বিষয়: গর্ভাবস্থায় তীব্র শারীরিক অসুস্থতা ও সামি ও শশুর বাড়ির মানসিক চাপ
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি আজ প্রায় ৩-৪ বছর ধরে অসুস্থ আর আমার গর্ভাবস্থা সুরুর আগে থেকেই টানা আমি ৯-১০ মাস ধরে টানা অসুস্থ সাথে গর্ভাবস্থায় আমার সিস্ট সহ আরো কিছু অশুখ ধরা পড়েছে। আমার বর্তমানে ধৈর্যে কুলাচ্ছে না আর। প্রতিদিন উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথায় আসছে আমি শেষ।
আমার আপনার কাছে আকুল আবেদন আপনি দয়া করে আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আল্লাহ আমাকে রোগ মুক্তি দেন আমার হায়াত কম হোক বেশী হোক রোগ গুলো থেকে মুক্তি যেন দেন আমাকে। আপনি সহ সাথে আপনার পরিচিত কোন মুস্তাজাবুদ দাওয়া ব্যক্তি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দয়া করে দোয়া করেন আল্লাহর ওয়াস্তে আল্লাহ পাক যেন আমাকে রোগ মুক্তি দেন সুস্থতা দান করেন আমীন, আমার নাম নেক নুরি আয়েশা। আমাকে সহ দুনিয়াতে যত অসুস্থ মানুষ আছে সবাইকে রোগ মুক্তি সুস্থতা দান করেন কাউকে বড়, দীর্ঘস্থায়ী কোন রোগ না দেন আমীন।
হুজুর আমার এই উপকারটা করেন দয়া করে। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন দুনিয়াতে ও আখেরাতে আমীন।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আপনার প্রশ্নটি মূলত তিনটি দিক নিয়ে গঠিত:
- শারীরিক অসুস্থতা ও গর্ভাবস্থায় করণীয় শরয়ী নির্দেশনা
- স্বামীর পরকীয়া ও অবহেলার শরয়ী বিধান ও আপনার অধিকার
- শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন মোকাবিলায় শরয়ী সমাধান ও মানসিক চাপ থেকে উত্তরণের উপায়
নিচে ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি বিষয়ে শরয়ী দিকনির্দেশনা পেশ করছি।
প্রথমত: শারীরিক অসুস্থতা ও গর্ভাবস্থা সম্পর্কে শরয়ী নির্দেশনা
১. চিকিৎসা করানো শরয়ী দায়িত্ব
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً
"তোমরা চিকিৎসা করাও; কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধক (ঔষধ) তিনি সৃষ্টি করেননি।"
— (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৮৫৫; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৩৮)
আপনার জন্য করণীয়:
- একজন অভিজ্ঞ গাইনোকোলজিস্ট ও গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে থাকুন।
- রক্তস্বল্পতার জন্য আয়রন সাপ্লিমেন্ট, ভিটামিন বি১২, ফলিক অ্যাসিড নিয়মিত নিন।
- প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ইন্ট্রাভেনাস থেরাপি নিন।
- পুষ্টিকর তরল খাবার (স্যুপ, দুধ, জুস, খেজুর) অল্প অল্প করে বারবার খান।
২. গর্ভস্থ সন্তানের হক
শরীয়তে গর্ভস্থ সন্তানের জীবন রক্ষা করা মায়ের উপর ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ
"তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না; আমিই তাদের রিযিক দিই এবং তোমাদেরও।"
— (সূরা আল-ইসরা: ৩১)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"গর্ভস্থ সন্তানের হেফাজত করা মায়ের উপর ওয়াজিব; কারণ এটি একটি জীবিত আত্মা।"
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৭৬)
দ্বিতীয়ত: স্বামীর পরকীয়া ও অবহেলা সম্পর্কে শরয়ী বিধান
১. পরকীয়া (যিনা) ইসলামে মহাপাপ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
"তোমরা যিনার নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।"
— (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَٰلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ
"ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী বা মুশরিকা নারীকেই বিয়ে করে; আর ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী বা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে। আর মুমিনদের উপর তা হারাম করা হয়েছে।"
— (সূরা আন-নূর: ৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا زَنَى الرَّجُلُ خَرَجَ مِنْهُ الْإِيمَانُ
"যখন কোনো পুরুষ যিনা করে, তখন তার থেকে ঈমান বের হয়ে যায়।"
— (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬৯০)
২. আপনার শরয়ী অধিকার
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:
"স্বামী যদি স্ত্রীর হক আদায় না করে, খোরপোশ না দেয়, বা অন্য নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখে — তবে স্ত্রী শরীয়তের দরবারে অভিযোগ করার অধিকার রাখে।"
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৭২; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪৮)
আপনার করণীয়:
- প্রথমে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন — তিনি একমাত্র হৃদয় পরিবর্তনকারী।
- পরিবারের সম্মানিত ও প্রভাবশালী সদস্যদের মাধ্যমে স্বামীকে বুঝানোর চেষ্টা করুন।
- প্রয়োজনে শরীয়তের দরবারে (দারুল ইফতা বা ইসলামী আদালত) অভিযোগ করুন।
- খোরপোশের হক না পেলে ইসলামী আদালতে মামলা করার অধিকার আপনার আছে।
৩. স্বামীর অবহেলা ও খোরপোশ না দেওয়া
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।"
— (সূরা আন-নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"তোমাদের উপর তাদের (স্ত্রীদের) খোরপোশ ও পোশাকের হক রয়েছে সদ্ভাবে।"
— (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮)
ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন:
"স্ত্রীর খোরপোশ ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর উপর ওয়াজিব।"
— (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২)
তৃতীয়ত: শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন ও মানসিক চাপ মোকাবিলা
১. মানসিক নির্যাতন ইসলামে নিষিদ্ধ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।"
— (সূরা আল-মায়িদা: ২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
"নিজের ক্ষতি করো না, অন্যেরও ক্ষতি করো না।"
— (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৩৪১)
২. মানসিক চাপ থেকে উত্তরণের শরয়ী উপায়
ক. সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"হে ঈমানদারগণ! সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও; নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন।"
— (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
খ. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও যিকর:
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
"জেনে রাখো, আল্লাহর যিকরেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।"
— (সূরা আর-রাদ: ২৮)
গ. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দুআ:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা, দুঃখ, অক্ষমতা, অলসতা, কৃপণতা, ভীরুতা, ঋণের বোঝা এবং মানুষের প্রভাব থেকে আশ্রয় চাই।"
— (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৮৯৩)
ঘ. আয়াতুল কুরসি ও সূরা ফালাক-নাস নিয়মিত পড়ুন।
ঙ. সূরা ইউসুফ তিলাওয়াত করুন — এটি দুঃখ-কষ্টের সময়ের সূরা।
৩. গোপন রাখা নাকি প্রকাশ করা?
আপনি লিখেছেন: "পরিবারকে জানালে তারা উল্টো চিন্তায় পড়বে বা অশান্তি বাড়বে ভেবে আমি ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছি।"
শরয়ী পরামর্শ:
- সম্পূর্ণ গোপন রাখা ঠিক নয় — এতে আপনার স্বাস্থ্য ও সন্তানের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে।
- বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী একজন ব্যক্তিকে (যেমন: বাবা, ভাই, বা পরিবারের সম্মানিত কেউ) জানান।
- শরীয়তের দরবারে (দারুল ইফতা) পরামর্শ নিন।
- প্রয়োজনে মহিলা সংস্থা বা ইসলামী আইন সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
চতুর্থত: আপনার জন্য বিশেষ দুআ ও আমল
১. শিফার জন্য দুআ
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ
"হে আল্লাহ! মানুষের রব! কষ্ট দূর করুন, শিফা দিন; আপনিই শিফা দানকারী, আপনি ছাড়া কোনো শিফা দানকারী নেই।"
— (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৬৭৫)
২. সন্তান ও নিজের হেফাজতের দুআ
أُعِيذُكَ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
"আমি তোমাকে আল্লাহর পূর্ণ কালিমার মাধ্যমে প্রতিটি শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও কুদৃষ্টি থেকে আশ্রয় দিচ্ছি।"
— (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৩৭১)
৩. নিয়মিত আমল
| আমল | ফজিলত | |------|--------| | সূরা ফাতিহা ৭ বার পড়ে নিজের উপর ফুঁ দেওয়া | শিফার জন্য | | সূরা ইয়াসিন প্রতিদিন সকালে পড়া | হৃদয়ের প্রশান্তি | | ১০০ বার "ইয়া শাফী" পড়া | শিফার জন্য | | ১০০ বার "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" | মানসিক শক্তি | | সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার আয়াতুল কুরসি | হেফাজত | | ৭টি আজওয়া খেজুর সকালে খাওয়া | শিফা ও পুষ্টি |
পঞ্চমত: আপনার করণীয় কর্মপরিকল্পনা
তাৎক্ষণিক করণীয়:
- ডাক্তারের কাছে যান — রক্তস্বল্পতা ও পেটের সমস্যার চিকিৎসা করান।
- পুষ্টিকর খাবার — অল্প অল্প করে বারবার খান।
- বিশ্বস্ত কাউকে জানান — একা বহন করবেন না।
- দারুল ইফতায় যোগাযোগ করুন — শরয়ী পরামর্শের জন্য।
দীর্ঘমেয়াদি করণীয়:
- স্বামীর সাথে সরাসরি কথা বলুন — শান্তভাবে, অভিযোগ নয়, অনুভূতি জানান।
- পরিবারের সম্মানিত সদস্যদের মধ্যস্থতা চান।
- প্রয়োজনে ইসলামী আদালতে খোরপোশ ও নির্যাতনের অভিযোগ করুন।
- মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ষষ্ঠত: আপনার জন্য বিশেষ দোয়া
প্রিয় বোন, আমি আপনার জন্য দোয়া করছি:
اللَّهُمَّ اشْفِ نূরি আয়েশা، وَاحْفَظْ جَنِينَهَا، وَأَذْهِبْ هَمَّهَا وَغَمَّهَا، وَاجْعَلْ لَهَا مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ بَلَاءٍ عَافِيَةً، بِرَحْمَتِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ
"হে আল্লাহ! নূরি আয়েশাকে শিফা দিন, তার গর্ভস্থ সন্তানকে হেফাজত করুন, তার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ দূর করুন, প্রতিটি সংকীর্ণতা থেকে মুক্তির পথ দিন, প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে স্বস্তি দিন, প্রতিটি বিপদ থেকে সুস্থতা দিন — আপনার রহমতের واسيلة, হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!"
আমীন, ছুম্মা আমীন।
সপ্তমত: শেষ পরামর্শ
প্রিয় বোন, আপনি একা নন। আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে আছেন। তিনি বলেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
"যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, (বলো) আমি নিকটেই; আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে।"
— (সূরা আল-বাকারা: ১৮৬)
**আল্লাহ তাআলা আপনার শারীরিক ও মানসিক সব কষ্ট দূর করুন, আপনার গর্ভস্থ সন্তানকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন, আপনার স্বামীকে হেদায়েত দান করুন। আমিন।