নতুন ঘর নির্মাণ করার সময় কি দোয়া পড়তে হয়?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
দ্বিতীয়তঃ উত্তরমুখী দরজা হলে কোন সমস্যা হয়, শরীয়ত কি বলে??
Answer
নতুন ঘর নির্মাণ: পিলারের ঢালা ও ভিটা সীমারেখায় হেফাজত-বরকতের আমল এবং উত্তরমুখী দরজার বিধান
উত্তর (সংক্ষেপে):
নতুন ঘর নির্মাণের সময় পিলারের ঢালায় বা ভিটার সীমানায় বিশেষ কোনো শরীয়ত-নির্ধারিত আমল নেই। তবে ঘর-বাড়িতে বরকত ও হেফাজতের জন্য কুরআন-হাদিসে কিছু সাধারণ আমল বর্ণিত হয়েছে, যেমন—বিসমিল্লাহ বলে কাজ শুরু করা, সূরা আল-বাকারার আয়াতুল কুরসি তিলাওয়াত, ঘরে সূরা বাকারা পড়া, দোয়া করা, সদকা করা ইত্যাদি। আর উত্তরমুখী দরজা শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ বা অপবিত্র কিছু নয়; এটি সম্পূর্ণ জায়েজ। হ্যাঁ, কিছু সমাজে কুসংস্কার হিসেবে উত্তরমুখী দরজাকে অশুভ মনে করা হয়, যা ইসলামে ভিত্তিহীন।
প্রথমতঃ নতুন ঘর নির্মাণে হেফাজত ও বরকতের আমল
১. নির্মাণকাজ শুরু করার আগে
-
বিসমিল্লাহ ও দোয়া পড়া:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,«كُلُّ أَمْرٍ ذِي بَالٍ لَا يُبْدَأُ فِيهِ بِبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ فَهُوَ أَبْتَرُ»
“প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা আল্লাহর নামে শুরু করা হয় না, তা বরকতহীন।”
(আল-মু‘জামুল আওসাত, তাবারানি; মিশকাতুল মাসাবীহ: ৪২৬০) -
ইস্তিখারা ও পরামর্শ:
ঘর নির্মাণের সিদ্ধান্তে ইস্তিখারা করা এবং অভিজ্ঞ মুসলিমদের সাথে পরামর্শ করা সুন্নত। -
সদকা করা:
নির্মাণকাজ শুরুর আগে কিছু সদকা করা বরকতের কারণ। রাসূল ﷺ বলেছেন,«الصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِئُ الْمَاءُ النَّارَ»
“সদকা গুনাহকে নিভিয়ে দেয় যেমন পানি আগুন নিভায়।”
(তিরমিজি: ২৬১৬)
২. পিলারের ঢালা বা ভিটা সীমানায় করণীয়
শরীয়তে পিলারের ঢালায় বা ভিটার সীমানায় বিশেষ কোনো আয়াত-দোয়া লেখা, পুঁতে রাখা বা নির্দিষ্ট আমল করার বিধান নেই। তবে নিম্নলিখিত আমলগুলো করা যেতে পারে:
-
বিসমিল্লাহ বলে কাজ শুরু করা:
প্রতিটি পিলার ঢালার সময়, ইট রাখার সময়, বা ভিটা তৈরি করার সময় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলা। -
আয়াতুল কুরসি ও সূরা ফালাক-নাস তিলাওয়াত:
নির্মাণস্থলে বা ঘরে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়া হেফাজতের কারণ।
রাসূল ﷺ বলেছেন,«مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ فِي دَارِهِ لَمْ يَقْرَبْهُ الشَّيْطَانُ تِلْكَ اللَّيْلَةَ»
“যে ব্যক্তি তার ঘরে আয়াতুল কুরসি পড়বে, সেই রাতে শয়তান তার কাছে আসবে না।”
(সহিহ ইবনে হিব্বান: ৭৮৪) -
সূরা বাকারা পড়া:
রাসূল ﷺ বলেছেন,«لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ»
“তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিও না। নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা বাকারা পড়া হয়।”
(সহিহ মুসলিম: ৭৮০) -
ঘরে নেক সন্তান ও ইবাদতের পরিবেশ:
ঘর নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর ইবাদত, পরিবারের হেফাজত ও নেক সন্তান লালন-পালন। আল্লাহ বলেন,«وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ سَكَنًا»
“আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের ঘরগুলোকে বিশ্রামস্থল বানিয়েছেন।”
(সূরা নাহল: ৮০) -
নির্মাণে হারাম উপার্জন ও সুদ পরিহার:
ঘর নির্মাণে সুদ, ঘুষ, হারাম উপার্জন বা প্রতারণা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা বরকতের মূল শর্ত।
আল্লাহ বলেন,«يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ»
“আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বাড়িয়ে দেন।”
(সূরা বাকারা: ২৭৬) -
নির্মাণকাজে শ্রমিকদের হক আদায়:
শ্রমিকদের পারিশ্রমিক সময়মতো দেওয়া, তাদের সাথে সদাচরণ করা।
রাসূল ﷺ বলেছেন,«أَعْطُوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ»
“শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩)
৩. ঘরে প্রবেশের সময়ের দোয়া
নতুন ঘরে প্রবেশের সময় রাসূল ﷺ-এর শেখানো দোয়া পড়া:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَوْلَجِ وَخَيْرَ الْمَخْرَجِ، بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا»
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উত্তম প্রবেশ ও উত্তম প্রস্থান কামনা করি। আল্লাহর নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহর নামে বের হলাম, এবং আমাদের রব আল্লাহর উপরই ভরসা করলাম।”
(সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯৬)
এরপর পরিবারের সালাম দেওয়া এবং ঘরের লোকদের উপর দোয়া করা।
দ্বিতীয়তঃ উত্তরমুখী দরজার বিধান
১. শরীয়তের দৃষ্টিতে উত্তরমুখী দরজা
উত্তরমুখী দরজা সম্পূর্ণ জায়েজ ও বৈধ। ইসলামে দরজার দিক নির্ধারণে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ—যেকোনো দিকে দরজা রাখা যায়। এটি ইজতিহাদি বা ওয়াক্তিয়াতের বিষয় নয়; বরং স্থাপত্য, আবহাওয়া, বাতাস, সূর্যের আলো ও ব্যবহারিক সুবিধার উপর নির্ভর করে।
২. কুসংস্কার পরিহার
কিছু সমাজে বিশ্বাস করা হয়—উত্তরমুখী দরজা হলে অশুভ হয়, বরকত কমে, বিপদ আসে, জিন-শয়তানের চলাচল বেশি হয় ইত্যাদি। এগুলো সবই কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন। ইসলামে এমন কোনো বিশ্বাস নেই।
রাসূল ﷺ বলেছেন,
«لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ»
“সংক্রামক রোগ, কুলক্ষণ, পেঁচার অশুভ ধারণা এবং সফর মাসের কুলক্ষণ—এসবের কোনো ভিত্তি নেই।”
(সহিহ বুখারি: ৫৭০৭, সহিহ মুসলিম: ২২২০)
অন্য হাদিসে:
«مَنْ رَدَّتْهُ الطِّيَرَةُ فَقَدْ أَشْرَكَ»
“যাকে কুলক্ষণ ফিরিয়ে দিল (অর্থাৎ কুলক্ষণের কারণে কাজ বন্ধ করল), সে শিরক করল।”
(মুসনাদে আহমাদ: ৮৭৯০)
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোতে দরজার দিক নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং ইমাম কাসানি (রহ.) «বাদায়েউস সানায়ে»-তে ঘর-বাড়ির স্থাপত্য সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেননি, কারণ এটি শরীয়তের মূল বিষয় নয়।
তবে হ্যাঁ, নিম্নলিখিত বিষয়গুলো শরীয়তে লক্ষণীয়:
-
কিবলার দিকে মুখ করে টয়লেট রাখা:
হানাফি মাজহাবে কিবলার দিকে মুখ বা পিঠ করে টয়লেটে বসা মাকরুহ তাহরিমি।
(রাদ্দুল মুহতার: ১/৩৪৪) -
প্রতিবেশীর ক্ষতি না করা:
দরজা বা জানালা এমনভাবে রাখা যাতে প্রতিবেশীর গোপনীয়তা নষ্ট না হয়।
আল্লাহ বলেন,«وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ»
(সূরা নিসা: ৫)
এবং রাসূল ﷺ বলেছেন,
«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ»
“ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির শিকার হওয়া যাবে না।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১) -
ঘরে প্রবেশে পর্দার বিধান:
দরজা এমনভাবে রাখা উচিত যাতে বাইরে থেকে ঘরের ভেতরে সরাসরি দৃষ্টি না পড়ে, বিশেষত মহিলাদের পর্দার বিষয়টি লক্ষণীয়।
৪. উপসংহার
- উত্তরমুখী দরজা রাখা জায়েজ।
- এতে কোনো শরীয়তগত সমস্যা নেই।
- কুসংস্কারমূলক বিশ্বাস হারাম বা শিরকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
- ঘরের দরজার দিক নির্ধারণে ব্যবহারিক সুবিধা, আবহাওয়া, বাতাস, সূর্যের আলো ও পর্দার বিধান বিবেচনা করা উচিত।
- বরকত ও হেফাজতের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা, কুরআন তিলাওয়াত, সদকা, হারাম পরিহার ও নেক আমল হলো মূল বিষয়।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | পিলারের ঢালায় বিশেষ আমল | শরীয়তে নির্দিষ্ট কোনো আমল নেই; বিসমিল্লাহ, দোয়া, আয়াতুল কুরসি পড়া যেতে পারে | | ভিটা সীমানায় আয়াত পোঁতা | শরীয়তে ভিত্তিহীন; কুসংস্কার পরিহার করতে হবে | | ঘরে বরকতের আমল | সূরা বাকারা, আয়াতুল কুরসি, সদকা, হারাম পরিহার, ইবাদতের পরিবেশ | | উত্তরমুখী দরজা | জায়েজ, কোনো সমস্যা নেই | | উত্তরমুখী দরজাকে অশুভ মনে করা | কুসংস্কার, নিষিদ্ধ | | দরজার দিক নির্ধারণে বিবেচ্য | আবহাওয়া, বাতাস, সূর্যের আলো, পর্দা, প্রতিবেশীর হক |
মারকাজি ফতোয়া ও রেফারেন্স
- ফতোয়া উসমানি: ৩/৪৯৭ (ঘর-বাড়ি সংক্রান্ত)
- ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/৩৮০
- রাদ্দুল মুহতার: ১/৩৪৪; ৬/৪১৭
- বাদায়েউস সানায়ে: ৫/১৩২
- ফতোয়া আলমগিরি: ৫/৩৫৪
- বাহিশতী জেওর: ঘর-বাড়ি অধ্যায়
- মা‘আরিফুল কুরআন: সূরা নাহল: ৮০-এর তাফসির
- সহিহ বুখারি: ৫৭০৭
- সহিহ মুসলিম: ৭৮০, ২২২০
- সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯৬
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১, ২৪৪৩
- তিরমিজি: ২৬১৬
- মুসনাদে আহমাদ: ৮৭৯০