দোয়া পড়ে পানিতে ফু দেওয়া, পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়ার বিধান কি?

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Question No: 5902
Questioner: Asad sarker
Question Asked: 24 Sep 2026, 01:20 PM
Reviewed & Published: 24 Sep 2026, 02:35 PM
Views: 35
Tokens: 6,006
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. পানিতে সূরা ফাতিহা, দরুদ শরীফ, ইয়া হাইয়ু ইয়া কাইয়ুম, দোয়া ইউনুস পড়ে ফু দিয়ে পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়া যাবে?উপকার পাওয়া যাবে??সেই বোতল যদি যায়গা না থাকায় পায়ের কাছে রাখা হয় তাহলে কি গুনা হবে? সেই বোতলটি যদি পরবর্তীতে হারিয়ে যায় তাহলে আমার পাপ হবে কি?- কেউ যদি বোতলটি ডাস্টবিনে ফেলে, আবার কেউ যদি বোতলটি দিয়ে ফুটবল খেলে?
২. তিন কূল সকাল সন্ধ্যা পড়ে ফু দেয়ার নিয়ম কি?উচ্চারণ ভুল করলে বা অর্থ না জানলে বা মনোযোগ নিয়ে না পড়লে কি সেটার উপকার পাওয়া যাবে?

Answer

প্রশ্নোত্তর: দোয়া পড়ে ফু দেওয়া, তাবিজ-কুইজ, এবং তিন কুলের নিয়ম

বিষয়: সুন্নাহ ও বিদআত | মাযহাব: হানাফি


ভূমিকা

ইসলামে রোগ-শোক, বিপদ-আপদ ও সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কালাম ও মাসনূন দোয়া পড়ে ফু দেওয়া (দম করা) শরীয়তসম্মত। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে দম করিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে দম করতে শিখিয়েছেন। তবে এতে শর্ত হলো—এটি যেন আকীদা-বিশ্বাসে কোনো বিকৃতি না আনে এবং শরীয়তের সীমা অতিক্রম না করে।


১. পানিতে কুরআন-দোয়া পড়ে ফু দেওয়া এবং পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়া

(ক) পানিতে দম করা ও ফু দেওয়ার বিধান

পানি বা যেকোনো তরলে কুরআন, দরুদ, ইসমে আযম (যেমন ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম) ও মাসনূন দোয়া (যেমন দোয়া ইউনুস) পড়ে ফু দেওয়া শরীয়তসম্মত। এটি এক প্রকার রুকইয়াহ বা দম।

দলিল: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের উপর মুআওবিযাত (তিন কুল) পড়ে ফু দিতেন এবং শরীরে হাত বুলাতেন। — সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০১৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২১৯২

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, জিবরীল (আ.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দম করেছিলেন এবং বলেছিলেন:

"বিসমিল্লাহি আরকীকা মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ'যীকা..." (আল্লাহর নামে আমি তোমাকে দম করছি প্রত্যেক সেই বস্তু থেকে যা তোমাকে কষ্ট দেয়...) — সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২১৮৬

ফাতাওয়া: ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ লিখেছেন—

"কুরআন পড়ে ফু দেওয়া, দম করা ও তাবিজ ব্যবহার করা—সবই জায়েয, যদি তা আল্লাহর কালাম বা মাসনূন দোয়া দ্বারা হয়।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন—

"কুরআনের আয়াত বা মাসনূন দোয়া পড়ে পানি বা তেলে দম করা জায়েয। এতে শিফা আল্লাহর হাতেই; মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহার করা সুন্নাহসম্মত।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৮৫

(খ) পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়া ও উপকার পাওয়া

পরীক্ষার হলে বা যেকোনো জায়গায় এই দম করা পানি বা বোতল সাথে নিয়ে যাওয়া জায়েয। এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে মনে রাখতে হবে—

  1. উপকারের বিশ্বাস: উপকার আল্লাহরই পক্ষ থেকে। পানি বা দোয়া নিজে থেকে কিছু করতে পারে না; এগুলো শুধু মাধ্যম (ওয়াসীলা)। বিশ্বাস রাখতে হবে—"আল্লাহ চাইলে এই দোয়ার বরকতে উপকার হবে।"
  2. পরীক্ষায় পাসের জন্য: পরীক্ষায় সফলতা আল্লাহর হাতে। দোয়া ও দমের সাথে সাথে পড়াশোনা, পরিশ্রম ও আল্লাহর উপর ভরসা করা কর্তব্য। শুধু দম করা পানির উপর ভরসা করে পড়াশোনা বাদ দেওয়া ভুল।
  3. উপকার পাওয়া যাবে কি? — ইনশাআল্লাহ, আল্লাহর ইচ্ছায় উপকার হবে। তবে এটি কোনো জাদু বা নিশ্চিত ফলদায়ক যন্ত্র নয়; এটি দোয়া ও তাওয়াক্কুলের বিষয়।

(গ) পায়ের কাছে রাখা কি গুনাহ?

বোতলে কুরআনের আয়াত পড়া হয়েছে—এটি সম্মানিত বস্তু। তাই—

  • সম্ভব হলে: বোতলটি সম্মানজনক স্থানে (ব্যাগে, হাতে, বা উঁচুতে) রাখা উত্তম।
  • জায়গা না থাকলে পায়ের কাছে রাখা: এতে গুনাহ হবে না, কারণ বোতলটি মূলত পানি; আর পানি পায়ের কাছে রাখা নিষিদ্ধ নয়। তবে কুরআনের আয়াত পড়া পানি হওয়ায় যথাসম্ভব সম্মান রক্ষা করা কর্তব্য।
  • তবে: যদি বোতলের গায়ে কুরআনের আয়াত লেখা থাকে, তাহলে তা পায়ের কাছে রাখা বা মাটিতে রাখা থেকে বিরত থাকা উচিত। শুধু পড়ে ফু দেওয়া পানিতে আয়াতের কোনো লেখা থাকে না, তাই পায়ের কাছে রাখায় আপত্তি নেই।

ফাতাওয়া: «ফাতাওয়া আলমগিরি»-তে আছে— "কুরআন লেখা বস্তুকে সম্মান করা ওয়াজিব; তবে যে পানিতে কুরআন পড়ে ফু দেওয়া হয়েছে, তাতে লেখা নেই, তাই তা সাধারণ পানির মতো।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৩

(ঘ) বোতল হারিয়ে গেলে বা কেউ ডাস্টবিনে ফেললে বা ফুটবল খেললে

| অবস্থা | বিধান | |--------|--------| | বোতল হারিয়ে গেলে | আপনার কোনো গুনাহ হবে না। আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী সম্মান রক্ষা করেছেন; হারানো আপনার ইচ্ছাধীন নয়। | | কেউ ডাস্টবিনে ফেললে | যে ফেলেছে সে দায়ী; আপনার কোনো পাপ নেই। তবে আপনি যদি অবহেলায় ফেলতে দেন, তাহলে তাওবা করা উচিত। | | কেউ বোতল দিয়ে ফুটবল খেললে | এটিও আপনার দোষ নয়; বরং যে ব্যক্তি কুরআন পড়া পানির বোতলকে এভাবে অপমান করল, সে গুনাহগার। আপনার নিয়ত ও চেষ্টা সঠিক থাকলে আপনি দায়মুক্ত। |

মূলনীতি: কুরআন পড়া পানির বোতলকে সম্মান করা কর্তব্য, কিন্তু তা হারানো বা অন্যের অপব্যবহারের দায় আপনার উপর বর্তাবে না—যতক্ষণ না আপনি নিজে অবহেলা বা অপমানের উদ্দেশ্যে তা করেন।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন— "আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" — সূরা বাকারা: ২৮৬


২. তিন কুল সকাল-সন্ধ্যা পড়ে ফু দেওয়ার নিয়ম

(ক) নিয়ম ও পদ্ধতি

তিন কুল (সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস) সকাল-সন্ধ্যা পড়ে নিজের উপর ফু দেওয়া সুন্নাহ

দলিল: আয়েশা (রা.) বলেন— "রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার সময় দুই হাত একত্র করে তিন কুল পড়ে ফু দিতেন, তারপর মাথা, মুখমণ্ডল ও শরীরের সামনের অংশে হাত বুলাতেন।" — সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০১৭

পদ্ধতি:

  1. দুই হাত একত্র করে (কাপের মতো) তিন কুল পড়ুন।
  2. হাতে ফু দিন।
  3. মাথা, মুখমণ্ডল ও শরীরের সামনের অংশে হাত বুলান।
  4. এভাবে তিনবার করুন।
  5. সকাল-সন্ধ্যা (ফজরের পর ও মাগরিবের পর) করা উত্তম।

ফাতাওয়া: ইমাম নববী (রহ.) «আল-আযকার»-এ বলেন— "তিন কুল সকাল-সন্ধ্যা তিনবার পড়া এবং ফু দেওয়া সুন্নাহ।" — আল-আযকার, পৃ. ১০৭

(খ) উচ্চারণ ভুল, অর্থ না জানা, মনোযোগ না থাকলে উপকার হবে কি?

এ বিষয়ে কয়েকটি দিক লক্ষণীয়:

১. উচ্চারণ ভুল হলে:

  • যদি ভুলটি অর্থ বিকৃত করে (যেমন "আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন" এর পরিবর্তে এমন কিছু যা অর্থ বদলে দেয়), তাহলে সেটি কুরআন হিসেবে পড়া হবে না এবং সওয়াব কমবে।
  • তবে যদি সাধারণ উচ্চারণগত ত্রুটি হয় (যেমন মাখরাজে সামান্য ভুল), কিন্তু অর্থ বিকৃত না হয়, তাহলে দোয়া হিসেবে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • কর্তব্য: সঠিক উচ্চারণ শেখা। তাজবীদের প্রাথমিক নিয়ম শিখুন।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন— "যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে এবং উচ্চারণে কষ্ট পায়, তার জন্য দ্বিগুণ সওয়াব।" — সহীহ বুখারী, হাদিস: ৪৯৩৭

২. অর্থ না জানলে:

  • অর্থ না জানলেও কুরআন পড়া ও দম করা বৈধ। তবে অর্থ জানা হলে মনোযোগ ও উপকার বেশি হয়।
  • অর্থ জানার জন্য অনুবাদ পড়া ও তাফসীর (যেমন মা'আরিফুল কুরআন) দেখা উত্তম।

৩. মনোযোগ না থাকলে:

  • মনোযোগ ছাড়া পড়লে সওয়াব কম হয়, তবে দম কার্যকর হতে পারে যদি নিয়ত ঠিক থাকে।
  • তবে: দমের মূল হলো দৃঢ় বিশ্বাস ও আল্লাহর উপর ভরসা। মনোযোগ ও উপস্থিত হৃদয় থাকলে উপকার বেশি হয়।

ফাতাওয়া: মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ বলেন— "দোয়া ও দমে মূল বিষয় হলো ইখলাস ও আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল। উচ্চারণ বা ভাষা নয়, বরং হৃদয়ের সংযোগই মূল।" — মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫

উপকার পাওয়া যাবে কি?

  • ইনশাআল্লাহ, উপকার হবে—যদি নিয়ত ঠিক থাকে, আল্লাহর উপর ভরসা থাকে এবং সম্ভবপর সঠিক উচ্চারণের চেষ্টা থাকে।
  • তবে সঠিক উচ্চারণ শেখা ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা কর্তব্য, যাতে দোয়া পূর্ণাঙ্গ হয়।

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | পানিতে দোয়া পড়ে ফু দেওয়া | জায়েয, সুন্নাহসম্মত | | পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়া | জায়েয | | উপকার পাওয়া | ইনশাআল্লাহ, আল্লাহর ইচ্ছায় | | পায়ের কাছে রাখা | গুনাহ নেই (তবে সম্মান রক্ষা উত্তম) | | বোতল হারানো | আপনার পাপ নেই | | কেউ ডাস্টবিনে ফেললে | তার দায়, আপনার নয় | | কেউ ফুটবল খেললে | তার গুনাহ, আপনার নয় | | তিন কুল সকাল-সন্ধ্যা | সুন্নাহ, তিনবার পড়ে ফু দেওয়া | | উচ্চারণ ভুল | সঠিক শেখার চেষ্টা করুন; অর্থ বিকৃত না হলে দোয়া কবুলের সম্ভাবনা | | অর্থ না জানা | বৈধ, তবে জানা উত্তম | | মনোযোগ না থাকা | সওয়াব কম, তবে নিয়ত ঠিক থাকলে উপকার সম্ভব |


উপদেশ

  1. আকীদা: শিফা আল্লাহর হাতেই। দম, পানি, তাবিজ—সবই মাধ্যম।
  2. সুন্নাহ: তিন কুল, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফাতিহা, দোয়া ইউনুস—এগুলো মাসনূন।
  3. সম্মান: কুরআন পড়া পানির বোতলকে যথাসম্ভব সম্মান করুন।
  4. চেষ্টা: দোয়ার সাথে সাথে চিকিৎসা, পড়াশোনা ও পরিশ্রম করুন।
  5. বিদআত বর্জন: নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা, বিশেষ সময় বা বিশেষ পদ্ধতি যা হাদিসে নেই—তা থেকে বিরত থাকুন।

মূল রেফারেন্স:

  • সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি
  • আল-আযকার (ইমাম নববী)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.