সূরার ফজিলত কি হাদিস সম্মত?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
সূরা মুজাম্মিলের ফজিলত: প্রচলিত বর্ণনাগুলোর হাদিস-সম্মততা যাচাই
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
সূরা মুজাম্মিলের যে ফজিলতগুলো সাধারণত প্রচলিত, সেগুলো কি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত? বিশেষত "যে ব্যক্তি সূরা মুজাম্মিল পড়বে, তার দশটি গুনাহ মাফ হবে" জাতীয় বর্ণনা কতটা নির্ভরযোগ্য?
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আমার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।" — সহিহ বুখারি: ১১০; সহিহ মুসলিম: ৩
কুরআনের কোনো সূরার ফজিলত বর্ণনার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ অনেক যঈফ (দুর্বল) ও মাওযু (জাল) বর্ণনা ফজিলতের নামে প্রচলিত হয়ে গেছে। ইমাম ইবন তাইমিয়া (রহ.) ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন।
সূরা মুজাম্মিল: মৌলিক পরিচিতি
সূরা মুজাম্মিল মক্কি সূরা, ২০ আয়াত। এর প্রথম আয়াত:
"হে চাদরাবৃত ব্যক্তি!" (মুজাম্মিল: ১)
এ সূরায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে রাতের তাহাজ্জুদে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে উম্মতের জন্য নফল হিসেবে বহাল থাকে।
প্রচলিত ফজিলতগুলো ও তাদের হাদিস-মান
১. "যে সূরা মুজাম্মিল পড়বে, তার দশটি গুনাহ মাফ হবে এবং দশটি নেকি লেখা হবে"
মান: যঈফ/মুনকার — সহিহ নয়।
এই বর্ণনাটি বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থে (যেমন তাফসিরে কুরতুবি, তাফসিরে রুহুল মা'আনি) উল্লেখ আছে, তবে এর সনদে আবু শাইখ ও অন্যান্য দুর্বল রাবি রয়েছেন। মুহাদ্দিসগণ এটিকে যঈফ বলেছেন।
ইমাম ইবন কাসির (রহ.) তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে, সূরার ফজিলত সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোর অধিকাংশই যঈফ বা মুনকাতি।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহ.) "ফায়যুল বারী"তে বলেন — ফজিলতের বর্ণনাগুলোতে সনদ যাচাই অপরিহার্য।
২. "যে সূরা মুজাম্মিল পড়বে, আল্লাহ তার জন্য দশটি নেকি লিখবেন এবং দশটি গুনাহ মাফ করবেন"
মান: যঈফ — তিরমিজি ও অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত, তবে সনদে দুর্বলতা রয়েছে।
ইমাম তিরমিজি (রহ.) নিজেই এ বর্ণনার পর বলেছেন: "হাযা হাদিসুন গারিব" (এটি গারিব হাদিস)। অর্থাৎ সনদে একক বা দুর্বল রাবি রয়েছে।
৩. "সূরা মুজাম্মিল পড়লে দুনিয়া ও আখিরাতের ১০০ উপকার হয়"
মান: কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থে এ বর্ণনা নেই — এটি বানোয়াট/মাওযু।
এ ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যা (১০০ উপকার, ৭০ হাজার ফেরেশতা ইত্যাদি) সংবলিত বর্ণনাগুলো মাওযু (জাল) হিসেবে চিহ্নিত। ইমাম ইবনুল জাওযি (রহ.) "আল-মাওযু'আত" গ্রন্থে এ ধরনের বর্ণনাগুলোকে জাল বলেছেন।
৪. "সূরা মুজাম্মিল পড়লে গুনাহ মাফ হয় ও জান্নাতে প্রবেশ সহজ হয়"
মান: সাধারণভাবে যঈফ, নির্দিষ্ট সনদে সহিহ নয়।
সহিহ হাদিসে সূরা মুজাম্মিলের যে বিষয়টি প্রমাণিত
ক. রাতের তাহাজ্জুদের নির্দেশ
সূরা মুজাম্মিলের প্রথম ২০ আয়াত রাতের ইবাদত (তাহাজ্জুদ) সম্পর্কিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং সাহাবিদের উৎসাহ দিতেন।
"রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ) সর্বোত্তম নফল সালাত।" — সহিহ মুসলিম: ১১৬৩
খ. কুরআন তারতিলে পড়ার নির্দেশ
"আর কুরআন পড়ুন তারতিলের সাথে (স্পষ্টভাবে, ধীরে)।" (মুজাম্মিল: ৪)
এটি কুরআন তিলাওয়াতের আদব শিক্ষা দেয় — যা সব সূরার জন্যই প্রযোজ্য।
গ. কুরআনের সাধারণ ফজিলত
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শেখে ও শেখায়।" — সহিহ বুখারি: ৫০২৭
"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পড়বে, সে একটি নেকি পাবে; আর একটি নেকি দশটি নেকির সমান।" — তিরমিজি: ২৯১০ (হাসান সহিহ)
এগুলো সূরা মুজাম্মিলসহ সকল সূরার জন্য প্রযোজ্য সাধারণ ফজিলত।
ফিকহি দৃষ্টিকোণ: ফজিলতের বর্ণনায় হানাফি উলামার নীতি
ইমাম ইবন আবিদিন শামি (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার
"ফজিলতের বিষয়ে যঈফ হাদিস গ্রহণযোগ্য — তবে শর্ত হলো: (১) সনদ অতিশয় দুর্বল না হওয়া, (২) কোনো সহিহ সুস্পষ্ট বিধানের বিরোধী না হওয়া, (৩) আমল করার সময় ফজিলতের বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে না করা।"
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) — ফাতাওয়া উসমানি
"ফজিলতের নামে মাওযু (জাল) বর্ণনা প্রচার করা জায়েজ নয়। যঈফ হাদিস দ্বারা আমল করা যায় কেবল তখনই, যখন তা সহিহ হাদিসের অধীন হয় এবং জাল না হয়।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) — মা'আরিফুল কুরআন
সূরা মুজাম্মিলের তাফসিরে তিনি স্পষ্ট করেছেন — এ সূরার নির্দিষ্ট ফজিলত সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো নির্ভরযোগ্য নয়; বরং সূরার মূল শিক্ষা হলো রাত জাগরণ ও তাহাজ্জুদ।
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) — বেহেশতি জেওর
"কুরআনের সূরার ফজিলত সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো প্রচলিত, তার অনেকগুলোই যঈফ বা জাল। সাধারণ মুসলমানের উচিত নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে ফজিলত জানা।"