স্বামী তালাকের হুমকি দিলে কি তালাক হয়ে যায়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: স্বামী বান্ধবীর সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। স্ত্রী লুকিয়ে কথা বলেছেন, ডিলিট করেছেন, পরে স্বীকার করেছেন। স্বামী বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন, বিদেশ যাওয়ার পর পুরুষদের সাথে সম্পর্কের সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, সংসার না করার ও তালাক দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। একপর্যায়ে স্ত্রীকে লাথি মেরেছেন, মাটিতে ফেলে দিয়েছেন, পরে আবার জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু দিয়েছেন এবং বলেছেন—তোমাকে শয়তান ধরেছিল, সংসার নষ্ট করো না। এরপর শাশুড়ি-শ্বশুরের সামনে বলেছেন—ও ভুল করেছে, আমি ওকে সরি বলছি, ও আমাকে সরি বলেনি; আম্মুকে আসতে মানা করো; ও যদি যায় ডিভোর্স করতে পারে; আমার জীবন শেষ ইত্যাদি। স্ত্রী মায়ের সাথে বাবার বাড়ি চলে এসেছেন। প্রশ্ন: এতে কি তালাক হয়ে গেছে?
উত্তর:
সংক্ষেপে বললে—শুধু হুমকি, রাগ, সন্দেহ, ভয়, অভিমান, লাথি মারা, মাথায় চুমু দেওয়া, শাশুড়ি-শ্বশুরের সামনে অভিযোগ করা বা “তালাক দেবো/তালাক দিব” বলার দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যতক্ষণ না স্বামী স্পষ্ট তালাকের শব্দ বলে বা তালাকের নিয়তে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে। ফকিহগণের মূলনীতি হলো: তালাক হবে ইজহার বা ইশারা বা কিতাবতের মাধ্যমে; শুধু ভবিষ্যতের হুমকি বা রাগের কথায় তালাক পতিত হয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ
“হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দতের দিকে লক্ষ্য রেখে তালাক দেবে।”
(সূরা আত-তালাক: ১)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
“তালাক দুইবার; এরপর হয় সদ্ভাবে রাখা, নয়তো সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া।”
(সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسُهَا، مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ أَوْ تَعْمَلْ بِهِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা কাজে পরিণত করে।”
(সহিহ বুখারি: ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম: ১২৭)
তালাকের ক্ষেত্রে হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- স্পষ্ট তালাকের শব্দ যেমন—“তুমি তালাক”, “তোমাকে তালাক দিলাম”, “তালাক”, “তুমি তালাকপ্রাপ্তা” ইত্যাদি বললে তালাক পতিত হয়।
- কিনায়া শব্দ যেমন—“তুমি যাও”, “তোমার সাথে সম্পর্ক শেষ”, “বাড়ি চলে যাও”, “আমি তোমাকে রাখবো না” ইত্যাদি—এসব দ্বারা তালাক তখনই পতিত হয়, যখন স্বামী তালাকের নিয়ত করে। নিয়ত ছাড়া কিনায়া শব্দে তালাক হয় না।
- শর্তযুক্ত তালাক যেমন—“যদি তুমি অমুক কাজ করো, তবে তুমি তালাক” বললে সেই শর্ত পাওয়া গেলে তালাক পতিত হয়। কিন্তু শুধু “তালাক দেবো”, “তালাক দিব”, “সংসার করবো না” এগুলো ভবিষ্যতের হুমকি; এতে তালাক হয় না।
- রাগ, ঝগড়া, সন্দেহ, ভয়, কান্না, লাথি মারা, চুমু দেওয়া, অভিযোগ করা—এসব তালাকের কারণ নয়।
হানাফি কিতাবে আছে:
وَلَا يَقَعُ الطَّلَاقُ بِالْكِنَايَةِ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ
“কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা অবস্থার দলিল থাকলে।”
(আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক; রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৩২)
ইবনে আবিদিন রহ. বলেন:
الْكِنَايَاتُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ
“কিনায়া শব্দসমূহ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা অবস্থার দলিল থাকলে।”
(রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৩২)
ফাতাওয়া উসমানিতে আছে:
صریح الفاظ کے بغیر یا کنایہ کے ساتھ نیت کے بغیر طلاق واقع نہیں ہوتی
“স্পষ্ট শব্দ ছাড়া বা কিনায়া শব্দের সাথে নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।”
(ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩২০)
তাই আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- স্বামী বলেছেন—“সংসার করবো না তোকে আমি তালাক দেবো”, “তালাক দিব”, “তোর সাথে আমি সংসার করবো না”।
এগুলো ভবিষ্যতের হুমকি। যদি তিনি ঠিক এই শব্দেই বলে থাকেন এবং তালাকের নিয়ত না করেন, তবে তালাক হয়নি। - “তুমি যাইও না, তাহলে অনেক বড় কিছু হয়ে যাবে”—এটাও তালাকের স্পষ্ট ঘোষণা নয়।
- “আমার আর কোন বিশ্বাস নেই”, “তোর উপর ভরসা নেই”, “পুরুষ নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকবে কি ভরসা”—এগুলো সন্দেহ ও অভিযোগ; তালাক নয়।
- লাথি মারা, মাটিতে ফেলা, গাল-কপালে আঘাত—এগুলো নাফসানী জুলুম ও গুনাহ, কিন্তু তালাক নয়।
- পরে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু দেওয়া, “শয়তান ধরেছিল”, “সংসার নষ্ট করো না”—এতে বরং বোঝা যায় তিনি তালাক চাননি।
- শাশুড়ি-শ্বশুরের সামনে “ও যদি যায় ডিভোর্স করতে পারে”, “আমার জীবন শেষ”—এগুলোও তালাকের ইজহার নয়।
তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়: যদি কোনো মুহূর্তে স্বামী স্পষ্টভাবে “তুমি তালাক” বা “তোমাকে তালাক দিলাম” বলে থাকে, অথবা কিনায়া শব্দ বলে তালাকের নিয়ত করে থাকে, তাহলে তালাক পতিত হবে। আপনার বর্ণনায় এমন স্পষ্ট শব্দ বা নিয়তের উল্লেখ নেই। তাই প্রকাশ্যত আপনার তালাক হয়নি।
তবে ফতোয়ার চূড়ান্ত বিধান জানতে হলে স্বামীর মুখ থেকে ঠিক কী শব্দ উচ্চারিত হয়েছে, কোন সময়ে, কোন নিয়তে—এসব যাচাই করা জরুরি। কারণ কিনায়া শব্দে নিয়ত বা অবস্থার দলিল থাকলে তালাক পতিত হতে পারে। আপনি যদি নিশ্চিত না হন, তবে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা দারুল ইফতায় সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত বলুন; তারা উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ফতোয়া দেবেন।
এছাড়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:
-
স্বামীর অনুমতি ছাড়া পরপুরুষ বা বান্ধবীর সাথে লুকিয়ে যোগাযোগ করা উচিত নয়, বিশেষত যখন স্বামী নিষেধ করেছেন। স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব পর্যায়ের। আল্লাহ বলেন:
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ
“পুরুষরা নারীদের উপর দায়িত্বশীল।”
(সূরা আন-নিসা: ৩৪) -
মিথ্যা বলা, লুকানো, ডিলিট করা—এসব সম্পর্কে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। হাদিসে মুনাফিকের আলামতের মধ্যে মিথ্যা বলা অন্যতম। (সহিহ বুখারি: ৩৩)
-
স্ত্রীকে মারা, লাথি মারা, অপমান করা—এসব ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো স্ত্রীকে মারেননি। (সহিহ মুসলিম: ২৩২৮) আল্লাহ বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
(সূরা আন-নিসা: ১৯) -
তালাক দেওয়া বা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ
“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বস্তু হলো তালাক।”
(সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮) -
উভয়ের উচিত শান্তি ও সালিশের পথ অবলম্বন করা। আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا
“যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক তার পরিবার থেকে এবং এক বিচারক তার পরিবার থেকে পাঠাও।”
(সূরা আন-নিসা: ৩৫) -
স্বামী-স্ত্রীর গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি। শাশুড়ি-শ্বশুর বা আত্মীয়দের সামনে একে অন্যের দোষ চর্চা করা সম্পর্ক আরও নষ্ট করে।
-
যদি স্বামী সত্যিই তালাক দিতে চান, তবে শরিয়তের পদ্ধতিতে এক তালাক দিয়ে ইদ্দতের মধ্যে রুজু করার সুযোগ রাখা উচিত। একসাথে তিন তালাক দেওয়া বা মুখে মুখে তালাকের বাজি খেলা মারাত্মক গুনাহ ও অনেক সময় হারামে লিপ্ত হওয়ার কারণ হয়।
উপসংহার: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী তালাক হয়নি বলে মনে হচ্ছে, কারণ কোথাও স্পষ্ট তালাকের শব্দ বা তালাকের নিয়তের প্রমাণ নেই; বরং হুমকি, রাগ, সন্দেহ ও ভবিষ্যতের কথা আছে। তবে নিশ্চিত ফতোয়ার জন্য স্বামীর সাথে বসে স্থানীয় মুফতির কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করুন। উভয়ের উচিত আল্লাহর কাছে তাওবা করা, একে অন্যের প্রতি জুলুম বন্ধ করা, এবং পারিবারিক পরামর্শ ও সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা।