স্ত্রীঃ তুমি যদি আর কখনো মাজারে যাও তাহলে ঐদিনই আমার আর তোমার মধ্যে সব শেষ' এই কথা দ্বারা কিছু হবে কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি । আমার স্বামী মানসিকভাবে অসুস্থ, মানসিক অসুস্থতা বলতে পাগল বুঝাইনি, হতাশাগ্রস্থ ব্যাক্তি যে অনেক সময়ের জন্য ঘুমাতে পারে না বা ঠিকমতো কথা বলা বা কিছু মনে রাখতে পারে না । (আমার আন্দাজ বলছে এটা, কারণ ওনার ফ্যামিলি আমার সাথে কিছু শেয়ার করে না) , এখন ডাক্তার দেখানো বাদ দিয়ে মাজারে নিয়ে যেতে চায় । ওনার ফ্যামিলি মাজারে বিশ্বাস করে । আমার স্বামী বলেছিলো সে মাজারে বিশ্বাস করে না। কিন্তু, এই যে এখন নিয়ে যেতে চাচ্ছিল অসুস্থতার জন্য, এর কারণে কি কোনোভাবে আমাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে, যদি আমার স্বামী এক সেকেন্ডের জন্যেও এসব বিশ্বাস করে? আমি আসলে এখন নিজেই কনফিউজড সে আসলে বিশ্বাস করে কি না। (কারণ এতে বিশ্বাস করা তো আমি জানি শির্ক করার সমান, তো শিরক করা কোনো মানুষের সাথে ঈমানদার মুসলমান এর বিবাহ বন্ধন কি অবশিষ্ট থাকে?) আমি ঐসব শুনে রেগে বলে ফেলেছি 'তুমি যদি কখনো মাজারে যাও তাহলে ঐদিনি তোমার আর মধ্যে সব শেষ' এই কথার জন্য কি করবো?
বিঃদ্রঃ মুরুব্বিদের থেকে শুনেছি, কোনো সন্তান পাওয়ার আশায় কেউ যদি ঐ সন্তান ভূমিষ্ঠ হবায পর, মাজারে নিয়ে যাওয়ার মানত করে, তাহলে মাজারে না নিলে নাকি ঐ সন্তান অসুস্থ হয়ে যায় । ওখানে নিয়ে এখন কি করলে এমন আবার ভালো হয় এটা জানতে পারিনাই । আর আমি এসবের ঘোর বিরোধী।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর। আপনি যে দ্বিধা ও মানসিক চাপের মধ্যে আছেন, তা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারছি। আপনি আপনার ঈমান ও বিবাহ উভয়কেই রক্ষা করতে চান, যা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আসুন বিষয়টি কুরআন, সুন্নাহ এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বুঝার চেষ্টা করি।
১. মাজার ও শিরক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা
প্রথমত, আপনাকে জানতে হবে যে, মাজারে যাওয়া বা মাজার জিয়ারত করা নিজেই শিরক নয়। শিরক হয় তখন, যখন কেউ মাজারে গিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে কোনো কিছু চায় (মদদ, রিজিক, সন্তান আরোগ্য) অথবা তাকে আল্লাহর সমান স্থান দেয় বা বিশ্বাস করে যে, মৃত ব্যক্তি স্বাধীনভাবে কারও ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। হানাফি ফিকহে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
-
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন: “যে ব্যক্তি কবরস্থানে গিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে কিছু চায়, সে শিরক করল। কিন্তু যদি সে শুধু দোয়া ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে যায় এবং আল্লাহর কাছে চায়, তবে তা জায়েয।” (শরহু আকীদাতিল তাহাভিয়্যাহ)
-
ইমাম ইবনু আবেদীন (রহঃ) ‘রদ্দুল মুহতার’- গ্রহ্নে লিখেন : “মাজারে গিয়ে শুধু কুরআন তিলাওয়াত করা এবং মৃতের আত্মার জন্য দোয়া করা জায়েয। কিন্তু মৃত ব্যক্তির কাছে সরাসরি কোনোকিছু চাওয়া হারাম ও শিরক।” (রদ্দুল মুহতার, ১/২৪১)
তাই আপনার স্বামী যদি মাজারে যাওয়ার অর্থেই কেবল দোয়া করতে যান বা শুধু জিয়ারত করতে যান, তাহলে তা শিরক নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক রীতি মাত্র। তবে যদি তিনি বিশ্বাস করেন যে, মাজারেই মৃত ব্যক্তি তার রোগ সারিয়ে দেবে (ডাক্তারের পরিবর্তে), তাহলে সেটা কুসংস্কার এবং শিরকের দিকে যেতে পারে।
২. স্বামীর বিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নয়
আপনি নিজেই বলছেন, আপনার স্বামী আগে বলেছিলেন যে, তিনি মাজারে বিশ্বাস করেন না। এখন পরিবারের চাপে তিনি যেতে চাচ্ছেন। ইসলামে কারো বিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে তাকে মুশরিক বলা বা বিবাহ ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হারাম। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন: “কোনো মুসলমানকে কাফির বলতে গেলে সুনিশ্চিত প্রমাণ লাগে। সন্দেহের ভিত্তিতে তা বলা জায়েয নয়।” (ফতোয়া হিন্দিয়া, ২/২৬০)
যদি তিনি সত্যিই শিরকে লিপ্ত হন, তাহলে বিবাহের বিধান কী?
- হানাফি ফিকহে, স্ত্রী-স্বামীর মধ্যে যেকোনো একজনের প্রকাশ্য শিরক করলে বিবাহ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু তার জন্য তিনবার তালাকের প্রক্রিয়া (ছয়মাসের মধ্যে তিন তালাক) জরুরি নয়, বরং ফাসখ (বিচ্ছেদ) করার বিধান আছে। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২৬০)
তবে বাস্তবে আপনি এখনই এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, কারণ:
- তার বিশ্বাস সম্পর্কে আপনি ১০০% নিশ্চিত নন।
- তিনি যদি কেবল জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যান এবং তার অন্তর আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখে, তাহলে তা শিরক নয়।
৩. আপনার কথার ব্যাখ্যা: 'তুমি যদি কখনো মাজারে যাও তাহলে ঐদিনই তোমার আর আমার মধ্যে সব শেষ'
স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারে না।কেননা তালাকের অধিকার স্বামীর। যদি স্ত্রী তালাকের অধিকার প্রাপ্ত হয়, তাহলেও আপনি কথাটি রাগের মাথায় বলেছেন, কিন্তু এটি তালাকের নিয়তে বলা হয়নি (যেমন: “তুমি যদি মাজারে যাও তাহলে তুমি আমার জন্য তালাক”)। শরিয়তে তালাকের জন্য স্পষ্ট শব্দ এবং নিয়ত আবশ্যক। আপনি যদি শুধু “সব শেষ” বলেন (যার অর্থ আলোচনা বা সম্পর্কের অবসান, তালাক নয়), তাহলে এটি তালাক গণ্য হবে না।
ইমাম কাসানী (রহঃ) বলেন: “স্পষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন: তালাক, তুমি তালাক) অথবা কিনায়া শব্দের সাথে তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হয় না।” (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/৯৫)
তবে সতর্কতার জন্য: যদি ভবিষ্যতে এমন শব্দ বলেন, তাহলে তালাকের নিয়ত না করে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া ভালো। বর্তমানে আপনার কোনো তালাক পতিত হয়নি, ইনশাআল্লাহ।
৪. সন্তান নিয়ে মুরুব্বিদের কথা
আপনি যা শুনেছেন: “সন্তান মাজারে নেওয়ার মানত করলে তা পূরণ না করলে সন্তান অসুস্থ হয়”—এটি ভিত্তিহীন কুসংস্কার ও বিদআত। ইসলামে মানত শুধু আল্লাহর জন্যই করা যায় এবং তা যদি গুনাহের কাজ হয় (যেমন মাজারে সিজদা বা মৃতের কাছে কিছু চাওয়া), তাহলে সেই মানত পূরণ করা জায়েয নয় বরং কাফফারা দিতে হবে (যেমন: ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো অথবা ৩ দিন রোজা)।
আপনার করণীয়:
- সন্তানকে কোনো অবস্থাতেই মাজারে নেবেন না।
- এ বিষয়ে পরিবারকে বুঝান যে, অসুস্থতার জন্য ডাক্তার ও আল্লাহর ওপর ভরসা করাই একমাত্র পথ।
- তাদের বলুন: “মানত যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য হয়, তাহলে তা শিরক এবং তা পূরণ ও কর্তব্য নয়।”
৫. আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
প্রথমত: স্বামীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন
- তাকে জিজ্ঞাসা করুন: “মাজারে গিয়ে তুমি কী করতে চাও? কাকে ডাকতে চাও? তুমি কি বিশ্বাস কর যে ওখান থেকে কোনো মদদ পাওয়া যাবে?”
- যদি তিনি বলেন: “আমি শুধু দোয়া ও জিয়ারত করতে যাচ্ছি”, তাহলে তাকে বলুন: “ইসলামে মৃতের জন্য দোয়া বা কুরআন পড়া জায়েয, কিন্তু মৃতের কাছে কিছু চাওয়া শিরক। তুমি যদি শুধু দোয়া করো, তাহলে আমি আপত্তি করব না। কিন্তু যদি তুমি মাজারের মৃত ব্যক্তিকে ডাকো বা তার কাছ থেকে মাদ্দ চাও, তাহলে তা আমার মানতে বাধা।”
দ্বিতীয়ত: পরিবারকে সঠিক পথ দেখান
- তাদের বুঝানোর জন্য কোনো আলেম বা ইসলামী শিক্ষক ডেকে আনুন।
- মাজারে যাওয়া বাদ দিয়ে তাকে ডাক্তারের কাছে নিন। মানসিক অসুস্থতার জন্য মাজার কোনো চিকিৎসা নয়; বরং একে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।
তৃতীয়ত: নিজের জন্য দোয়া ও ধৈর্য্য ধরুন
- আপনার স্বামীর ইমানের ব্যাপারে সন্দেহ না করে তাকে নসীহত করুন।
- ঘন ঘন তালাক বা বিচ্ছেদের চিন্তা না করে তাকে দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন।
৬. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
- আপনার স্বামীর মাজারে যাওয়া যদি শুধু জিয়ারত বা দোয়ার জন্য হয়, তাহলে তা শিরক নয় এবং বিবাহ ভঙ্গ হবে না।
- তিনি যদি শিরকে লিপ্ত হন (মৃতের কাছে কিছু চাওয়া), তবে তা প্রকাশ্য শিরক, যার ফলে বিবাহ বাতিল হবে। কিন্তু বর্তমানে এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে আপনি বিষয়টি নিশ্চিত নন।
- আপনার দেওয়া ‘তুমি মাজারে গেলে সব শেষ’ কথাটি তালাক নয়, যদি না আপনি তালাকের নিয়ত করে থাকেন।
- সন্তান মাজারে না নিলে অসুস্থ হবে—এটি কুসংস্কার; তা বিশ্বাস করা জায়েয নয়।
আল্লাহ আপনার ধৈর্য্য ও দ্বীনের প্রতি অনুরাগে বরকত দিন। আপনি যদি আরও বিস্তারিত জানতে চান, আপনার নিকটবর্তী কোনো আলেমের শরণাপন্ন হন। আমি আপনার জন্য দোয়া করি।
উত্তরটি আপনার জন্য সুস্পষ্ট হয়েছে কি? আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে জানাবেন ইনশাআল্লাহ।
জাজাকাল্লাহু খাইরান