দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করে প্রথম স্ত্রী কে নিয়ে ওমরা করতে যাওয়া । ব্যাপারটা কি রকম ? ইব

Family Life · Hanafi

Question No: 5428
Questioner: Aysha Humaira 0337
Question Asked: 14 Sep 2026, 12:16 AM
Reviewed & Published: 14 Sep 2026, 02:27 AM
Views: 23
Tokens: 5,024
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করে প্রথম স্ত্রী কে নিয়ে ওমরা করতে যাওয়া । ব্যাপারটা কি রকম ?
ইবাদত করব এই বাহানায় দশ দিন স্ত্রীকে ফোন না দেওয়া , এসব নিয়ে কথা বলতে গেলেই তালাকের ভয় দেখানো ।
এসব ব্যাপারে ইসলাম কি বলে

Answer

দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করা এবং তালাকের ভয় দেখানোর বিধান

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরাহ করতে যাওয়া নিজে থেকে হারাম নয় — শর্ত হলো দুই স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ ও সমান অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রীর হক (খোরপোশ, রাতযাপন, সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের অধিকার) নষ্ট করে, তাকে না জানিয়ে বা তার সম্মতি ছাড়া প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে দীর্ঘ সফরে যাওয়া জুলুম ও গুনাহের কাজ। আর ইবাদতের বাহানা দেখিয়ে দশ দিন স্ত্রীকে ফোন না দেওয়া এবং কথা বলতে গেলেই তালাকের ভয় দেখানো — এগুলো ইসলামবিরোধী, নিষ্ঠুর ও হারাম। তালাকের ভয় দেখানো নিজেই একটি জুলুম; আর ভয় দেখানোর কারণে তালাক পতিত হয় না, তবে গুনাহ অবশ্যই হয়।


১. একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমান অধিকারের বিধান

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ

“তোমরা কখনোই স্ত্রীদের মধ্যে (সর্বতোভাবে) ইনসাফ করতে পারবে না, যদিও তোমরা তা কামনা করো। অতএব তোমরা (একজনের দিকে) সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ো না যে, অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় ছেড়ে দেবে।” — সূরা আন-নিসা: ১২৯

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا دُونَ الْأُخْرَى جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَقِيًّا

“যার দু’জন স্ত্রী আছে, আর সে একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, সে কিয়ামতের দিন একপাশ বাঁকা (বিকৃত) অবস্থায় আসবে।” — সুনানে আবু দাউদ: ২১৩৩; সুনানে তিরমিজি: ১১৪১; মুসনাদে আহমাদ

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) 《রাদ্দুল মুহতার》-এ লিখেন:
“স্ত্রীদের মধ্যে রাতযাপন, খোরপোশ ও বাসস্থানে সমান অধিকার দেওয়া ওয়াজিব। কোনো ওজর ছাড়া একজনের কাছে বেশি সময় থাকা জুলুম।”
রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, কিতাবুন নিকাহ, ‘আল-কিসমাতু বাইনাল আয-ওয়াজ’ অধ্যায়

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
“স্বামীর উপর ওয়াজিব হলো স্ত্রীদের মধ্যে ইনসাফ করা — খোরপোশ, বাসস্থান ও রাতযাপনে।”
ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, কিতাবুন নিকাহ


২. দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরাহ করা

ক. ওমরাহ নিজে জায়েয, কিন্তু শর্তসাপেক্ষ

প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরাহ করা বা সফরে যাওয়া নিজে থেকে নাজায়েয নয়। তবে শর্ত:

  1. দ্বিতীয় স্ত্রীর অনুমতি বা সন্তুষ্টি নেওয়া।
  2. দ্বিতীয় স্ত্রীর খোরপোশ, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
  3. তার রাতযাপনের অধিকার (যদি পালা নির্ধারিত থাকে) নষ্ট না করা — অর্থাৎ তার পালার সময়টুকু অন্যত্র না কাটানো।
  4. সফরের সময়টুকু দ্বিতীয় স্ত্রীর পালার সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া

খ. হক নষ্ট করে যাওয়া = জুলুম ও গুনাহ

যদি দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করে, তাকে না জানিয়ে বা তার সম্মতি ছাড়া, তার খোরপোশ-যোগাযোগ বন্ধ করে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে দীর্ঘ সফরে যাওয়া হয় — তবে তা:

  • হারাম ও জুলুম
  • কিয়ামতের দিন এর হিসাব দিতে হবে।
  • ইবাদতের সওয়াব হলেও জুলুমের গুনাহ আলাদা — একটির দ্বারা অন্যটি মুছে যায় না।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) 《ফাতাওয়া উসমানি》-তে বলেন:
“স্ত্রীদের মধ্যে সমান অধিকার ওয়াজিব। কোনো স্ত্রীর হক নষ্ট করে অন্যজনের সাথে সফরে যাওয়া জায়েয নয়, যদিও সফরটি ইবাদতের হয়।”
ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুন নিকাহ

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) 《ইমদাদুল ফাতাওয়া》-তে লিখেন:
“ইবাদতের উদ্দেশ্যে সফর করলে অন্য স্ত্রীর হক নষ্ট করা জায়েয হবে না। হক নষ্ট করা জুলুম, আর জুলুম ইবাদতের সওয়াব নষ্ট করে।”
ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩


৩. ইবাদতের বাহানা দেখিয়ে দশ দিন স্ত্রীকে ফোন না দেওয়া

ক. স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ স্বামীর দায়িত্ব

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ বলেন:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।” — সূরা আন-নিসা: ১৯

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।” — সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫

খ. ইবাদতের নামে স্ত্রীকে অবহেলা করা

  • ইবাদতের বাহানা দেখিয়ে দশ দিন ফোন না দেওয়া, যোগাযোগ বন্ধ রাখা — এটি ইসলামের শিক্ষা নয়
  • ইসলামে ইবাদত ও পারিবারিক দায়িত্ব পরস্পরবিরোধী নয়; বরং পরিবারের হক আদায় করাও ইবাদত।
  • স্ত্রীকে মানসিক নির্যাতন করা, তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা — এটি জুলুম
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো ইবাদতের অজুহাতে পরিবারের হক নষ্ট করেননি; বরং তিনি বলেছেন: “তোমার পরিবারের উপরও তোমার হক আছে।” (সহিহ বুখারি: ১৯৬৮)

আশরাফ আলী থানভি (রহ.) 《বেহেশতি জেওর》-এ লিখেন:
“স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা ও তার হক আদায় করা স্বামীর অবশ্য কর্তব্য। ইবাদতের নামে তার হক নষ্ট করা জায়েয নয়।”
বেহেশতি জেওর, নিকাহ অধ্যায়


৪. কথা বলতে গেলেই তালাকের ভয় দেখানো

ক. তালাকের ভয় দেখানো নিজেই জুলুম

  • তালাক দেওয়া স্বামীর অধিকার, কিন্তু ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, মানসিক চাপ সৃষ্টি করা — এটি হারাম
  • স্ত্রীকে তালাকের ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা, তার অধিকার দাবি করতে বাধা দেওয়া — জুলুম ও গুনাহ
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

“ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতির বদলে ক্ষতিও করা যাবে না।” — সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ

খ. ভয় দেখালে তালাক পতিত হয় কি?

না। শুধু মুখে “তালাক দিয়ে দেব” বলা বা ভয় দেখানোতে তালাক পতিত হয় না। তালাক পতিত হয় নির্দিষ্ট শব্দ উচ্চারণ করলে বা লিখিতভাবে তালাকের সিদ্ধান্ত জানালে।
রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১

তবে ভয় দেখানোর গুনাহ থেকে যাবে এবং তা আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়।

গ. স্ত্রীর অধিকার দাবি করা বৈধ

স্ত্রীর খোরপোশ, বাসস্থান, সাক্ষাৎ ও সদাচরণ দাবি করা তার শরিয়তসিদ্ধ অধিকার। স্বামী তা না দিলে সে শরিয়তের আশ্রয় নিতে পারে — এমনকি প্রয়োজনে খুলা (বিচ্ছেদ) চাইতে পারে।
রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২


৫. করণীয়

  1. দ্বিতীয় স্ত্রীর হক আদায় করুন — খোরপোশ, বাসস্থান, রাতযাপন ও যোগাযোগে সমান অধিকার।
  2. সফরে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় স্ত্রীর সম্মতি নিন এবং তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করুন।
  3. ইবাদতের নামে পরিবারের হক নষ্ট করবেন না — ফোন, যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ বজায় রাখুন।
  4. তালাকের ভয় দেখানো বন্ধ করুন — এটি জুলুম; বরং সদাচরণ ও সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করুন।
  5. প্রয়োজনে অভিজ্ঞ মুফতি বা ইসলামি সালিশ কেন্দ্রের শরণাপন্ন হোন — বিশেষত যদি দুই স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ রক্ষা করা কঠিন হয়।
  6. তাওবা করুন — যদি ইতিমধ্যে জুলুম হয়ে থাকে, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং স্ত্রীর হক ফিরিয়ে দিন।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |---|---| | প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরাহ করা | নিজে থেকে জায়েয, তবে দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করা হারাম | | দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করা | জুলুম ও গুনাহ | | ইবাদতের বাহানা দেখিয়ে ফোন না দেওয়া | ইসলামবিরোধী, জুলুম | | তালাকের ভয় দেখানো | হারাম, জুলুম; তবে তালাক পতিত হয় না | | স্ত্রীর অধিকার দাবি করা | শরিয়তসিদ্ধ অধিকার |

মূল কথা: ইবাদত ও পারিবারিক দায়িত্ব — দুটোই পালন করতে হবে। একটির অজুহাতে অন্যটি নষ্ট করা ইসলামে কখনো বৈধ নয়। স্ত্রীর হক নষ্ট করা জুলুম, আর জুলুমের হিসাব কিয়ামতের দিন অবশ্যই দিতে হবে।


আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইনসাফের সাথে জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন এবং জুলুম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.