তাফবিজের অধীনে তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ:
- তালাক-ই-তাফবিজের অধীনে তালাক পতিত হতে হলে স্ত্রীকে স্পষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন: "আমি নিজেকে তালাক দিলাম" বা "তালাক") বলতে হবে।
- "হারাম" শব্দটি তালাকের শব্দ নয়, তাই তাফবিজের অধিকার থাকলেও এ শব্দে তালাক পতিত হবে না।
- উপরন্তু, তালাক-ই-তাফবিজ সাধারণত শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হয় (যেমন: নির্দিষ্ট কোনো কাজ করলে বা না করলে)। আপনার ক্ষেত্রে শর্ত কী ছিল তা জানা প্রয়োজন। তবে শর্ত পূরণ হলেও "হারাম" শব্দে তালাক পতিত হবে না।
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে: তালাক-ই-তাফবিজের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে তালাকের স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে হবে; কিনায়া বা অস্পষ্ট শব্দে তালাক পতিত হবে না। (ফাতাওয়া উসমানি, কিতাবুত তালাক)
৪. রাগের অবস্থায় বলা
রাগের অবস্থায় বলা হলেও এ কথার কোনো শরয়ি প্রভাব নেই, কারণ এটি তালাকের শব্দই নয়। তবে রাগের বশে এ ধরনের বাক্য বলা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
৫. করণীয়
- তালাক পতিত হয়নি, তাই আপনি ও আপনার স্ত্রী এখনও বৈধ স্বামী-স্ত্রী।
- উভয়ের উচিত তাওবা ও ইস্তিগফার করা, কারণ "হারাম" বলা একটি গুনাহের কাজ।
- ভবিষ্যতে রাগের সময় এ ধরনের বাক্য বলা থেকে বিরত থাকুন।
- স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করুন এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ান।
- যদি তালাক-ই-তাফবিজের শর্ত নিয়ে সন্দেহ থাকে, তবে স্থানীয় মুফতি বা নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত জানুন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | "আমি তোর জন্য হারাম" বলা | তালাক পতিত হয় না | | বিবাহ ভঙ্গ | হয় না | | ইলার | প্রযোজ্য নয় | | তালাক-ই-তাফবিজের অধীনে তালাক | পতিত হয় না (কারণ "হারাম" তালাকের শব্দ নয়) | | করণীয় | তাওবা, ইস্তিগফার, সদাচরণ |
উপরোক্ত মাসআলাটি হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাব—আল-হিদায়া, রাদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া, বাহিশতী জেওর—এর ভিত্তিতে প্রদান করা হয়েছে।