প্রবাসে সন্তানের আকিকা বাংলাদেশে বড় অনুষ্ঠান করে দেওয়া কি জায়েজ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: প্রবাসে সন্তানের আকিকা দেশে বড় আয়োজন করে দেওয়া ও বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একজন ব্যক্তি বিদেশে বসবাস করেন। তিনি নিজের সন্তানের আকিকা দেশে (বাংলাদেশে) বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পশু জবাই করে দিতে চান। এটি কি বৈধ হবে? আকিকার নিয়ম অনুযায়ী গরিব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের খাওয়ানো জরুরি কী? আর প্রবাসে থেকে বাংলাদেশে আকিকা দেওয়ার সুযোগ আছে কি?
উত্তর:
১. আকিকার গুরুত্ব ও বিধান:
আকিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতে মুআক্কাদাহ (প্রায় ওয়াজিবের মতো)। এটি ওয়াজিব নয়, তবে আদায় করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"প্রত্যেক শিশু তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে। সুতরাং তার পক্ষ থেকে সপ্তম দিনে পশু জবাই করো, তার মাথা মুণ্ডন করো এবং তার নাম রাখো।"
(সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ২৮৩৮; তিরমিযী, হাদীস: ১৫২২)
২. আকিকা কোথায় করবেন?
আকিকা মূলত শিশুর অবস্থানস্থলে করাই উত্তম। তবে এটি ভিন্ন জায়গায় করাও জায়েজ আছে। বিশেষত প্রবাসীরা যদি দেশে (বাংলাদেশে) আকিকা করেন, তা সম্পূর্ণ বৈধ। কারণ আকিকার মূল উদ্দেশ্য হলো পশু জবাই করে গোশত বিতরণ করা এবং তা যে কোনো জায়গায় হতে পারে।
হানাফী ফিকহের কিতাবে এসেছে:
"আকিকা ওয়াজিব নয়, বরং সুন্নাত। এটি শিশুর পক্ষ থেকে করা হয়, এবং তা শিশুর অবস্থানস্থলে বা অন্য কোথাও করা জায়েজ।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৮; ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৫৬)
৩. বড় আয়োজন করা ও পশু জবাই:
বড় অনুষ্ঠান করে আকিকা দেওয়া জায়েজ আছে, তবে এতে ইসরাফ (অপব্যয়) না করা শর্ত। আকিকার গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের খাওয়ানো সুন্নাত। তবে কেবল গরিবদের খাওয়ানো জরুরি নয়; বরং নিজে ও ধনী আত্মীয়রাও খেতে পারেন। হাদীসে এসেছে:
"তোমরা আকিকার গোশত নিজে খাও এবং অন্যকে খাওয়াও।"
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৪৭২)
বাংলাদেশের মতো দেশে প্রবাসী থেকে টাকা পাঠিয়ে বড় অনুষ্ঠান করলে তা ইসরাফ না হলে জায়েজ। তবে উত্তম হলো সহজ-সরলভাবে গোশত বিতরণ করা।
৪. আকিকার নিয়ম:
- পশুর সংখ্যা: ছেলের পক্ষ থেকে দুটি ছাগল/ভেড়া (বা একটি গরুর সাত ভাগের দুভাগ), মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল/ভেড়া (বা একটি গরুর এক ভাগ)।
- সময়: সপ্তম দিনে করা উত্তম। সম্ভব না হলে ১৪তম, ২১তম বা অন্য যেকোনো দিন করা যায়।
- গোশত: শিশুর জন্মের পর থেকে যে কোনো সময় আকিকা করা জায়েজ।
৫. গরিব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের অধিকার:
আকিকার গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব: এক ভাগ নিজে খাওয়া, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেওয়া এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনকে দান করা। তবে এই বণ্টন ওয়াজিব নয়; বরং উত্তম পদ্ধতি।
(বাহিশতী জেওর, ৫/২৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৪২)
৬. প্রবাসীদের জন্য বাংলাদেশে আকিকার সুযোগ:
অনেক প্রবাসী বাংলাদেশে টাকা পাঠিয়ে আকিকা করান। এটি সম্পূর্ণ জায়েজ এবং প্রশংসনীয়। তবে শর্ত হলো, জবাইকৃত পশু শরিয়তসম্মতভাবে জবাই করতে হবে এবং গোশতের হকদারদের কাছে পৌঁছাতে হবে। নিজে উপস্থিত না থাকলে প্রতিনিধি (ওয়াকিল) নিয়োগ করা যাবে।
আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা:
- আকিকার পশু দেখতে হলে শিশুর বাবা-মা বা আত্মীয়রা উপস্থিত থাকা জরুরি নয়। কেবল পশু জবাইকারী ও গোশত বণ্টনকারী নিযুক্ত করলেই হবে।
- আকিকার নামাজ বা বিশেষ কোনো আমল নেই। শুধু পশু জবাই ও গোশত বিতরণই মূল কাজ।
- গরিব আত্মীয়দের খাওয়ানো উত্তম, তবে ধনী আত্মীয়দের খাওয়ানোও জায়েজ।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
প্রবাসে সন্তানের আকিকা দেশে বড় অনুষ্ঠান করে দেওয়া শরিয়তসম্মত ও জায়েজ। তবে ইসরাফ না করে বিনয়ের সাথে পালন করা উত্তম। গরিব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের খাওয়ানো সুন্নাত, কিন্তু ওয়াজিব নয়। তাই আকিকা করার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি সহজভাবে নিন।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী আকিকা করার তাওফিক দিন। (আমিন)