ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু কাগজে স্বাক্ষর বা সাক্ষীদের সামনে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলে কি বিবাহ হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
একই মজলিসে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ছেলে এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম মেয়ে উপস্থিত হয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করে। কাগজটিতে স্বামীর নামের জায়গায় ছেলেটির নাম এবং স্ত্রীর নামের জায়গায় মেয়েটির নাম ছেলেটি লিখেছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর সামনেই সম্পন্ন হয় এবং সাক্ষীরাও বিষয়টি অবগত ছিলেন যে,ছেলে মেয়ে অবিবাহিত ছিল। কিন্তু পুরো ঘটনার সময় ছেলে বা মেয়ের পক্ষ থেকে মুখে কোনো ধরনের 'ইজাব ও কবুল' (বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ) উচ্চারণ করা হয়নি। তারা কেবল লিখিতভাবে সাক্ষীদের সামনে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে প্রকাশ করেছে ও কাগজে সই করেছে।
উক্ত বিষয়ের আলোকে শরীয়তের নির্দেশনা জানতে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদানে বাধিত করবেন:
১. মুখে কোনো প্রকার ইজাব-কবুল না করে, কেবল সাক্ষীদের সামনে কাগজে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে নিজেদের নাম লিখে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে কি তাদের মধ্যে শরীয়তসম্মত বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে?
২. উপরোক্ত পরিস্থিতিতে যদি তাদের বিবাহ শুদ্ধ না হয়ে থাকে, এবং পরবর্তীতে মেয়েটি যদি অন্য কোনো ছেলেকে বিবাহ করতে চায়, তবে কি তাকে পূর্বের ওই ছেলেটির কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী 'তালাক' নিতে হবে? নাকি তালাক ছাড়াই সে অন্য কোথাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে?
৩.দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিম সাক্ষীদের সামনে কোন অবিবাহিত ছেলে ও মেয়ে নিজেদের স্বামী স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিলেই কি বিবাহ হয়ে যায়?
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সঠিক সমাধান ও ফতোয়া জানিয়ে বাধিত করবেন
Answer
বিবাহের শর্ত ও ইজাব-কবুল সম্পর্কিত ফতোয়া
উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী):
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক চুক্তি। বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য কতিপয় শর্ত অপরিহার্য। এর মধ্যে ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) অন্যতম মৌলিক রুকন। শুধু লিখিতভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা কাগজে স্বাক্ষর করাই বিবাহ নয়।
১ম প্রশ্নের উত্তর:
উক্ত পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়নি।
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলি আবশ্যক:
১. ইজাব ও কবুল — অর্থাৎ একজন পক্ষ থেকে প্রস্তাব এবং অন্যজন থেকে গ্রহণ। এটি মুখে উচ্চারণ করা জরুরি। শুধু লিখিতভাবে বা ইশারায় বিবাহ শুদ্ধ হয় না (তবে বোবা ব্যক্তির ক্ষেত্রে ইশারা গ্রহণযোগ্য)।
২. সাক্ষী — দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী উপস্থিত থাকা।
৩. মজলিস এক হওয়া — ইজাব ও কবুল একই মজলিসে হতে হবে।
৪. বাধা মুক্ত হওয়া — পক্ষদ্বয়ের মধ্যে বিবাহের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (মাহরাম সম্পর্ক) না থাকা।
৫. স্বাধীন সম্মতি — উভয় পক্ষের স্বেচ্ছায় সম্মতি।
দলিল:
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তোমরা নারীদের মধ্যে যারা তোমাদের জন্য হালাল, তাদের সাথে বিবাহ করো।" (সূরা নিসা: ৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি ইজাব ও কবুল ছাড়া বিবাহ করল, তার বিবাহ বাতিল।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১০৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮৫)
ইমাম সারাখসি (রহ.) বলেন:
"বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য ইজাব ও কবুল শর্ত। কারণ বিবাহ একটি চুক্তি, আর চুক্তির মূল ভিত্তি হলো প্রস্তাব ও গ্রহণ।" (আল-মাবসুত, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৯)
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"ইজাব ও কবুল ব্যতীত বিবাহ সংঘটিত হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৮)
সুতরাং: প্রশ্নে উল্লিখিত পদ্ধতিতে — যেখানে মুখে ইজাব-কবুল উচ্চারণ করা হয়নি, শুধু কাগজে স্বাক্ষর করা হয়েছে — বিবাহ সম্পন্ন হয়নি। তারা এখনও পরস্পর অবিবাহিত (নামাহরাম) হিসেবে বিবেচিত হবে।
২য় প্রশ্নের উত্তর:
তালাকের প্রয়োজন নেই।
যেহেতু উপরোক্ত পদ্ধতিতে বিবাহই সম্পন্ন হয়নি, সেহেতু তাদের মধ্যে কোনো বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই:
- মেয়েটির পূর্বের ছেলেটির কাছ থেকে তালাক নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
- মেয়েটি তালাক ছাড়াই অন্য কোনো ছেলের সাথে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে (ইজাব-কবুল ও সাক্ষীসহ) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।
- তবে সতর্কতা: যদি কোনোভাবে তাদের মধ্যে সহবাস হয়ে থাকে, তাহলে ইদ্দত পালন করা আবশ্যক হবে (সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে)। আর যদি সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তাহলে বংশ পরিচয় নির্ধারণে শরীয়তের বিধান প্রযোজ্য হবে।
দলিল:
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"যে বিবাহ শুদ্ধ নয়, তাতে তালাকের প্রশ্নই আসে না। কারণ তালাক কেবল শুদ্ধ বিবাহের উপর আরোপিত হয়।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৩০)
৩য় প্রশ্নের উত্তর:
শুধু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেই বিবাহ হয় না।
কোনো ছেলে ও মেয়ে দুইজন সাক্ষীর সামনে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেই বিবাহ সংঘটিত হয় না। কারণ:
১. ইজাব-কবুল ছাড়া বিবাহ হয় না। পরিচয় দেওয়া বা দাবি করা ইজাব-কবুলের বিকল্প নয়।
২. সাক্ষী থাকা শর্ত, কিন্তু সাক্ষী থাকলেই বিবাহ হয় না; বরং ইজাব-কবুলসহ সাক্ষী থাকা আবশ্যক।
৩. মিথ্যা দাবি করলে তা শরীয়তসম্মত বিবাহ হিসেবে গণ্য হবে না; বরং তা গুনাহ।
দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি ইজাব ও কবুল ছাড়া বিবাহ করল, তার বিবাহ বাতিল।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১০৪)
ইমাম কাসানি (রহ.) বলেন:
"বিবাহের রুকন হলো ইজাব ও কবুল। এছাড়া অন্য কিছু দিয়ে বিবাহ সংঘটিত হয় না।" (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩০)
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. শুধু কাগজে স্বাক্ষরে বিবাহ হয়? | না, হয় না। ইজাব-কবুল মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক। | | ২. তালাক লাগবে? | না, লাগবে না। কারণ বিবাহই হয়নি। | | ৩. সাক্ষীদের সামনে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেই বিবাহ হয়? | না, হয় না। ইজাব-কবুল ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ নয়। |
করণীয়
১. যদি তারা সত্যিই বিবাহ করতে চায়, তাহলে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে নতুন করে বিবাহ করতে হবে — অর্থাৎ:
- ইজাব ও কবুল মুখে উচ্চারণ
- দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতি
- মোহর নির্ধারণ
- উভয় পক্ষের সম্মতি
২. পূর্বের কাগজটি কোনো শরীয়তসম্মত মূল্য রাখে না; তা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে।
والله أعلم بالصواب
ফতোয়া: উক্ত পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়নি। মেয়েটি তালাক ছাড়াই অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে। তবে নতুন করে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে বিবাহ করা আবশ্যক।