সিগারেট, ভেপিং, নিকোটিন, ভাং ও গাঁজা খাওয়ার শরঈ বিধান কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 8109
Questioner: Kahinur Rahman
Question Asked: 07 Nov 2026, 01:45 PM
Reviewed & Published: 07 Nov 2026, 03:03 PM
Views: 77
Tokens: 5,212
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.সিগারেট খাওয়া কি হারাম?
২.একবার সিগারেট খেলে কি ৪০ দিন নামাজ কবুল হবে না?
৩.ভেপিং করা কি হারাম?এটা খেলেও কি ৪০ দিন নামাজ কবুল হবে না?
৪.নিকোটিন কি হারাম?
৫.বং,গাজা খাওয়া কি হারাম?

Answer

মাদক ও ধূমপান সংক্রান্ত পাঁচটি প্রশ্নের শরঈ জবাব

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি পবিত্র ও হালাল বস্তুকে হালাল করেছেন এবং অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তুকে হারাম করেছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর।


ভূমিকা: মাদকের মূল নীতি

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব অপবিত্র, শয়তানের কাজ; সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা মায়িদা: ৯০)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ

"প্রত্যেক নেশাদায়ক বস্তুই 'খামর' (মদ), আর প্রত্যেক খামরই হারাম।" (সহীহ মুসলিম: ২০০৩)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

"নিজের ক্ষতি করো না, অন্যেরও ক্ষতি করো না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)

এই মূলনীতির ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন: প্রত্যেক নেশাদায়ক ও শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বস্তু হারাম। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪৫৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৭৬)


১. সিগারেট খাওয়া কি হারাম?

উত্তর: হানাফি মাজহাবের মুহাক্কিক ফুকাহায়ে কেরামের বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য ফতোয়া হলো—সিগারেট খাওয়া মাকরূহে তাহরীমি, যা থেকে অবশ্যই বিরত থাকা কর্তব্য।

দলিল ও ব্যাখ্যা:

  • সিগারেটে নিকোটিন ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান রয়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত মারাত্মক ক্ষতিকর—ক্যান্সার, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্ষতি ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ — "নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৯৫)
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ — "ক্ষতি করা যাবে না।" (ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
  • সিগারেটে অপচয় হয়, যা কুরআনে নিষিদ্ধ: إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ — "নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৭)

হানাফি ফতোয়ার সারসংক্ষেপ:

  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) ও পরবর্তী ফুকাহা সিগারেটকে "খাবীস" (অপবিত্র-নোংরা) ও ক্ষতিকর বলে মাকরূহে তাহরীমি বলেছেন।
  • হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ ও তাঁর ফতোয়ায় সিগারেটকে মাকরূহে তাহরীমি বলেছেন এবং তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
  • মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) ও মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বর্তমান চিকিৎসা-প্রমাণের ভিত্তিতে সিগারেটকে হারাম বা মাকরূহে তাহরীমি বলেছেন; কারণ এটি নিশ্চিত মারাত্মক ক্ষতি করে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া; ফাতাওয়া উসমানী: ৩/৬০৮-৬১০)

২. একবার সিগারেট খেলে কি ৪০ দিন নামাজ কবুল হবে না?

উত্তর: না, এটি ভিত্তিহীন ও ভুল ধারণা। একবার সিগারেট খেলে ৪০ দিন নামাজ "কবুল হবে না" — এমন কোনো সহীহ দলিল নেই।

বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন:

  • হাদীসে এসেছে: لَا تُقْبَلُ صَلَاةُ مَنْ أَتَى كَاهِنًا... এবং মদের ক্ষেত্রে: مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً — "যে ব্যক্তি মদ পান করল, তার চল্লিশ রাতের নামাজ কবুল হবে না।" (সুনানে তিরমিজি: ১৮৬৬; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৩৭৭ — তবে এগুলো মদ সম্পর্কে, সিগারেট সম্পর্কে নয়)

সারকথা: সিগারেট খাওয়া গুনাহ ও পরিত্যাজ্য, কিন্তু "৪০ দিন নামাজ কবুল হবে না" — এ বিশ্বাস রাখা ঠিক নয়। নামাজ আদায় করতে হবে এবং তাওবা করতে হবে।


৩. ভেপিং করা কি হারাম? এটা খেলেও কি ৪০ দিন নামাজ কবুল হবে না?

উত্তর: ভেপিং (Vaping) সাধারণত হারাম বা মাকরূহে তাহরীমি, যদি তাতে নিকোটিন বা ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে।

কারণ:

  • ভেপিং-এ নিকোটিন ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত। তাই لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ ও وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ-এর আলোকে এটি নিষিদ্ধ।
  • নিকোটিন নেশাদায়ক ও আসক্তিকর হওয়ায় كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ-এর ব্যাপকতায়ও এটি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
  • তবে ভেপিং-এ যদি নিকোটিন না থাকে এবং কোনো ক্ষতিকর উপাদান না থাকে (যেমন শুধু ফ্লেভারযুক্ত বাষ্প), তবে তা "মুবাহ" হতে পারে; কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত অধিকাংশ ভেপেই নিকোটিনযুক্ত ও ক্ষতিকর, তাই হারাম/মাকরূহে তাহরীমি বলাই সতর্কতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ফতোয়া।

"৪০ দিন নামাজ কবুল না" প্রসঙ্গে: উপরের ২ নং উত্তরের মতোই—এটি নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয়। ভেপিং গুনাহ, পরিত্যাজ্য; কিন্তু নামাজ কবুল না হওয়ার ৪০ দিনের হিসাব ভিত্তিহীন।


৪. নিকোটিন কি হারাম?

উত্তর: নিকোটিন নিজে নেশাদায়ক ও আসক্তিকর পদার্থ। হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী:

  • كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ — "প্রত্যেক নেশাদায়ক বস্তু হারাম।" (মুসলিম: ২০০৩)
  • নিকোটিন মস্তিষ্কে নেশার মতো প্রভাব ফেলে, আসক্তি সৃষ্টি করে এবং শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর (হৃদরোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি)।

ফতোয়া: নিকোটিন স্বতন্ত্রভাবে গ্রহণ করা হারাম; কারণ এটি নেশাদায়ক ও ক্ষতিকর। তবে কোনো ওষুধে অতি সামান্য পরিমাণে নিকোটিন চিকিৎসার প্রয়োজনে থাকলে এবং তা নেশা সৃষ্টি না করলে ভিন্ন বিধান হতে পারে—এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ নিতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানী; ইমদাদুল ফাতাওয়া দ্রষ্টব্য)


৫. ভাং ও গাজা খাওয়া কি হারাম?

উত্তর: হ্যাঁ, ভাং ও গাজা (গাঁজা) সম্পূর্ণ হারাম। এতে কোনো দ্বিমত নেই।

দলিল:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ — "প্রত্যেক নেশাদায়ক বস্তুই খামর, আর প্রত্যেক খামরই হারাম।" (মুসলিম: ২০০৩)
  • ভাং ও গাঁজা নেশা সৃষ্টি করে, বুদ্ধি-বিবেক ঢেকে দেয়, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন: فَاجْتَنِبُوهُ — "সুতরাং তা থেকে দূরে থাকো।" (মায়িদা: ৯০)
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন: مَا أَسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيلُهُ حَرَامٌ — "যার অধিক পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।" (আবু দাউদ: ৩৬৮১; তিরমিজি: ১৮৬৫)

হানাফি ফতোয়া: ভাং, গাঁজা, আফিম, হেরোইন, কোকেইন—সবই "মুফতিরাত" (নেশাদায়ক) ও "মুখদ্দিরাত" (মাদক) শ্রেণিভুক্ত, সম্পূর্ণ হারাম। এগুলো বিক্রি, ক্রয়, পরিবহন, উপহার দেওয়া—সবই হারাম। (ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩১৭; রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪৫৫; বেহেশতী জেওর)

উপদেশ: মাদক ও ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন, আন্তরিক তাওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: مَنْ تَرَكَ شَيْئًا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ عَوَّضَهُ اللَّهُ خَيْرًا مِنْهُ — "যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো বস্তু ত্যাগ করবে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম বস্তু দান করবেন।" (মুসনাদে আহমাদ: ২২৫৬৫)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.