কুরআন তিলাওয়াত করা ও শোনা কি সমান সওয়াব?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
কুরআন তিলওয়াত শুনা ও তিলওয়াত করা কি সমান সওয়াব?
Answer
উত্তর (ফতোয়া নং: 5921)
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর
প্রশ্ন: কুরআন তিলাওয়াত করা ও তিলাওয়াত শোনা কি সমান সওয়াব?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, কুরআন তিলাওয়াত করা ও শোনা সমান সওয়াবের নয়। নিজে তিলাওয়াত করার সওয়াব ও ফজিলত শোনার চেয়ে অনেক বেশি। তবে শোনাও একটি ইবাদত এবং সওয়াবের কাজ, বিশেষত যখন মনোযোগসহ শোনা হয়।
বিস্তারিত:
১. কুরআন তিলাওয়াত করার ফজিলত:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لَا أَقُولُ الم حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ»
(তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০; দারিমি, হাদিস: ৩৩৫৫ — হাসান সহিহ)
অর্থ: "যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফ পড়বে, সে একটি নেকি পাবে, আর একটি নেকি দশ গুণ। আমি বলি না যে 'আলিফ-লাম-মিম' একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, মিম একটি হরফ।"
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ»
(সূরা আল-আরাফ: ২০৪)
অর্থ: "যখন কুরআন পড়া হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।"
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে কুরআন পড়তে বলেছিলেন এবং নিজে মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন (বুখারি, হাদিস: ৫০৪৯; মুসলিম, হাদিস: ৮০০)। এটি শোনার গুরুত্ব প্রমাণ করে।
৩. হানাফি ফিকহের দলিল:
-
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, তিলাওয়াত করা নিজে ইবাদত এবং শোনা অপরের ইবাদত। শ্রোতা যদি তিলাওয়াতকারীর নেকির অংশীদার হয়, তবে তা তিলাওয়াতকারীর সওয়াব থেকে কম হবে না, বরং আল্লাহর অনুগ্রহে শ্রোতাও সওয়াব পাবে — তবে তিলাওয়াতকারীর মর্যাদা ও সওয়াব বেশি।
-
ফতোয়া আলমগিরি-তে বলা হয়েছে: "القراءة أفضل من الاستماع" — অর্থাৎ তিলাওয়াত করা শোনার চেয়ে উত্তম।
-
ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী রহ.)-তে উল্লেখ আছে: নিজে পড়ার মধ্যে আমল, ইবাদত, জিকির ও কুরআনের হক আদায়ের দিক বেশি; শোনা একটি সহায়ক ইবাদত। তাই উভয়ের সওয়াব সমান নয়।
-
ফতোয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি দা.বা.)-তে বলা হয়েছে: কুরআন তিলাওয়াত করা ফরজে কিফায়া বা মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল; শোনা অনেক সময় ফরজ বা ওয়াজিব হতে পারে (যেমন নামাজে ইমামের পিছনে)। তবে সাধারণভাবে তিলাওয়াতের সওয়াব বেশি।
৪. নামাজের ক্ষেত্রে:
নামাজে ইমামের পিছনে মুক্তাদির জন্য শোনা ফরজ/ওয়াজিব, নিজে পড়া নিষিদ্ধ (সূরা ফাতিহা ব্যতীত হানাফি মাযহাবে)। সেখানে শোনার গুরুত্ব বেশি। কিন্তু নামাজের বাইরে সাধারণ তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে নিজে পড়া উত্তম।
৫. সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | তিলাওয়াত করা | তিলাওয়াত শোনা | |------|-------------|---------------| | সওয়াব | বেশি (প্রতি হরফে ১০ নেকি) | কম, তবে মনোযোগসহ হলে সওয়াব আছে | | ফজিলত | উত্তম ও অধিক মর্যাদাপূর্ণ | সহায়ক ইবাদত | | কর্তব্য | মুস্তাহাব/ফরজে কিফায়া | কখনো ফরজ (নামাজে) | | হানাফি রায় | أفضل | أقل فضلاً |
উপদেশ: উভয়ই করুন — নিজে তিলাওয়াত করুন এবং অন্যদের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তবে শুধু শোনার উপর নির্ভর না করে নিজে পড়ার অভ্যাস গড়ুন, কারণ কুরআন নিজে পড়াই মূল উদ্দেশ্য এবং সর্বোচ্চ সওয়াবের আমল।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন তিলাওয়াত ও শোনার তাওফিক দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০
- সূরা আল-আরাফ: ২০৪
- বুখারি, হাদিস: ৫০৪৯
- মুসলিম, হাদিস: ৮০০
- আল-হিদায়া (কিতাবুস সালাত)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
- ফতোয়া আলমগিরি
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- ফতোয়া উসমানি (তাকি উসমানি)
والله أعلم بالصواب