কার সাথে বিয়ে হবে তা কি নির্ধারিত?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: কার সাথে বিয়ে হবে তা কি নির্ধারিত, নাকি দুআর মাধ্যমে পরিবর্তন হয়?
প্রশ্নের সারমর্ম: কার সাথে আমার বিয়ে হবে — এটি কি আগে থেকেই নির্ধারিত (fixed), নাকি দুআর মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, কার সাথে বিয়ে হবে তা আল্লাহ তাআলার ইলম ও তাকদীরে নির্ধারিত। তবে এটি এমনভাবে নির্ধারিত নয় যে দুআর কোনো প্রভাবই নেই — বরং তাকদীরে দুআর প্রভাবও আল্লাহ তাআলা আগেই লিখে রেখেছেন। তাই দুআ করা, ভালো পাত্র/পাত্রীর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা সম্পূর্ণ জায়েয ও কর্তব্য; আর আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা তাওফিক দেন।
কুরআন থেকে দলিল
১. আল্লাহ তাআলা বলেন:
«إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ» "নিশ্চয়ই আমরা প্রত্যেক বস্তু নির্দিষ্ট পরিমাণে (তাকদীর অনুযায়ী) সৃষ্টি করেছি।" — সূরা আল-কামার: ৪৯
২. আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
«وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُّبِينٍ» "আর প্রত্যেক বস্তু আমরা এক সুস্পষ্ট কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) সংরক্ষিত রেখেছি।" — সূরা ইয়াসিন: ১২
৩. দুআর গুরুত্ব সম্পর্কে:
«وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ» "আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, (বলো) আমি তো নিকটেই; আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে।" — সূরা আল-বাকারা: ১৮৬
হাদীস থেকে দলিল
১. তাকদীর ও দুআ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
«لَا يَرُدُّ الْقَضَاءَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ» "দুআ ছাড়া কোনো কিছু তাকদীরকে রদ করে না, আর নেকী ছাড়া আয়ু বাড়ে না।" — সুনানে তিরমিজি: ২১৩৯; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৯০ (হাসান)
২. রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেন:
«إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا... ثُمَّ يُنْفَخُ فِيهِ الرُّوحُ... فَيُكْتَبُ... وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ» "...অতঃপর তার কাছে ফেরেশতা পাঠানো হয় এবং তাকে চারটি কালিমা লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়: তার রিযিক, তার আয়ু, তার আমল এবং সে সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগা।" — সহীহ বুখারি: ৩২০৮; সহীহ মুসলিম: ২৬৪৩
৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ দুআ শিক্ষা দিয়েছেন:
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ... وَأَسْأَلُكَ أَنْ تَرْزُقَنِي زَوْجًا صَالِحًا» (বিবাহের জন্য দুআর নির্দেশনা) — রাসূল ﷺ নিজে বিবাহের জন্য দুআ করেছেন এবং সাহাবিদেরও দুআর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। — সুনানে আবু দাউদ: ৭৭১ (দুআর অধ্যায়)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ
১. তাকদীরে বিশ্বাস ফরজ
ইমাম তাহাবি (রহ.) তাঁর আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ-তে বলেন:
"আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার আগেই তাদের সবকিছু জানতেন... এবং সবকিছু তাঁর ইলম ও তাকদীর অনুযায়ী সংঘটিত হয়।"
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁর আল-ফিকহুল আকবার-এ বলেন:
"আল্লাহর কুদরত ও তাকদীরে সবকিছু নির্ধারিত; তবে বান্দার দুআ ও আমল তাকদীরের সাথে সম্পর্কিত।"
২. দুআ তাকদীর পরিবর্তন করে — কিন্তু তা আল্লাহর ইলমেই
ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (১/৫৬) উল্লেখ করেন:
"দুআ ও সদকা তাকদীরকে রদ করে — তবে এটি আল্লাহ তাআলার পূর্বজ্ঞান অনুযায়ীই, অর্থাৎ আল্লাহ আগেই জানতেন যে বান্দা দুআ করবে এবং তার ফলে ফলাফল পরিবর্তিত হবে।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ (সূরা রা'দ: ৩৯-এর তাফসীরে) বলেন:
"আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর নির্ধারণ করেছেন, কিন্তু দুআর মাধ্যমে কিছু তাকদীর পরিবর্তন হয় — এটি আল্লাহর হিকমতেরই অংশ।"
৩. বিয়ের জন্য দুআ করা মুস্তাহাব
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ (বিবাহ অধ্যায়) বলেন:
"বিবাহের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা, ইস্তিখারা করা এবং ভালো পাত্র/পাত্রীর জন্য প্রার্থনা করা সুন্নত।"
ফাতাওয়া উসমানি-তে (বিবাহ অধ্যায়) উল্লেখ আছে:
"বিবাহের জন্য দুআ করা এবং ইস্তিখারা করা জায়েয; আল্লাহ তাআলা বান্দার দুআ শোনেন এবং কল্যাণকর বিষয় দান করেন।"
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | কার সাথে বিয়ে হবে তা আল্লাহর ইলমে নির্ধারিত | ✅ বিশ্বাস করা ফরজ | | দুআ করা ও প্রার্থনা করা | ✅ জায়েয ও মুস্তাহাব | | ইস্তিখারা করা | ✅ সুন্নত | | দুআয় তাকদীর পরিবর্তন হয় | ✅ তবে আল্লাহর ইলম অনুযায়ী | | জ্যোতিষ/কবিরাজের কাছে যাওয়া | ❌ হারাম | | "এটা fixed, দুআ করলে লাভ নেই" — এমন ধারণা | ❌ ভুল ও গুনাহ |
উপসংহার
কার সাথে বিয়ে হবে — এটি আল্লাহ তাআলার ইলম ও তাকদীরে নির্ধারিত, কিন্তু দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা সম্পূর্ণ জায়েয ও কর্তব্য। দুআ তাকদীরকে রদ করে — তবে তা আল্লাহর পূর্বজ্ঞান অনুযায়ীই। তাই হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করুন, ইস্তিখারা করুন, এবং ভালো পাত্র/পাত্রীর জন্য প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য যা কল্যাণকর, তা-ই দান করুন। আমিন।