মুখে ইজাব-কবুল ছাড়া কেবল কাগজে স্বামী-স্ত্রীর নাম লিখে স্বাক্ষর করলে কি ইসলামে বিবাহ হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5855
Questioner: Ibrahim
Question Asked: 23 Sep 2026, 12:49 PM
Reviewed & Published: 23 Sep 2026, 12:53 PM
Views: 10
Tokens: 8,366
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,

একই মজলিসে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ছেলে এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম মেয়ে উপস্থিত হয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করে। কাগজটিতে স্বামীর নামের জায়গায় ছেলেটির নাম এবং স্ত্রীর নামের জায়গায় মেয়েটির নাম ছেলেটি লিখেছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর সামনেই সম্পন্ন হয় এবং তারা বিষয়টি অবগত ছিলেন যে,ছেলে মেয়ে অবিবাহিত ছিল। কিন্তু পুরো ঘটনার সময় ছেলে বা মেয়ের পক্ষ থেকে মুখে কোনো ধরনের 'ইজাব ও কবুল' (বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ) উচ্চারণ করা হয়নি। তারা কেবল লিখিতভাবে সাক্ষীদের সামনে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে প্রকাশ করেছে ও কাগজে সই করেছে।
উক্ত বিষয়ের আলোকে শরীয়তের নির্দেশনা জানতে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদানে বাধিত করবেন:

১. মুখে কোনো প্রকার ইজাব-কবুল না করে, কেবল সাক্ষীদের সামনে কাগজে স্বামী-স্ত্রীর নাম লিখে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে কি তাদের মধ্যে শরীয়তসম্মত বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে?

২. উপরোক্ত পরিস্থিতিতে যদি তাদের বিবাহ শুদ্ধ না হয়ে থাকে, এবং পরবর্তীতে মেয়েটি যদি অন্য কোনো ছেলেকে বিবাহ করতে চায়, তবে কি তাকে পূর্বের ওই ছেলেটির কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী 'তালাক' নিতে হবে? নাকি তালাক ছাড়াই সে অন্য কোথাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে?

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সঠিক সমাধান ও ফতোয়া জানিয়ে বাধিত করবেন।

Answer

বিবাহ কি হয়ে গেছে? — হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিস্তারিত ফতোয়া

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

ভূমিকা

ইসলামে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও চুক্তি (عقد)। এই চুক্তি শুদ্ধ হওয়ার জন্য শরীয়ত কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছে। প্রশ্নে উল্লিখিত পদ্ধতিতে—যেখানে মুখে ইজাব-কবুল উচ্চারণ করা হয়নি, কেবল কাগজে স্বামী-স্ত্রীর নাম লিখে স্বাক্ষর করা হয়েছে—সে বিষয়ে হানাফি মাযহাবের স্পষ্ট ফতোয়া নিম্নে প্রদান করা হলো।


প্রশ্ন ১: মুখে ইজাব-কবুল ছাড়া কেবল কাগজে লিখে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে কি বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে?

উত্তর: না, এভাবে শরীয়তসম্মত বিবাহ সম্পন্ন হয়নি।

দলিল ও ব্যাখ্যা:

১. কুরআনের দলিল:

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُم بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ أَوْ أَكْنَنتُمْ فِي أَنفُسِكُمْ ۚ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ سَتَذْكُرُونَهُنَّ وَلَٰكِن لَّا تُوَاعِدُوهُنَّ سِرًّا إِلَّا أَن تَقُولُوا قَوْلًا مَّعْرُوفًا

"তোমাদের জন্য দোষ নেই যে, তোমরা বিবাহের প্রস্তাব সম্পর্কে ইঙ্গিত করবে বা মনে গোপন রাখবে। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা তাদের কথা স্মরণ করবে। কিন্তু তাদের সাথে গোপনে কোনো প্রতিশ্রুতি করো না, তবে শরীয়তসম্মত কথা বলো।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৩৫)

এই আয়াতে বিবাহের প্রস্তাব (خطبة) ও বিবাহ চুক্তির (نكاح) মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। কেবল প্রস্তাব বা সম্মতির লিখিত প্রকাশ বিবাহ চুক্তি নয়।

২. হাদিসের দলিল:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ

"ওয়ালি (অভিভাবক) এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।" — (সুনানে তিরমিজি: ১১০১, সুনানে আবু দাউদ: ২০৮৫)

অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا نِكَاحَ إِلَّا بِإِذْنِ الْوَلِيِّ

"অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২০৮৫)

৩. হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বিবাহ চুক্তি (عقد النكاح) সম্পন্ন হওয়ার জন্য ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) অপরিহার্য। এটি একটি চুক্তি (عقد), আর প্রতিটি চুক্তির জন্য ইজাব-কবুল শর্ত।

আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

وَلَا يَنْعَقِدُ النِّكَاحُ إِلَّا بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ

"বিবাহ কেবল ইজাব ও কবুল দ্বারা সম্পন্ন হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৯)

৪. ইজাব-কবুলের প্রকৃতি:

হানাফি মাযহাবে ইজাব-কবুল মুখে উচ্চারণ করা বা লিখিতভাবে হওয়া যায়, তবে শর্ত হলো:

  • মজলিস এক হওয়া (একই বৈঠকে ইজাব ও কবুল হওয়া)
  • ইজাব ও কবুলের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা
  • সাক্ষীদের উপস্থিতিতে হওয়া
  • ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে বোঝা যাওয়া

কিন্তু শুধু কাগজে নাম লিখে স্বাক্ষর করা ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ:

  • এতে কোনো পক্ষ থেকে প্রস্তাব (إيجاب) উচ্চারিত হয়নি
  • কোনো পক্ষ থেকে গ্রহণ (قبول) উচ্চারিত হয়নি
  • কাগজে নাম লেখা কেবল একটি লিখিত ঘোষণা, যা ইজাব-কবুলের স্থলাভিষিক্ত নয়

৫. ফতোয়া ওয়ালা ও অন্যান্য ফতোয়া:

ফতোয়া আলমগিরিতে আছে:

النِّكَاحُ يَنْعَقِدُ بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ، وَلَا يَكْفِي الْكِتَابَةُ وَحْدَهَا

"বিবাহ ইজাব ও কবুল দ্বারা সম্পন্ন হয়; কেবল লেখা যথেষ্ট নয়।" — (ফতোয়া আলমগিরি: ১/২৮৩)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফতোয়া উসমানি»-তে বলেন:

"বিবাহ চুক্তির জন্য ইজাব-কবুল অপরিহার্য। কেবল কাগজে স্বাক্ষর করা বা লিখিতভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা বিবাহ চুক্তি হিসেবে গণ্য হবে না।" — (ফতোয়া উসমানি: ২/২৯১)

৬. ইমদাদুল ফতোয়ায় আছে:

"বিবাহের মূল ভিত্তি হলো ইজাব-কবুল। যদি কোনো পক্ষ মুখে প্রস্তাব না করে এবং অপর পক্ষ গ্রহণ না করে, তবে বিবাহ সম্পন্ন হয় না, যদিও কাগজে লিখিতভাবে স্বাক্ষর করা হয়।" — (ইমদাদুল ফতোয়া: ২/১৭৫)

উপসংহার (প্রশ্ন ১):

প্রশ্নে উল্লিখিত পদ্ধতিতে—যেখানে মুখে ইজাব-কবুল উচ্চারণ করা হয়নি, কেবল কাগজে স্বামী-স্ত্রীর নাম লিখে স্বাক্ষর করা হয়েছে—সে পদ্ধতিতে শরীয়তসম্মত বিবাহ সম্পন্ন হয়নি। তারা এখনও অবিবাহিত হিসেবে গণ্য হবে।


প্রশ্ন ২: যদি বিবাহ শুদ্ধ না হয়ে থাকে, তবে মেয়েটি অন্য ছেলেকে বিবাহ করতে চাইলে কি পূর্বের ছেলেটির কাছ থেকে তালাক নিতে হবে?

উত্তর: না, তালাক নিতে হবে না। কারণ তাদের মধ্যে শরীয়তসম্মত বিবাহই সম্পন্ন হয়নি।

দলিল ও ব্যাখ্যা:

১. তালাকের শর্ত:

তালাক কেবল শুদ্ধ বিবাহের পরেই কার্যকর হয়। যদি বিবাহই না হয়, তবে তালাকের প্রশ্নই আসে না।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ

"হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দাও, তখন তাদের ইদ্দতের হিসাব অনুযায়ী তালাক দাও।" — (সূরা আত-তালাক: ১)

এই আয়াতে তালাকের শর্ত হলো স্ত্রী হওয়া। যদি কেউ স্ত্রীই না হয়, তবে তালাকের কোনো অস্তিত্ব নেই।

২. হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

الطَّلَاقُ لَا يَقَعُ إِلَّا فِي نِكَاحٍ صَحِيحٍ

"তালাক কেবল শুদ্ধ বিবাহে পতিত হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২২৯)

৩. ফতোয়া আলমগিরিতে আছে:

إِذَا لَمْ يَكُنِ النِّكَاحُ صَحِيحًا لَا يَقَعُ الطَّلَاقُ

"যদি বিবাহ শুদ্ধ না হয়, তবে তালাক পতিত হয় না।" — (ফতোয়া আলমগিরি: ১/৩৫৪)

৪. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফতোয়া:

"যদি বিবাহই শুদ্ধ না হয়, তবে তালাকের কোনো প্রয়োজন নেই। মেয়েটি অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে, তবে তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে না, কারণ ইদ্দতও শুদ্ধ বিবাহের পরেই ওয়াজিব হয়।" — (ফতোয়া উসমানি: ২/৩১২)

৫. তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

যদিও শরীয়তসম্মত বিবাহ সম্পন্ন হয়নি, তবে সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকে এই ধরনের কাজ ভুল ছিল। কারণ:

  • এটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে
  • মানুষ মনে করতে পারে তারা বিবাহিত
  • পরবর্তীতে জটিলতা তৈরি হয়

তাই তাওবা করা উচিত এবং ভবিষ্যতে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে বিবাহ করা উচিত।

৬. ইদ্দতের বিষয়:

যেহেতু শুদ্ধ বিবাহ হয়নি, তাই ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব নয়। তবে যদি তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে থাকে, তবে সতর্কতার জন্য ইদ্দত পালন করা উত্তম।

আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

إِذَا وَطِئَ فِي نِكَاحٍ فَاسِدٍ تَجِبُ الْعِدَّةُ

"যদি ফাসিদ (অশুদ্ধ) বিবাহে সহবাস হয়, তবে ইদ্দত ওয়াজিব হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫০৩)

উপসংহার (প্রশ্ন ২):

যেহেতু প্রশ্নে উল্লিখিত পদ্ধতিতে শরীয়তসম্মত বিবাহই সম্পন্ন হয়নি, তাই:

  • তালাক নিতে হবে না
  • ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব নয় (তবে সহবাস হয়ে থাকলে সতর্কতামূলক ইদ্দত উত্তম)
  • মেয়েটি অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে — তবে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে (ওয়ালি, দুইজন সাক্ষী, ইজাব-কবুল সহ)

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. কাগজে লিখে স্বাক্ষর করলে বিবাহ হয়? | না, হয় না। ইজাব-কবুল অপরিহার্য। | | ২. তালাক নিতে হবে? | না, তালাকের প্রয়োজন নেই। কারণ বিবাহই হয়নি। | | ৩. অন্যত্র বিবাহ করা যাবে? | হ্যাঁ, যাবে। তবে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে। | | ৪. ইদ্দত পালন করতে হবে? | না (সহবাস না হলে)। সহবাস হলে সতর্কতামূলক ইদ্দত উত্তম। |


গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

১. তাওবা করুন: এই ভুল পদ্ধতির জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। ২. শরীয়তসম্মত বিবাহ: ভবিষ্যতে ওয়ালি, দুইজন মুসলিম সাক্ষী এবং ইজাব-কবুল সহ বিবাহ সম্পন্ন করুন। ৩. রেজিস্ট্রেশন: শরীয়তসম্মত বিবাহের পর সরকারি রেজিস্ট্রেশন করাও উত্তম, তবে তা বিবাহের শর্ত নয়।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.