দ্বিতীয় স্ত্রীর হক ও সময় সংক্রান্ত শরয়ী বিধান: স্বামী সময় না দিলে বা "তালাক দিয়ে দাও" বললে কী হয়?

Family Life · Hanafi

Question No: 5415
Questioner: Aysha Humaira 0337
Question Asked: 13 Sep 2026, 08:43 PM
Reviewed & Published: 13 Sep 2026, 08:51 PM
Views: 14
Tokens: 6,804
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম আলাইকুম।
দ্বিতীয় স্ত্রী স্বামীর কাছে সময়ে বা হক চাইলে আমি দিতে পারবো না তুমি তালাক দিয়ে দাও বা চলে যাও এ সমস্ত কথা বলা শরীয়তে কতটুকু জায়েজ ?

২ দ্বিতীয় স্ত্রীর সময় নিয়ে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করতে যাওয়া হয় দ্বিতীয় স্ত্রীকে না জানিয়ে, দ্বিতীয় স্ত্রী সেটা জানার পর যদি তাকে বলা হয় তালাক দিয়ে দাও থাকতে না পারলে চলে যাও । এসব শরীয়ত এলাও করে ? এবং এর পক্ষে দলিল দেওয়া হয় যে আমি আল্লাহকে ভয় করি আমি হক দিতে পারব না চলে যাও থাকতে না পারলে ।

উল্লেখ্য স্বামী প্রথম স্ত্রীর সাথে থাকেন এবং পাঁচ মাস পর এক সপ্তাহ দ্বিতীয় স্ত্রীকে দেন , এবং এ ব্যাপারে দ্বিতীয় স্ত্রীর অভিযোগ নেই, কিন্তু সেই ৭ দিন নিয়েই যদি ওমরা করতে যাওয়া হয় প্রথম স্ত্রী কে নিয়ে। এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কি ? এ ব্যাপারে দ্বিতীয় স্ত্রী অভিযোগ করতে পারে কি ?

Answer

দ্বিতীয় স্ত্রীর হক ও সময় সংক্রান্ত মাসআলার শরয়ী বিধান

উত্তর (সংক্ষেপে):

প্রশ্নে বর্ণিত উভয় প্রকার কথা—অর্থাৎ দ্বিতীয় স্ত্রী সময় বা হক চাইলে তাকে "দিতে পারব না, তালাক দিয়ে দাও বা চলে যাও" বলা, এবং দ্বিতীয় স্ত্রীকে না জানিয়ে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করতে যাওয়া—শরীয়তের দৃষ্টিতে জুলুম ও গুনাহের কাজ। তবে এতে তালাক স্বতঃস্ফূর্তভাবে পতিত হয় না; তালাক পতিত হয় কেবল সুস্পষ্ট তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলে। আর দ্বিতীয় স্ত্রীর অবশ্যই অভিযোগ করার ও নিজের হক দাবি করার শরয়ী অধিকার রয়েছে।


১. একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা (আদল) রক্ষা করা ফরজ

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً "তোমরা বিবাহ করো দুই, তিন বা চারটি নারী; কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, ইনসাফ করতে পারবে না, তবে একজনকেই।" (সূরা নিসা: ৩)

وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ "তোমরা কখনোই স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ সমতা রক্ষা করতে পারবে না, যদিও তোমরা তা কামনা করো; অতএব তোমরা একদিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না যে, অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় ছেড়ে দেবে।" (সূরা নিসা: ১২৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا دُونَ الْأُخْرَى جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَقِيًّا "যার দু'জন স্ত্রী আছে, আর সে একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, সে কিয়ামতের দিন একদিকে ঝুঁকে পড়া অবস্থায় (বিকৃত ও অপমানিত হয়ে) আসবে।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৩৩, সুনানে তিরমিজি: ১১৪১)

ফিকহি ব্যাখ্যা: হানাফি মাযহাবে একাধিক স্ত্রী থাকলে রাত যাপন, দিনের খরচ, বাসস্থান ও দেখা-সাক্ষাতে সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব। তবে ভালোবাসা ও মনের টানে সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব নয়, কারণ তা মানুষের আয়ত্তে নেই। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২০৩; আল-হিদায়া: ২/৩৫০; ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৩৪৫)


২. "তালাক দিয়ে দাও বা চলে যাও" বলা—শরয়ী হুকুম

ক) যদি স্ত্রীকে সময়/হক দিতে অপারগ হয়

স্বামী যদি সত্যিই দ্বিতীয় স্ত্রীর হক আদায় করতে অক্ষম হয়, তবে তার কর্তব্য:

  1. নিজের অপারগতা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা;
  2. স্ত্রীকে জোর করে তালাক দিতে বাধ্য না করা—এটি শরীয়তে নাজায়েজ ও জুলুম;
  3. যদি বিচ্ছেদ ছাড়া সংসার চালানো সম্ভব না হয়, তবে ভালোভাবে ও ইহসানসহ তালাক দেওয়া (সূরা বাকারা: ২২৯-এর নির্দেশনা অনুযায়ী)।

فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ "তোমরা হয় সদ্ভাবে স্ত্রীকে রেখে দাও, নয়তো সৌজন্যের সাথে ছেড়ে দাও।" (সূরা বাকারা: ২২৯)

খ) "তুমি তালাক দিয়ে দাও" বলা

এটি শরীয়তে নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ। কারণ:

  • তালাক দেওয়া স্বামীর হাতে; স্ত্রীকে বাধ্য করা বা অপমান করা জুলুম।
  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করা বা কষ্ট দেওয়া হারাম। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৩০)
  • হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে কষ্ট দেয়, সে জালিম।" (সুনানে তিরমিজি: ১৯৪০)

গ) "চলে যাও" বলা

★"চলে যাও" শব্দটি তালাকের নিয়তে বললে এক তালাকে বায়েন পতিত হবে।


৩. দ্বিতীয় স্ত্রীকে না জানিয়ে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করা

ক) শরয়ী বিধান

  • ওমরা করা নিজে একটি ইবাদত, তবে স্ত্রীর হক নষ্ট করে বা অন্য স্ত্রীর সাথে বৈষম্য করে ওমরা করা শরীয়তে জায়েজ নয়।
  • দ্বিতীয় স্ত্রীর সপ্তাহটি তার হক। সেই সপ্তাহে যদি স্বামী প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরায় যায়, তবে এটি দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করা—যা হারাম।
  • গোপন করা (দ্বিতীয় স্ত্রীকে না জানানো) নিজেই একটি খিয়ানত ও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে মুনাফিকের আলামত হিসেবে গোপন খিয়ানতের কথা এসেছে। (সহিহ বুখারি: ৩৩)

খ) "আমি আল্লাহকে ভয় করি, হক দিতে পারব না" বলা

এটি ভুল ও ধোঁকাবাজির দলিল। আল্লাহকে ভয় করা মানে সব স্ত্রীর হক আদায় করা, শুধু একজনকে দেওয়া নয়। বরং যে আল্লাহকে ভয় করে, সে-ই সমতা রক্ষা করে। সুতরাং এই দলিল দিয়ে অন্যায়কে বৈধ করা যায় না।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনসাফের সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষী হও।" (সূরা নিসা: ১৩৫)


৪. দ্বিতীয় স্ত্রীর অভিযোগ করার অধিকার

হ্যাঁ, দ্বিতীয় স্ত্রীর সম্পূর্ণ শরয়ী অধিকার রয়েছে অভিযোগ করার। কারণ:

  1. সমতা রক্ষা করা স্বামীর উপর ওয়াজিব—এটি স্ত্রীর হক।
  2. হক নষ্ট হলে স্ত্রী শাসনকর্তা/কাজির কাছে অভিযোগ করতে পারে এবং আদালতের মাধ্যমে হক আদায়ের দাবি করতে পারে।
  3. ইসলামি শরীয়তে স্ত্রীর হক আদায় না করা জুলুম; আর জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা জায়েজ।
  4. খুলা (বিচ্ছেদের দাবি)-এর অধিকারও স্ত্রীর রয়েছে, যদি স্বামী হক আদায় না করে এবং সংসার দুঃসহ হয়ে পড়ে। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৩০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৪৫)

৫. প্রশ্নে বর্ণিত নির্দিষ্ট অবস্থার বিধান

| বিষয় | বিধান | |---|---| | প্রথম স্ত্রীর সাথে থাকা, ৫ মাস পর ৭ দিন দ্বিতীয় স্ত্রীকে দেওয়া | এতে সমতা রক্ষা হয়নি; দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট হচ্ছে | | দ্বিতীয় স্ত্রীর অভিযোগ না থাকা | অভিযোগ না করলেও হক নষ্ট করা জায়েজ হয় না; স্বামী গুনাহগার | | সেই ৭ দিনে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা | দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট; জায়েজ নয় | | দ্বিতীয় স্ত্রীকে না জানানো | গোপন খিয়ানত; নাজায়েজ | |বিনা কারনে "তালাক দিয়ে দাও বা চলে যাও" বলা | জুলুম ও নাজায়েজ। | "আল্লাহকে ভয় করি, হক দিতে পারব না" বলা | ভুল দলিল; অন্যায়কে বৈধ করার অপচেষ্টা |

★"চলে যাও" শব্দটি তালাকের নিয়তে বললে এক তালাকে বায়েন পতিত হবে।


৬. করণীয় (স্বামীর জন্য)

  1. তওবা করা এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর হক আদায় করা।
  2. সমতা রক্ষা করা—রাত, খরচ, বাসস্থান ও সাক্ষাতে ইনসাফ করা।
  3. গোপন না করা—স্ত্রীদের সাথে সৎ ও স্বচ্ছ থাকা।
  4. স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য না করা; যদি বিচ্ছেদই একমাত্র সমাধান হয়, তবে ইহসানসহ তালাক দেওয়া
  5. ওমরায় যাওয়ার আগে উভয় স্ত্রীর হক ও সম্মতি বিবেচনা করা; একজনের হক নষ্ট করে ইবাদত করা ইবাদত নয়, বরং গুনাহ।

৭. উপসংহার

  • দ্বিতীয় স্ত্রীর হক ও সময় দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব
  • "তালাক দিয়ে দাও বা চলে যাও" বলা নাজায়েজ ও জুলুম; তবে এতে তালাক পতিত হয় না।
  • দ্বিতীয় স্ত্রীর হক নষ্ট করে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করা জায়েজ নয়
  • "আল্লাহকে ভয় করি" বলে হক না দেওয়া ভুল ও ধোঁকা
  • দ্বিতীয় স্ত্রীর অভিযোগ করার ও হক দাবি করার পূর্ণ শরয়ী অধিকার রয়েছে

★"চলে যাও" শব্দটি তালাকের নিয়তে বললে এক তালাকে বায়েন পতিত হবে।

আল্লাহ তাআলা সবাইকে ইনসাফের সাথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

রেফারেন্স:

  • সূরা নিসা: ৩, ১২৯, ১৩৫
  • সূরা বাকারা: ২২৯
  • সূরা তালাক: ৬
  • সহিহ বুখারি: ৩৩
  • সুনানে আবু দাউদ: ২১৩৩
  • সুনানে তিরমিজি: ১১৪১, ১৯৪০
  • রাদ্দুল মুহতার: ৩/২০৩, ২৩০
  • আল-হিদায়া: ২/৩৫০
  • ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৩৪৫
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৪৫
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৩৮৫
  • ফাতাওয়া উসমানি: ২/২৯০

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.